যাক এসব কথা!
সেদিন নবাবের চেহারা কিন্তু অন্য রকম হয়ে গিয়েছিল। সেই নন্দকুমার, যাকে আলিবর্দি খাঁ এত ভালবাসত, যাকে খুশি হয়ে হুগলির ফৌজদার করে দিয়েছিল, সেই নন্দকুমার এমন করে বিশ্বাসঘাতকতা করবে। অথচ বাইরে পুরোপুরি হিন্দু ব্রাহ্মণ। নিয়ম করে পুজো করে, আহ্নিক করে, জপ করে, তপ করে, সেই নন্দকুমার?
আমার কথায় বিশ্বাস করুন জাঁহাপনা, আপনার কাছে ভুল খবর দিয়েছে কেউ!
কিন্তু উমিচাঁদের হাতের লেখাও ভুল?
উমিচাঁদ পাশ থেকে বললে–আমার হাতের লেখা আগেও একবার জাল হয়েছিল জাঁহাপনা, এবারও জাল হবে না তার কী প্রমাণ?
এ যদি জাল হয় তো তুমিও জাল উমিচাঁদ! আর, আমিও জাল। এই বাংলা মুলুক, যে মুলুকের নবাব আমি, তাও জাল! তোমরা কি বলতে চাও বাংলা মুলুকের নবাব বলে কেউ নেই? ফরাসিরা বাংলা মুলুকের নবাব হয়ে গেছে? তোমরা কি বলতে চাও দিল্লির বাদশা তোমাদের সনদ দিয়েছে? তোমরা কি বলতে চাও আমি মসনদ ছেড়ে কান্দাহার পালিয়ে গেছি পাঠানদের ভয়ে? আমার নিজের নামে আমার সনদ বরবাদ করে দিয়েছে দিল্লির বাদশা? বলতে চাও দিল্লির বাদশা আহমদ-শা-আবদালি?
দরবারের মধ্যে থমথম করছে সমস্ত আবহাওয়াটা। যেনবাব ভাল করে খায় না, ভাল করে ঘুমোয় না, বাইরের নিঃশব্দ নিঝুম আকাশটার দিকে চেয়ে চুপ করে থাকে, তার গলায় যেন বাজ ভেঙে পড়ল। যারা আশেপাশে ছিল, সবাই চমকে উঠল গলার শব্দে।
ছাউনির ভেতরে সমস্ত কথাই কানে যাচ্ছিল মরালীর। নানিবেগমের কানেও যাচ্ছিল। মরালী আর থাকতে পারল না।
বললে–আমি যাই নানিজি!
নানিবেগম বললেওমা, তুই কোথায় যাবি? দরবারের মধ্যে যাবি নাকি?
হা নানিজি, ওরা তোমার মির্জাকে বিশ্বাস করছে না। শুনছ না?
তা তুই দরবারের ভেতরে গেলেই কি বিশ্বাস করবে ওরা?
হা, আমি ওদের বিশ্বাস করিয়ে দেব ওরা সবাই জোচ্চোর, ওরা সবাই ঠগ।
তা তুই কী করে বিশ্বাস করাবি ওদের?
তার তরিখা আমি জানি! তাতেও যদি ওরা বিশ্বাস না করে, আমি ওদের মুখের ওপর সাত জুতো মারব, তখন ওরা বাপ বাপ বলে স্বীকার করবে।
কিন্তু বেগম হয়ে দরবারের মধ্যে যাবি কী করে? মির্জা কী বলবে?
মরালী বললে–কেন, আমি তো ক্লাইভ সাহেবের ছাউনিতে গিয়েছিলাম, তোমার মির্জা কিছু বলেছে?
বলে আর দাঁড়াল না। তাড়াতাড়ি বোরখাটা পরে নিলে। তারপর ছাউনির পরদাটা ফাঁক করে দরবারের ভেতর ঢুকল।
*
কোথায় কবে কখন কেমন করে কার ভাগ্যোদয় হয় কে বলতে পারে। যেদিন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সমুদ্রের ওপর কাঠের পালতোলা জাহাজ ভাসিয়ে বাংলা মুলুকে এসে নামল তখন সে ছেলেটা জন্মায়নি। সেই নবকৃষ্ণ। একদিন বড় হয়ে যখন চোখ ফুটল, তখন দেখলে দিল্লির বাদশার ফার্মানের কোনও দামই নেই। কোথা থেকে কোন ম্লেচ্ছ জাতের লোকেরা এসে কলকাতায় বেশ আসর জাকিয়ে বসেছে। নয়ানঠাদ মল্লিকের ভাড়াটে বাড়িতে গোরা সাহেবরা থাকত। সেখানে নবাবের আমির-ওমরাওরা আসত পালকি চড়ে। অনেক রাত পর্যন্ত খানাপিনা চলত, হইহুল্লোড়ের শব্দ কানে আসত। কটা আর লোক তখন শহরে। মিউনিসিপ্যালিটি করেছে, হলওয়েলসাহেব তখন ছিল তার বড়কর্তা। তখন থেকেই ছেলেটা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখত সেদিকে। গঙ্গার ধারে গিয়ে জাহাজের মাল ওঠানামা দেখত।
ছোট চাকরি নবকৃষ্ণের। পোস্তার রাজার দাদামশাইয়ের বাড়িতে সামান্য মুনশির চাকরি। লক্ষ্মীকান্ত ধর মশাইকে লোকে বলত নকু ধর। নকু ধর মশাইয়ের কারবার ইংরেজ কোম্পানির সঙ্গে। কোম্পানিকে টাকা দিতে হত। মাল বন্ধক রেখে টাকার সুদ আদায় করতে হত। জাহাজঘাটায় কোম্পানির সাহেবদের সঙ্গে দেখা করতে কে যাবে?
নবকৃষ্ণ বলত–আমি যাব কর্তা!
ফুটফুটে ছেলেটা। বেশ বিনয়ী। নম্র ভদ্র গরিব। নকু ধর মশাই বেশ পছন্দ করতেন।
বলতেন–মুহুরিমশাই, ওইনবকেই পাঠাও
সে-সব অনেক দিন আগেকার কথা। কোম্পানির ঘাটে তখন কোম্পানির মাল ছাড়া আরও অনেকের মাল ওঠানামা করত। হুজুরিমল, বৈষ্ণবচরণ শেঠ, বেভারিজ সাহেব, পোস্তার রাজবাড়ির বাবুদের মালও নামত ওখানে। ছেলেটার চোখের সামনে সব ঘটেছে। একদিন কোম্পানির ঘাট ভেসে গেল জোয়ারের জলে। তখন নতুন ঘাট তৈরি করতে হল। সাহেবরা নিয়ম করে দিলে, যে-মহাজন কোম্পানির ঘাটে মাল ওঠাবে-নামাবে তাকে মাশুল দিতে হবে। নকু ধর মশাই বললেন–তা হলে আমরা নিজের ঘাট তৈরি করব।
তা তা-ই হল। একে একে নতুন ঘাট তৈরি হতে লাগল গঙ্গার ধারে ধারে। দপাল ঘাট, কাশীনাথ ঘাট, ব্যাবেটোর ঘাট, জ্যাকসন ঘাট, কোর সানস ঘাট, ব্লইথার ঘাট, হুজুরিমল ঘাট। তারপর হল বাজার। শোভাবাজার, চার্লস বাজার, হাটখোলার বাজার, ঘাসটোলার বাজার।
ছেলেটার চোখের সামনে যেন আরব্য-উপন্যাস ঘটে যেতে লাগল। কেবল মনে হত জীবনটা নষ্ট হয়ে যেতে বসেছে নকু ধরের সেরেস্তার চারটে মধ্যে। কেবল ছটফট করত বাইরে বেরিয়ে যাবার জন্যে। যদি একটা চাকরি মেলে সাহেবদের দফতরে, তা হলে যেন জীবনটা ধন্য হয়ে যায়।
জাহাজঘাটায় কোম্পানির জাহাজ এসে নামত আর সাহেব দেখলেই মাথা নিচু করে সেলাম করত।
বলত সেলাম সাহেব
একটু একটু ইংরেজি বলতেও শিখেছিল শেষের দিকে। তখন বলত–গুড মর্নিং স্যার–
সত্যিই, কোথায় কবে কখন কেমন করে কার ভাগ্যোদয় হয়, কে বলতে পারে! রাজা রাজবল্লভ যখন কলকাতায় এসেছিল, তখন নবকৃষ্ণ নিজের দুঃখের কথা শুনিয়েছিল। বলেছিল–আপনার তো সাহেবদের সঙ্গে খুব দোস্তি আছে দেওয়ানমশাই, আমাকে একটা চাকরি করে দিন-না দফতরে–
