কিন্তু এতদিন পরে কোম্পানির চাকরি পাওয়াতে চোখের সামনে আবার একটু আশার আলো ফুটে উঠেছে।
বাবু শুনে খুশিই হয়েছিল। বলেছিল–ধর্মটা বজায় রেখে কাজ কোরো নবকৃষ্ণ, তা হলে ধর্মও থাকবে, ওদিকে টাকাও হাতে আসবে–
তা ধর্ম রাখতে কায়স্থ বংশের ছেলে নবকৃষ্ণ জানে। ধরমশাইরা সুবর্ণ বণিক। কতদিন চাকরি করেছে সেখানে, কিন্তু কেউ বলতে পারে না নবকৃষ্ণ কোনওদিন ধর্ম খুইয়ে চাকরি বজায় রেখেছে। রোজ চটিজোড়া বাইরে রেখে কাছারিতে ঢুকেছে, আবার কাছারি থেকে ফেরবার সময় চটিজোড়া পরে বাড়িতে এসেছে। বেনের ছোঁওয়া এক ফোঁটা জল পর্যন্ত খায়নি সেখানে। আবার এখানেও তাই। এখানেও কোম্পানির সেরেস্তা। কোম্পানির মুসলমান মুনশি কাজিউদ্দিন সাহেব একটু একটু বিষনজরে দেখতে আরম্ভ করেছিল নবকৃষ্ণকে। কিন্ত নবকৃষ্ণর জানা আছে, পরের কাছে নিজেকে ছোট করার মধ্যে অসুবিধে যতই থাক, সুবিধেটাই বেশি। না হয় ছোটই হলুম তোমার চোখে, কিন্তু আসলে তো ছোট হলুম না। নিজের কাজ গুছিয়ে নেবার পর তখন তুমি যতই ছোট করবার চেষ্টা করো না কেন, তখন আর আমাকে ছোট করতে পারবে না।
সেদিন সিংহবাহিনীর মূর্তির সামনে অনেকক্ষণ ধরে নবকৃষ্ণ চোখ বুজে সেই প্রার্থনাই করেছিল।
বলেছি–হে মা, তোমার কাছে আর কিছু চাইনে আমি। আমাকে শুধু অগাধ টাকা দিয়ে। টাকার জন্যে এতদিন অনেকের পায়ে ধরনা দিয়েছি, আর পারছিনে ধরনা দিতে। এমন সুযোগ জীবনে আসবে না আর। ওদিকে নবাবের বিপদ, এদিকে কোম্পানিরও বিপদ। এমন বিপদের দিনেই তো সুযোগ আসে মানুষের জীবনে। বিপদ আছে বলেই তো কোম্পানির ফিরিঙ্গিরা আমার মুঠোর মধ্যে এসেছে। বিপদ চলে গেলে কি আর আমাকে পুঁছবে, মা? আমাকে তখন লাথি মেরে তাড়িয়ে দেবে কুকুর বেড়ালের মতো। তাই বলছি, ওদের বিপদ থাকতে থাকতে আমার একটা কিছু হিল্লে করে দাও মা আমি তোমার মাথায় হিরের মুকুট, নাকে সোনার নথ করে দেব
কথাটা মা শুনেছিল কি না কে জানে। কিন্তু সেরেস্তায় আসতেই সাহেবের ডাক পড়েছিল। আর তার পরেই এই সুযোগ।
বিরাট ছাউনি নবাবের। দূর থেকে দেখা যায় ছাউনির চূড়া। সার সার ঘোড়া বাঁধা রয়েছে সদরে। মাথার ওপর নিজামতের নিশেন উড়ছে। যেখানে যেখানে নবাব যায়, সঙ্গে যায় সেপাই বরকন্দাজের দল। কাছারির লোকজন থাকে সঙ্গে। বাইজি-বেগমদের তাঁবুও পড়ে। বাবুর্চি, মশালচি, নৌকর, খিদমদগার, সবাই থাকে।
কিন্তু সেদিন যে মুনশি নবকৃষ্ণ সোজা নবাবের দরবারে ঢুকতে পেরেছিল সে চাকরির খাতিরে নয়, সে শুধু উদগ্র উন্নতির কামনায়। যেমন করে হোক, টাকা করতেই হবে। টাকা না হলে কিছুই হবে না জীবনে। টাকা চাই-ই চাই। হুগলির ফৌজদারের টাকা হয়েছে, লক্ষ্মীকান্ত ধরের টাকা হয়েছে, বৈষ্ণবচরণ শেঠের টাকা হয়েছে, নবকৃষ্ণ শেঠেরও টাকা হওয়া চাই। অগাধ টাকা!
নবাবের দরবারে এত্তেলা দিয়ে ঢুকতে হয়।
নবকৃষ্ণ এত্তেলা দিয়ে ঢুকতে যাচ্ছিল, হঠাৎ বোরখা-পরা বেগমসাহেবা এসে দাঁড়াল।
নবকৃষ্ণ পড়ি-কি-মরি করে একেবারে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে কুর্নিশ করে ফেললে। বেগমসাহেবা যে-ই হোক, নবাবের বেগমসাহেবাকে কুর্নিশ করা মানে নবাবকেই কুর্নিশ করা।
মরালী জিজ্ঞেস করলে–তুমি কে?
নবকৃষ্ণ বললে–বেগমসাহেবা, আমি দাসানুদাস মুনশি নবকৃষ্ণ!
হিন্দু? কাফের?
হা বেগমসাহেবা। অধ। কাফেয়। পেটের দায়ে ফিরিঙ্গি সাহেবের সেরেস্তায় কাজ করি। কিন্তু নবাবের নুন খাই।
নবাবের নুন খাই মানে?
আজ্ঞে, নবাবের নুন কে না খায়? তামাম হিন্দুস্থানের লোক তো নবাবের নুন খেয়েই বেঁচে আছে।
তুমি এখানে কী করতে এসেছ?
নবকৃষ্ণ বুঝেছিল–এই-ই নিশ্চয় মরিয়ম বেগম। এই মরিয়ম বেগম সম্বন্ধেই সাহেব খুব সাবধান করে দিয়েছিল। কিন্তু এমন করে এত সহজে বেগমসাহেবার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে ভাবতে পারেনি।
আপনিই কি মরিয়ম বেগমসাহেব হুজুর?
তুমি আমাকে চেনো?
আপনাকে কে না চেনে বেগমসাহেবা? আমার মনিব ক্লাইভসাহেব আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ একেবারে। আমাকে আসবার সময় বলে দিয়েছেন, বেগমসাহেবাকে দেখলেই কুর্নিশ করবে।
তুমি কি ক্লাইভসাহেবের কাছ থেকে আসছ?
হ্যাঁ বেগমসাহেবা। নইলে আর কার কাছ থেকে আসব?
এখানে তোমাকে কী করতে পাঠিয়েছে তোমার সাহেব?
নবকৃষ্ণ বললে–আপনার সঙ্গে দেখা করতেই পাঠিয়েছে বেগমসাহেবা। বলে পাঠিয়েছে বেগমসাহেবা সাহেবের দফতরে এসেছিলেন কিন্তু কোনও নজরানা দিতে পারেননি। খুব আফশোস করছিলেন। তাই আমাকে এখানে পাঠিয়ে দিলেন সাহেব!
আমি চলে আসার পর কেউ এসেছিল সাহেবের দফতরে?
কে আবার আসবে বেগমসাহেবা? আমিই এসেছি। আমিই তো সাহেবের খাস মুনশি এখন। আপনি হবের কোনও অপরাধ নেবেন না বেগমসাহেবা। সাহেবের বড় ভুলো মন। আপনি সাহেবের কাছ থেকে তাড়াতাড়ি চলে এলেন তাই নজরানার কথা সাহেব একেবারে ভুলে গেছেন!
পাশ দিয়ে নবাবের চোপদার যাচ্ছিল। মরালী বললে–নৌসের আলি–
নৌসের আলি কুর্নিশ করে সামনে এসে দাঁড়াল।
মরালী বললে–একে ধরো তো-হাত-পা বেঁধে নবাবের সামনে নিয়ে যাও
আজ্ঞে বেগমসাহেবা, আমি তো কিছু করিনি
নৌসের আলি কিন্তু ততক্ষণে বেগমসাহেবার হুকুম তামিল করে ফেলেছে। তারপর আর বেশি কথা না বলে একেবারে দরবারের ভেতরে নিয়ে গেছে।
