যে আমির ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে রোজ ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করে, সে প্রথমেই বলে হে মা কালী, হেমা জগদম্বা, আমাকে দেখো মা, নবাবের বিষনজরে যেন না পড়ি। নবাব যেন খুশি হয়ে থাকে আমার ওপর।
যে-জমিদার ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে রোজ ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করে, সে প্রথমেই বলে হে মা কালী, হে মা জগদম্বা, আমাকে দেখো মা, নবাবের বিষনজরে যেন না পড়ি। নবাব যেন খুশি থাকে আমার ওপর।
শুধু আমির-ওমরাহ নয়, শুধু জমিদার-তালুকদারই নয়, তামাম হিন্দুস্থানের মানুষের ওই আর্জি। আজ না-হয় সকাল হল, আজ না-হয় বেঁচে আছি। কিন্তু কাল সকাল পর্যন্ত বেঁচে না-থাকতেও পারি। কাল পর্যন্ত তুমি আমাকে দেখো। কাল যদি বেঁচে থাকি তো তখন পরশুর কথা পরশু বলব। ১৭০৭ সালে বাদশা আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর থেকেই জীবন ঐশ্বর্য আশা আস্থা সবকিছুই যেন মানুষের মনে ক্ষণস্থায়ী হয়ে গিয়েছিল। এই যে আজ খেত থেকে ধান কেটে নিয়ে এসে আমার মরাইতে রাখলুম, কাল সকালবেলা ডিহিদার এসে তা কেড়ে নিয়ে যেতে পারে। এই যে আজ অনুষ্টুপ ছন্দে মন্ত্র পড়ে আমার স্ত্রীকে ঘরে নিয়ে এলুম, কাল নবাবের লোক এসে পরোয়ানা দেখিয়ে তাকে তুলে নিয়ে যেতে পারে। খোদাতালার রাজ্যে তবু দু’দণ্ড সবুর করা চলে। কবিরাজ কি হেকিম ডেকে মানুষের মৃত্যুকে তবুদু’দিন ঠেকিয়ে রাখাও যায়, কিন্তু নবাবের হুকুমে সবুর সয় না। নিজামতের পরোয়ানার আর নড়চড় নেই। সে বিধাতার বিধানের চেয়েও অমোঘ। নিজামতের বিধানে আজ না হয় হুগলির ফৌজদার হয়ে আছি, কিন্তু সেই নিজামতের বিধানেই হয়তো কাল আবার নিজামতের কয়েদখানায় থাকতে পারি। কে বলতে পারে?
কিন্তু উমিচাঁদের যাবার কথা কাশিমবাজারে, কাশিমবাজারে না গিয়ে সে তোমার দফতরে গেল কেন?
উমিচাঁদ পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল।
বললে–নন্দকুমারজি আমার বন্ধু জাঁহাপনা। তাই তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলুম
কিন্তু দেখা করবার আর সময় পেলে না? ঠিক যে সময়ে ফিরিঙ্গিরা চন্দননগরে হামলা করতে যাবার মতলব করছে, সেই সময়ে?
ফিরিঙ্গিরা চন্দননগরে হামলা করবার মতলব করেছে? কই, আমি তো কিছু জানি না জাঁহাপনা!
উমিচাঁদ যেন হঠাৎ আকাশ থেকে পড়েছে।
উমিচাঁদ।
এবার নবাবের গলার আওয়াজ আর এক পরদা চড়ে উঠল। পাশে কান্ত পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে ছিল শুরু থেকে। কান্তর মনে হল নবাব আরও জোরে চেঁচিয়ে ওঠে না কেন? নবাবের হাতে কি ক্ষমতা নেই? নবাব কি বাংলামুলুকের ভাগ্যবিধাতা নয়! তবে এত নরম হয়ে আছে কেন? জেলখানায় পুরতে পারে না আগেকার মতো? কোতল করতে পারে না যেমন করেছিল হোসেনকুলি খাঁ’র বেলায়? নবাবের মুখের দিকে চেয়ে দেখল কান্ত। সমস্ত মুখখানা যেন শুকিয়ে গেছে। সেই যেদিন থেকে নবাবের সঙ্গে কলকাতায় এসেছে সেই দিন থেকেই নবাবের পাশে পাশে থেকে দেখেছে। এই মানুষটার ওপরেই বুড়ো সারাফত আলির এত রাগ; এই মানুষটাকেই লোকে ঠকায়। এই মানুষটারই এত নিচ্ছে। অথচ দেখে কিছুই বোঝা যায় না। সারাদিন বাব চুপ করে ঘরের মধ্যে বসে থাকে, কারও সঙ্গে কথা বলে না। মেহেদি নেসার, ইয়ারজান সাহেবরা এত বন্ধু ছিল আগে, তারাও কাছে থাকে না। কাছে থাকতে দেয় না তাদের। কেউ দেখা করতে এলে নামধাম-পরিচয় জিজ্ঞেস করে নিয়ে তবে দেখা করে। সকলের কথা শোনে। মন দিয়ে শোনে। তারপর একটা কি দুটো কথা বলে। তাও আস্তে আস্তে। ইংরেজদের সঙ্গে মিটমাট হয়ে যাবার পর থেকেই কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেছে আরও। আশ্চর্য, ছাউনির ভেতরে মদের ফোয়ারা চলে। মেহেদি নেসার সাহেব খায়, ইয়ারজান সাহেব খায়, মিরজাফর আলি সাহেবও খায়। আমির-ওমরাওরা কেউই বাদ যায় না। কিন্তু নবাবকে কোনওদিন মদ খেতে দেখলে না কান্ত। দরকার হলে শুধু জল কিংবা শরবত আসে খানাঘর থেকে। তাও প্রথম-প্রথম গরম মশলা দিয়ে মোগলাই খানা রান্না হত। ভারী লোভ লাগত কান্তর। মিষ্টি গন্ধ। চারদিক একেবারে গন্ধে ভুরভুর করত। কিন্তু হালসিবাগানের ব্যাপারটার পর থেকেই খুব মনমরা হয়ে গিয়েছিল। থালায় সব খাবার পড়ে থাকত। কেউ খেতে বলবারও লোক নেই। রাত্রে ঘুমও কমে গিয়েছিল। কান্ত ঘুম থেকে উঠে এসে দেখত তার আসার অনেক আগেই নবাব উঠে পড়েছে। উঠে ঘরের কোণের অলিন্দ দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে রয়েছে। তখনও সূর্য ওঠেনি। অনেক দূরের ধানখেত খাঁ খাঁ করছে, এই লড়াইয়ের জন্যে চাষারা গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে, কেউ চাষ করতে পারেনি। তার ওপাশে গঙ্গা, তার ওপাশে ঝাপসা ঝাপসা দেখা যায় গাছের সার। এক ঝাঁক পাখি উড়ে আসছে আকাশ চিরে। তার ওপাশে একেবারে অন্ধকার, ওদিকের আকাশটাতে তখনও পুবের আলো পৌঁছোত পারেনি। সেই দিকে চেয়ে নবাব কী ভাবে কে জানে। কান্ত ভেবেছিল আবার বাইরে ফিরে যাবে, কিন্তু যায়নি। বেশ লাগত নবাবকে দেখতে, নবাবের কাছে কাছে থাকতে।
কে?
যেদিন নানিবেগম মরালীর সঙ্গে প্রথম ছাউনিতে এল সেদিন তার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়তে দেখেছে কান্ত!
তুই কত রোগা হয়ে গেছিস মির্জা? তুই কত শুকিয়ে গেছিস? খাওয়াদাওয়া করিস না বুঝি ঠিকমতো?
নবাব হেসেছিল শুধু নানিবেগমের কথা শুনে। যেন ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করলেই শরীর ভাল হয়। আশ্চর্য, কান্ত যদি এই চাকরিতে না আসত তো জানতেই পারত না যে, নবাব বাদশাদেরও দুঃখ থাকতে পারে। জানতেও পারত না যে, বাইরে যাদের সবাই হিংসে করে, যাদের অর্থ, নাম, ঐশ্বর্য লোককে লোভ দেখায়, তাদেরও খিধে থাকে না, তারাও রাত্রে ভাবনায় ঘুমোত পারে না। বুঝতেও পারত না যে, তাদেরও কষ্ট আছে, তারাও আমাদের গরিব লোকদের মতো যন্ত্রণায় ছটফট করে। সত্যিই সেদিন বাংলা মুলুকের নবাবকে অত কাছাকাছি থেকে দেখেছিল বলেই আর কোনওদিন তার মনের মধ্যে লোভ এল না। টাকার লোভ, নামের লোভশান্তির লোভ, সুখের লোভ। অনেকে কান্তকে পাগল বলেছে। বলেছে, তুই নবাবের অত কাছাকাছি ছিলিনবাবের কাছ থেকে কিছু বাগিয়ে নিতে পারলি না? ওরা জানে না যে, দেবার মালিক নবাব নয়, দেবার মালিক বাদশাও নয়। নিতে গেলে আগে নেবার যোগ্য হতে হয়। সবাই কি নিতে পারে? আলিবর্দি খাঁ তো মসনদ দিয়ে গিয়েছিল নবাব মির্জা মহম্মদকে, নবাব কি রাখতে পারলে? চাইতেই যদি হয়, তো চাইব এমন কিছু যা রাখা যায়, যা হারায় না, যা থাকে! যা পেয়ে হারাবার ভয়ে কাতর হব না, যা পেয়ে বলতে পারব–এ আমার, এ আমার চিরকালের ধন। এ পাওয়া আমার কেউ কেড়ে নিতে পারবে না, এই পাওয়াই আমার সত্যিকারের প্রাপ্তি।
