তা হলে আপনি হুগলির ফৌজদারকে অন্তত বরখাস্ত করে দিন।
কে? নন্দকুমার? ও তো বিশ্বাসী লোক বেগমসাহেবা!
মরালী বললে–না
কী করে জানলে তুমি?
ফৌজদারসাহেব উমিচাঁদসাহেবের হাত দিয়ে বারো হাজার টাকা ঘুষ নেবার কড়ার করেছে
। কেন? আমি তো তাকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফৌজ পাঠাবার হুকুম দিয়েছি।
আপনার হুকুম যাতে না মানে ফৌজদারসাহেব, তাই এই কড়ার।
কিন্তু একথা তুমি কী করে জানলে?
এখানে ডেকে আনুন তাকে!
কিন্তু তুমি কী করে জানলে আগে তাই বলো?
মরিয়ম বেগমসাহেবা বললে–তা আমি বলব না জাঁহাপনা, নিজামতের যেমন চর থাকে, বেগমসাহেবারাও তেমনি চর পোষে, তা জানেন তো!
তুমিও কি চর পুষেছ?
আমার চর পুষতে হয়নি জাঁহাপনা, নিজামতে আমারও পেয়ারের লোক আছে, আর আমাকে খবর জোগায়, নবাবের ভালর জন্যেই মুফত খাটে।
কে সে? নাম কী তার?
আপনি নাম জিজ্ঞেস করবেন না জাঁহাপনা, সে আপনার এখানেই আছে এখন
নবাব মাথা উঁচু করে সোজাসুজি মরালীর দিকে চাইলে।
জিজ্ঞেস করলে–সত্যি বলছ?
আগে ফৌজদারসাহেবকে এখানে ডাকুন—
কান্ত এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। এবার চমকে উঠল। কার কথা বলছে মরালী! সত্যি না মিথ্যে কে জানে! যদি মরালী প্রমাণ না করতে পারে, যদি প্রমাণ হয় যে মরালীর কথা মিথ্যে! সমস্ত সাজানো কথা! বাইরে যেন কার পায়ের শব্দ হল। হুকুম হয়েছিল যতক্ষণনবাব বেগমসাহেবাদের সঙ্গে কথা বলবে ততক্ষণ কেউ নবাবের ছাউনির পাশে যেতে পারবেনা। সমস্ত বাগানবাড়িটাতে সবাই সন্ত্রস্ত হয়ে আছে। এতদিন চলছিল একরকম। সন্ধি হয়ে গেছে ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে। এখন আর কোনও গোলমাল নেই। সবাই গা এলিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বেগমসাহেবারা আসার পর থেকেই আবার সব চৰ্মন্ করে উঠেছে।
কান্ত পরদার কাছ থেকে সরে এসে দেখলে, শশী।
তুমি এখানে?
শশীর মুখটা গম্ভীর, তার মনটা কয়েকদিন থেকেই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। লড়াই থেমে গেলেই চাকরি চলে যাবে বলে সারাদিন মনমরা হয়ে থাকে।
তোমার সঙ্গেই দেখা করতে এসেছিলাম ভাই, কী খবর?
কান্ত বললে–খবর কিছু নেই
তবু শশী নড়ল না। একটু থেমে বললে–বেগমসাহেবা কী জন্যে এখানে এসেছে ভাই?
কান্ত বললে–তা আমি জানি না
আমার কাছে তুমি লুকোচ্ছ ভাই, নিশ্চয়ই তুমি সব জানো। তুমি তো সবসময় নবাবের পাশে পাশে থাকো, আমি দেখেছি।
তা আমার কাজই তো নবাবের জুলুস দেখা, নবাবের পাহারাদারি করা।
শশী বললে–কিন্তু আমি যে দেখেছি তুমি বেগমসাহেবার সঙ্গে কথা বলছিলে?
আমি? কখন দেখলে তুমি?
শশী বললে–না, আমি দেখেছি। তুমি যে পরদা তুলে বেগমসাহেবার ঘরের ভেতর ঢুকলে! তোমার সঙ্গে বেগমসাহেবার বুঝি জানাশোনা আছে? বলল না, আমার কাছে কেন মিছিমিছি লুকোচ্ছ, আর আমি তো কারও কাছে বলতে যাচ্ছি না। আমি আমার নিজের চাকরি নিয়েই ভাবছি কেবল, আমার অন্য কোনও চিন্তাই নেই
শেষপর্যন্ত শশী নাছোড়বান্দা। কিছুতেই যাবে না। শেষে কান্তই চলে গিয়েছিল। কেমন যেন সন্দেহ হয়েছিল কান্তর মনে। লোকটা চরটর নয় তো কারও! বলেছিল-আমার এখন কাজ আছে ভাই, আমি চলি–
তারপর যখন রাত্রে সব নিরিবিলি হয়ে গেল, নবাবের খানা খাওয়া হয়ে গেছে, তখন ছটফট করতে লাগল কান্ত। ছাউনিও পাতলা হয়ে গেছে সেদিন। উমিচাঁদ সাহেব আর ওয়াটস্ সাহেব দুজনেই কাশিমবাজার কুঠির দিকে চলে গেছে। ইরাজ খা-ও আর বেশি সময় নষ্ট না করে সোজা মুর্শিদাবাদের দিকে রওনা দিয়েছে। দেওয়ান রণজিৎ রায়ও আর বেশি দিন থাকবার লোক নয়। তাকেও সব খবরাখবর দিতে হবে জগৎশেঠজিকে। .
কান্ত বাইরে শব্দ করতেই পরদার ভেতর থেকে খসখস শব্দ হল।
আবার কী? তোমার কি একটা কাণ্ডজ্ঞান পর্যন্ত নেই?
গলা নিচু করে মরালী সামনে এসে কান্তকে পরদার ভেতরে নিয়ে গেল।
কান্ত বললে–আমার বড় ভয় করছে মরালী
কী হয়েছে? ভয় করছে তো আমার কাছে কেন? ফৌজের লোকজনদের কাছে যাও না, ওদের কাছে কামান আছে, বন্দুক আছে
না, সে জন্যে নয়। তুমি নবাবের সঙ্গে যা-যা কথা বলেছিলে আমি সব লুকিয়ে লুকিয়ে শুনেছি। এখন কী হবে?
কীসের কী হবে?
তুমি প্রমাণ করতে পারবে?
কীসের প্রমাণ?
ওই যে হুগলির ফৌজদার ঘুষ নিয়েছে ক্লাইভসাহেবের কাছ থেকে! যদি প্রমাণ হয় যে তুমি মিছে কথা বলেছ, তখন? উমিচাঁদসাহেব কি তোমার রক্ষে রাখবে ভেবেছ? ও যে সর্বনেশে লোক, তুমি ওকে চেনো না!
কে তোমাকে বললে–আমি চিনি না?
কিন্তু তুমি তো দেখোনি ওকে। ও বড় জাহাবাজ লোক! ও-লোকটার দাড়ি দেখলেই আমার ভয় করে। তোমার কাছে ছোরাটা সবসময়ে রেখে দিয়ে, কালকের মতন আবার যেন ফেলে এসো না কোথাও
ঠিক আছে, রাত হয়েছে, তুমি এবার ঘুমোও গে, যাও
বলে কান্তকে ঠেলে বাইরে বার করে দিয়ে মরালী পরদাটা এঁটে দিলে ভেতর থেকে।
*
শেষরাত্রের দিকেই তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছিল পেরিন সাহেবের বাগানে। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন এসেছিল রাত থাকতে। সেপাইরা সেজেগুজে নিয়েছে। ওয়াটসন আসতেই ক্লাইভ একেবারে তাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরেছে।
হোয়াটস আপ রবার্ট? কী হল তোমার?
রবার্ট ক্লাইভ আনন্দে অধীর হয়ে গেছে একেবারে। ছাড়তেই চায়না ওয়াটসনকে। এতদিনের ঝগড়া দু’জনের, তা যেন রবার্ট ভুলেই গিয়েছে এক মুহূর্তে।
ওয়াটসন, এখনি দ্যাট স্কাউড্রেল অব এ বিস্ট চিঠি দিয়েছে। নন্দ কুমার রাজি।
