উদ্ধব দাস বলে–গুপ্তিপাড়ায়–
গুপ্তিপাড়ায় কেন গো?
গুপ্তিপাড়ায় চড়ক দেখে আসি—
তা আমাদের পাড়াতেও তো চড়ক হবে, থাকো না–
উদ্ধব দাস বলে–না গো, সেখানে মূল সন্নিসি এবার পিঠে বাণ ফুড়বে, পিঠে বাণ ছুঁড়ে চড়ক গাছে উঠে ঘুরপাক খাবে, যেতে বলেছে–
তারপর আবার বহুদিন উদ্ধব দাসের দেখা নেই।
তা উদ্ধব দাস এইরকম। শোভারামের মেয়ের বিয়েতে অতিথিশালার কথাটা উঠতেই হঠাৎ উদ্ধব দাসের কথাটা মনে পড়ল হরিপদর। রাত তখন অনেক। দাসমশাই তখন হয়তো খেয়েদেয়ে নাক ডাকাচ্ছে।
অতিথিশালার উঠোনের পাশে খালি বোয়াকের ওপর অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছিল। হরিপদ এসে গায়ে ঠেলা দিলে।
ও দাসমশাই, ওঠো ওঠো—
ধড়মড় করে উঠে বসেছে উদ্ধব দাস। উঠে বসেই সামনে চেয়ে দেখে দু’জন লোক। হাতে মশাল জ্বলছে। প্রথমটায় চিনতে পারেনি। কারা আবার এল বিরক্ত করতে। চোখ দুটো রগড়ে ঠিক করে দেখলে।
আমি গো দাসমশাই, আমি। আমি হরিপদ, তোমায় নিয়ে যেতে এসেছি।
শোভারাম তখন একদৃষ্টে চেয়ে দেখছে উদ্ধব দাসের দিকে। এই তার জামাই। তার যে একমাত্র মেয়ে। মেয়েকে যে অনেক আদরে মানুষ করেছে শোভারাম। সেই মেয়েকে এই এর হাতে তুলে দেবে শেষকালে!
হরিপদ শোভারামকে সান্ত্বনা দিয়ে বললে–উদ্ধব দাস আমাদের সৎসুস্থ, কোনও কিছুতে আটকাবে না দাদা, আমি বলে দিচ্ছি তোমার মেয়ে সুখে থাকবে—
শোভারামের তখন জীবন-মরণ সমস্যা। তার তখন আর ভাববার সময় নেই। বললে–আমি আর ভাবতে পারছিনে হরিপদ, যাতে আমার জাতটা থাকে তাই দেখো–
হরিপদ উদ্ধব দাসের সামনে নিচু হয়ে জিজ্ঞেস করলে–নতুন কাপড় পরতে হবে তোমাকে দাসমশাই, তোমার নতুন কাপড় আছে?
উদ্ধব দাস বললে–নতুন কাপড় কী হবে?
শোভারাম বললে–থাক থাক, আমার কাছে নতুন কাপড় আছে, আমি নতুন কাপড় দেবো’খন–চলো, চলো–
উদ্ধব দাস তবু জিজ্ঞেস করলে–নতুন কাপড় কী হবে তাই বলো না—
হরিপদ বললে–হবে আবার কী ছাই, যা বলছি করো, চলো আমাদের সঙ্গে, আর সময় নেই–
অথচ এই কালই শোভারাম মেয়েকে নিয়ে এখানে এসেছিল। ভোরবেলা তখনও ঘুম থেকে ওঠেননি ছোটমশাই। গোকুল দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করেছিল–কে? শোভারাম? এত সকালে কী করতে?
এই মরালীর বিয়ে কিনা আজ, তাই নিয়ে এলাম, ছোটমশাইকে প্রেম করে যাবে—
মরালীকে শাড়ি পরিয়ে আলতা পরিয়ে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। মরালীরও ভয়-ভয় করছিল। এত বড় বাড়ি। কত গড় কত মহল পেরিয়ে রাজবাড়ির ভেতরে আসতে হয়। গড়জাত পেরিয়ে বুড়োশিবের মন্দির। পাশে ঠাকুরবাড়ি। আর তার পাশেই ছোট একটা পুকুর। ভেতরের গড়ের দিকে কেল্লা। এই দুই গড়ের মাঝখানের জমিতে কানুনগো কাছারি। বড় গড় পেরিয়েই সামনের সিংদরজা। সিংদরজার মধ্যে ছোট দরজাটা খুলে লোলাকজন যাতায়াত করে। তারপরেই উঠোন। উঠোনের উত্তর দিকে একটা দক্ষিণদ্বারী একতলা কোঠা। এই কোঠার সামনে খাঁজকাটা খিলেন দেওয়া বারান্দা। আর উঠোনের দক্ষিণ দিকে একটা মন্দির। মন্দির পেরিয়ে পুব দিকের দেয়ালের মাঝখানে একটা দরজা। এই দরজা পেরিয়ে ভেতরে গেলেই আর একটা উঠোন। সে উঠোনের এক পাশে ভোগ রাঁধবার রান্নাবাড়ি আর একদিকে অতিথিশালা। তারপর পুবের দরজা দিয়ে সামনাসামনি ঢুকলে ভেতরের গড়। এই গড়ের ওপরেই ছোটমশাইয়ের বসতবাড়ি। বসতবাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালে ভেতরের দরজা খোলা দেখা যাবে। সেখান দিয়ে ভেতরবাড়ির লোক আসা-যাওয়া করে। ভেতরের গড়ের মধ্যে বিরাট রাজবাড়ি। এ-দিগর থেকে ও-দিগর পর্যন্ত লোক আর জন। মহলের পর মহল। প্রথম মহলের পর বড় বউরানির মহল পড়বে।
ওধার থেকে কেউ প্রশ্ন করবে–কে?
শোভারাম বলবে–আমি শোভারাম–
তারপর পরের মহলের সীমানায় গিয়ে সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। সেখানে বাঁধানো চাতাল আছে। পাশেই পুকুর। পুকুরের শান বাঁধানো ঘাট। এইখানে এই চাতালেই আগে বড়মশাই তেল মাখতে বসতেন। আর খেউরি করত বিশু পরামানিক। তারপর পুকুরের মধ্যে অনেকক্ষণ ডুবে ডুবে চান করবার পর গা মুছতেন রোদে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।
কাল সকালেও এইখানে এসে ছোটমশাইকে প্রণাম করেছিল।
মরালীকে চুপি চুপি বলেছিল–আজকে বড়রানি ছোটরানি সকলকে পেন্নাম করে আসবি জানিস, বলবি–কাল আমার বিয়ে–
এইখান দিয়েই মরালী এই গড়বন্দির মধ্যে ঢুকেছিল।
শোভারাম বলেছিল–যাও মা যাও, ভেতরে গিয়ে রানিমাদের পেন্নাম করে এসো–
কোথা দিয়ে ঢুকে কোথা দিয়ে ভেতরে গিয়েছিল তা আর মনে নেই। ওই দুগগাই প্রথমে দেখতে পেয়েছিল তাকে। ওমা, ওমা, এ যে শোভারামের মেয়ে গো–
চিবুকে ছোঁয়া লাগতেই চোখ খুলে গেল। মরালী দেখলে সামনেই ছোটরানি দাঁড়িয়ে। আর সঙ্গে সঙ্গে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে ফেললে।
ওমা, গড় করছ কেন আমাকে?
দুর্গা বললে–তা করুক না রানিমা, তোমাকে গড় করবে না তো কাকে করবে! কাল ওর বিয়ে, সুলতানুটি থেকে ওর বর আসছে, আশীর্বাদ করো যেন সতীলক্ষ্মী হয়ে সিথির সিঁদুর নিয়ে সোয়ামির সংসার করে–
না না, আমাকে গড় করতে হবে না, আমি তো তোমার চেয়ে বড় নই—
মরালী বললে–আমার বাবা যে বলে দিয়েছে—
তা দিক বলে–তোমার-আমার তো সমানই বয়েস, কী বল দুগগা?
দুর্গা বলেছিল–এই মেয়েকে তো এখন দেখছ এমনি, আগে কী দজ্জাল ছিল মা, রাস্তার লোক দেখলে খোয়র করত, বিয়ের জল পড়তে না পড়তেই একেবারে ঠান্ডা হয়ে এসেছে, বিয়ে বলে এমনি জিনিস–
