রবার্ট বললে–না, তাও আমি করতুম। কিন্তু সেই হাতিয়াগড়ের রাজার ওয়াইফ আমার কাছে এসেছিল–
হুঁ? সেই হাতিয়াগড়ের রাজার ওয়াইফ? তোমার কাছে? কখন?
রবার্ট কললে-তুমি তাকে দেখেছ।
আমি? আমি কখন দেখলুম?
হ্যাঁ, তুমি দেখেছ। তুমি সেদিন এসে দেখলে আমার ঘরে একজন লেডি রয়েছে, বোরখা-পরা লেডি, সেই লেডিই হল হাতিয়াগড়ের রাজার ওয়াইফ।
কিন্তু সে তো বেঙ্গলের নবাবের বেগম।
তারই নাম মরিয়ম বেগম! দ্যাট ইজ দি ওয়াইফ অব হাতিয়াগড়ের রাজা! এখন নবাবের বেগম হয়েছে। আগে রাজার কথা শুনে তার ওয়াইফের ওপর সিমপ্যাথি হয়েছিল, কিন্তু এখন আর আমার কোনও সিমপ্যাথি নেই। খুব ধড়িবাজ। তখন বুঝতে পারিনি কী উদ্দেশ্য নিয়ে আমার কাছে এসেছিল। ভেবেছিলাম হারেম থেকে কী করে পালিয়ে যাওয়া যায় সেই পরামর্শই করতে এসেছে পারহ্যাপস। কিংবা হয়তো হাজব্যান্ডের কাছে খবর পাঠাবার কথা বলতে এসেছে
ওয়াটসন উদগ্রীব হয়ে উঠেছে।
তা হলে কী জন্যে এসেছিল?
খুব ধড়িবাজ মেয়ে। আমাকে বোকা বানিয়ে দিয়ে চলে গেল ওয়াটসন। আমি বিফুলড হয়ে গেলাম। এখন বুঝছি সে আমাকে ধাগা দিতে এসেছিল
ওয়াটসন বললে–তা হলে সেই বেগমসাহেবাই তোমার চিঠি চুরি করে নিয়ে গেছে?
ইয়েস!
তা হলে উমিচাঁদ খুব বিপদে পড়বে। উমিচাঁদ উইল বি কট!
হ্যাঙ আওয়ার উমিচাঁদ। উমিচাঁদের জন্যে আমার মাথাব্যথা নেই। উমিচাঁদ মে গো টু হেল। নবাব আমাদের অ্যাটাক করতে পারে!
বেগমসাহেবা তোমার এখান থেকে কোথায় গেল, জানো?
নিশ্চয় নবাবের কাছে। আমাকে বলে গেল সেনবাবের পরামর্শ না নিয়েই এসেছে। আমার মনে হয় ওটা মিথ্যে কথা। নবাব আমাদের চিঠি পেয়েছে, চিঠি পেয়েই বেগমকে এখানে পাঠিয়েছে। আমাদের ক্যাম্পের সব খবরাখবর জানবার জন্যে।
কিন্তু সে-ই যে মরিয়ম বেগম তা তুমি জানলে কী করে? মে বি সামডি এল! অন্য কেউ তো হতে পারে! হয়তো মরিয়ম বেগমের নাম করে কোনও পুরুষমানুষ এসেছিল। তুমি কি তার চেহারা দেখেছ?
কী করে দেখব? বোরখা পরা ছিল যে!
বোরখা খুলে দেখলে না কেন?
কিন্তু আমি তো তাকে সন্দেহ করিনি!
সেইটেই তো তোমার উইকনেস রবার্ট! আমি কতদিন থেকে বলেছি মেয়েদের বিশ্বাস কোরো না। এই যে তুমি এখানে নেটিভ উওম্যানদের ক্যাম্পের ভেতরে রেখেছ, ওরাও তো পাই হতে পারে। নবাবের শাই হতে পারে। হতে পারে আমাদের সমস্ত মুভমেন্টের খবর নেবার জন্যে নবাব ওদের পাঠিয়ে দিয়েছে।
ক্লাইভ কী যেন ভাবলে খানিকক্ষণ। তারপর বললে–কিন্তু তা কী করে হতে পারে? দে আর সো গুড!
স্পাইরা তো সব সময়েই ভাল হয়।
কিন্তু আমি যে ওর হাজব্যান্ডকে চিনি। হি ইজ এ পোয়েট! পোয়েটটা খুব ভাল লোক।
পোয়েট তোমাকে কি বলেছে যে, ও ওর ওয়াইফ?
হ্যাঁ বলেছে। কিন্তু ওয়াইফ যেতে চায় না হাজব্যান্ডের কাছে! হয়তো পছন্দ হয়নি হাজব্যান্ডকে।
কোথায় যেতে চায়?
ওর ফাদারের কাছে!
তা ওরা একলা বোটে করে কোথায় যাচ্ছিল?
ওরা বলছে তীর্থ করতে। হিন্দু লেডি তো। খুব ধার্মিক। জানো ওয়াটসন, ওরা বিফ খায় না, ড্রিঙ্ক করে না। ওরা কী করে স্পাই হবে?
ওয়াটসন বললে–তবু, তুমি উমিচাঁদকে চিঠি লেখো
কী জন্যে!
লিখে দাও যে তার একটা চিঠি, এখানে তোমার টেবল থেকে চুরি হয়ে গেছে। মরিয়ম বেগমসাহেবা চুরি করে নিয়ে গেছে।
বাইরে একটা শব্দ হতেই ক্লাইভ চেয়ে দেখলে। আর্মির লোক। মেসেঞ্জার।
কী খবর ফ্লেচার?
ফ্লেচার ঘরে ঢুকল।
আমি এখনই আসছি হুগলির ফৌজদারসাহেবের কাছ থেকে।
সেই লেটারটা ডেলিভারি দিয়েছ?
ইয়েস স্যার। কিন্তু শুনলাম নবাব ফৌজদারসাহেবকে নিজের ক্যাম্পে ডেকে পাঠিয়েছে।
হোয়াট ফর? কী জন্যে?
তা জানি না। কিন্তু খুব আর্জেন্ট কল! ফৌজদারসাহেব এখানেই আসছে।
এখানে?
না, এখানে নয়। নবাবের ক্যাম্পে! নবাবের সঙ্গে দেখা করতে!
অলরাইট! তুমি ওয়াচ রাখো, যাও
ফ্লেচার চলে যেতেই অ্যাডমিরাল ক্লাইভের দিকে চাইলে। বললে–এখন কী করতে চাও বলল, হোয়াট নেক্সট?
ক্লাইভ হঠাৎ এক মুহূর্তে আবার সেন্ট ডেভিড ফোর্টের কমান্ডার হয়ে উঠল।
বললে–এই সুযোগ! দিস ইজ দি অপারচুনিটি ওয়াটসন! নাউ অর নেভার! আমি চন্দননগর অ্যাটাক করব!
*
হুগলির ফৌজদার সাহেব তখন নবাবের ছাউনির দরবারে নবাবের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পাশে উমিচাঁদ।
নবাবের সামনে দাঁড়িয়ে হুগলির ফৌজদারও ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। মা জগদম্বার ভক্ত ছেলেকে যেন পাঁঠার মতো বলির জন্যে দেবীর সম্মুখে আনা হয়েছে। শুধু ফৌজদার কেন, মহা-মহা রথী-মহারথীদেরও কতবার লাঞ্ছিত হয়ে ফিরে যেতে হয়েছে নবাবের দরবার থেকে। দশ পুরুষের জমিদারকেও বকেয়া খাজনার দায়ে নবাবের কয়েদখানায় আটক থাকতে হয়েছে। নবাবের কাছে এলে জগৎশেঠের মতো কোটিপতির বুকটা দুরদুর করে কাঁপে। কুর্নিশ করতে সামান্য ত্রুটি হলেও ধমক খেতে হয় তাদের সকলকে। অষ্টাদশ শতাব্দীর মানুষের কাছে দিল্লিশ্বর যা, বঙ্গেশ্বর যা, জগদীশ্বরও তাই। তুমি নবাব, তুমিই দেবতা। তোমার পাপ বলে কোনও কিছু থাকতে নেই। তুমি নিষ্পাপ নির্দোষ। তোমার মেহেরবানিতেই আমরা বেঁচে আছি। তোমার মর্জি হলে তুমি আমাকে বাঁচিয়ে রাখতেও পারো, খুনও করতে পারো। তোমার হুকুমের ওপরে আপিল নেই। তুমি খোদাতালা, তুমি আল্লাতালা আর আমি কীটানুকীট দাসানুদাস বশংবদ। তুমি আমাকে রাখলে রাখতে পারো, মারলেও মারতে পারো। সব দোষ আমার, সব গুণাহ আমার, সব অপরাধ আমার।
