রাজা রাজবল্লভের বোধহয় দয়া হয়েছিল। বললে–কী কাজ জানো তুমি?
নবকৃষ্ণ বলেছিল–আজ্ঞে সব কাজ জানি
ফিরিঙ্গিরা গোরু খায়, জানো তো?
আজ্ঞে খুব জানি, সে তো মুসলমানরাও খায়। তাতে আর আমার কী? দফতর থেকে কাজ করে এসে গঙ্গায় চান করে নিলেই হল!
লেখাপড়া জানো?
আজ্ঞে শুভঙ্করী জানি।
আর ফারসি?
ফারসি লিখতে পারি, পড়তে পারি
কথাটা মনে ছিল দেওয়ানজির। উমিচাঁদের সঙ্গে যখন রাজা রাজবল্লভের কথা হল তখন ইংরেজরা ফারসি-জানা লোক খুঁজছে। মুনশি কাজিউদ্দিন আছে বটে, কিন্তু সে তো মুসলমান। দেওয়ান রামচাঁদও আছে। কিন্তু মুর্শিদাবাদের হিন্দু তামির-ওমরাওরা, হিন্দু জমিদাররা যেনবাবের উচ্ছেদ চায়, তারা যে ইংরেজদের মদত দেবে, সে-চিঠি যাকে-তাকে দিয়ে তর্জমা করানো যায় না। বেশ বিশ্বাসী মুনশি চাই।
ক্লাইভ জিজ্ঞাসা করেছিল–তেমন বিশ্বাসী হিন্দু মুনশি কোথায় পাব?
উমিচাঁদ বলেছিল–আমি তোমাদের দেব সাহেব।
কী নাম তার?
নবকৃষ্ণ!
তাই উদ্ধব দাসও লিখেছে তার কাব্যে কোথায় কবে কখন কেমন করে কার ভাগ্যোদয় হয় কে বলতে পারে। নবকৃষ্ণ ছিল নকু ধরের সেরেস্তার কর্মচারী, একেবারে সেই দিন থেকে হয়ে গেল ইংরেজ দফতরের মুনশি! তারপর থেকে যত চিঠি উমিচাঁদ লিখেছে, মিরজাফর লিখেছে; সব তর্জমা করে দিয়েছে নবকৃষ্ণ। রামচাঁদের তখন আর ডাক পড়ে না। সব কাজে ডাক পড়ে নবকৃষ্ণের।
সেদিন আবার নবকৃষ্ণের ডাক পড়ল পেরিন সাহেবের বাগানে। নবকৃষ্ণ গিয়ে আভূমি সেলাম করে দাঁড়াল।
মুনশি, আমি ভীষণ বিপদে পড়েছি, তোমাকে বাঁচাতে হবে। ক্যান ইউ সেভ মি?
মুনশি বললে–আমি তো তুজবের নিমক খেয়েছি সাহেব, হুজুর যা হুকুম করবেন তা-ই করব–
আমার একটা ইস্পট্যান্ট লেটার চুরি হয়ে গেছে।
কে চুরি করেছে হুজুর? আমাকে নাম বলে দিন, আমি তার গলায় গামছা দিয়ে হুজুরের সামনে ধরে নিয়ে আসব।
না, তা নয়, শোনো
ভগবান বুদ্ধি দিয়েছিল মুনশি নবকৃষ্ণকে অকারণে নয়। কিংবা হয়তো ইতিহাসের প্রয়োজনেই নবকৃষ্ণের আবির্ভাব অনিবার্য হয়েছিল। নইলে নকু ধরের সেরেস্তায় পড়ে থাকলে বুদ্ধির খেলা দেখাবার সুযোগই মিলত না তার জীবনে।
সব শুনে মুনশি বললে–ঠিক আছে হুজুর, আমি এখুনি যাচ্ছি—
কিন্তু হুগলির ফৌজদার সেখানে হাজির রয়েছে, উমিচাঁদও হাজির রয়েছে, সেটা যেন মনে থাকে–আর মরিয়ম বেগমও সেখানেই আছে, সেটাও যেন মনে থাকে–
মুনশি বললে–হাজার হোক হুজুর, মরিয়ম বেগমসাহেবা তো মেয়েমানুষ বই আর কিছু নয় মেয়েমানুষের বুদ্ধির কাছে মুনশি নবকৃষ্ণ হেরে যাবে না, এটা নিশ্চয় জানবেন!
না না মুনশি, তুমি মরিয়ম বেগমকে চেনো না। ভারী ক্লেভার, ভেরি শুড গার্ল–খুব সাবধানে কথা বলবে তুমি।
মুনশি বললে–আমি হুজুরের নুন খেয়েছি, আমাকে সেকথা বলতে হবে না দরকার হলে আমি বেগমের পা জড়িয়ে ধরব
সেকী? তুমি মুসলমান মেয়ের পা জড়িয়ে ধরবে?
কেন হুজুর? আপনি আমাকে এক্ষুনি হুকুম করুন, পা জড়িয়ে ধরা দূরের কথা, আমি মরিয়ম বেগমের পা চেটে আসব। হুজুরদের জন্যে যদি তা করতে হয় তো তাও করব
তা হলে তুমি এক্ষুনি চলে যাও মুনশি, তোমার ওপর আমার কোম্পানির একজিস্টেনস নির্ভর করছে। যদি এই কাজটা তুমি করতে পারো মুনশি তো ইংলন্ডের প্রাইম মিনিস্টার মিস্টার পিটকে তোমার কথা লিখে দেব, তোমাকে আমি রিওয়ার্ড দেব আর বাক্যব্যয় না করে মুনশি বেরিয়ে গেল।
এতক্ষণ ওয়াটসন কিছু বলেনি। এবার ক্লাইভের দিকে চেয়ে হেসে বললে–এরাই হল রিয়্যাল ইন্ডিয়ান, রবার্ট, এরা টাকার জন্যে সব করতে পারে। বেগমের পা পর্যন্ত চাটতে পারে। আমরা রাইট-ম্যান পেয়েছি, উমিচাঁদ আমাদের রাইট-ম্যান দিয়েছে, দি স্কাউড্রেল!
*
১৭৩৯ সালে নাদির শা দিল্লির সিংহাসনে মাত্র আটান্ন দিন রাজত্ব করে চার কোটি টাকা নিয়ে নিজের দেশে ফিরে গিয়েছিল। মহীশুরের রাজার শ্বশুর জামাইয়ের সব ইয়ার বন্ধুদের নাক কেটে দিয়ে সকলের সামনে তাদের অপমান করেছিল। হিন্দুস্থানের আসল মালিক কে তারই ঠিক নেই তখন! মালিক দিল্লির বাদশা না হায়দার আলি না জেনারেল বুশি না নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা–তারও কোনও হিসেব-নিকেশ হয়নি! সুতরাং কোম্পানির কদরদান খিদমদগার যদি হতে চাও তো নবাবের পা চাটো, নবাবের বেগমের পা-ও চাটো, দরকার হলে অ্যাডমিরাল ওয়াটসন, রবার্ট ক্লাইভের পা-ও চাটো। তাতে হিন্দুস্থানের ভাল না হোক তোমার নিজের তত ভাল হবে। হিন্দুস্থানের ভালর কথা ভাবার দরকার নেই, সে খোদাতালাহু ভাবুক। তুমি তোমার নিজের ভালর কথা আগে ভাবো। যে হিন্দুস্থানের মালিক হবে সে তোমাকে বাংলা মুলুকের মালিক বানিয়ে দেবে। তারই ভজনা করো।
মুনশি নবকৃষ্ণ যখন নবাবের ছাউনিতে পৌঁছোল তখন চারদিকে বেশ উত্তেজনার ফেনা ছড়িয়ে গেছে। এমনিতে মুনশি নবকৃষ্ণ আগে কখনও নবাবের দরবারে যায়নি। দরবারি কায়দা কানুন জেনেছে, শিখেছে নকু ধর মশাইয়ের সেরেস্তায় কাজকর্ম করবার সময়, অনেকবার নিজামতের আমির-ওমরাওদের সঙ্গে মুলাকাত করতে হয়েছে, সেরেস্তার কাজে বাৰুদের হয়ে কথাবার্তা চালিয়েছে। কিন্তু নিজেকে বড় ছোট মনে হয়েছে। মনে হয়েছে, সকলে যেন বড় নিচু নজরে দেখছে। তাকে। তারপর সুতানুটি গোবিন্দপুর কত বড় হয়েছে, সাহেবরা আস্তে আস্তে শহরে আঁকিয়ে বসেছে। কিন্তু নবকৃষ্ণ যে-কে-সেই রয়ে গেছে। সেই খাতাবগলে সেরেস্তায় যাওয়া আর আসা।
