দেখো…
নবাব চারদিকে অসহায়ের মতো চাইল। তারপর বললে–জীবনে যা চাওয়া যায় সব কি পাওয়া যায়? সবাই কি বন্ধু পায়? আমি শত্রু পেয়েছি, দুশমন পেয়েছি, আমাকে তাদের নিয়েই কাজ চালাতে হবে।
কিন্তু আপনি তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন না কেন, সে-চিঠি তিনি লিখেছেন কি না? কিংবা সে-চিঠির মানে কী?
নবাব কী বলবে যেন বুঝতে পারলে না। তারপর বললে–আমাকে যখন ওদের নিয়েই চালাতে হবে তখন ওদের কথাই আমাকে শুনতে হবে।
কেন, ওরা ছাড়া কি আর কোনও ভাল লোক নেই? ওদের সকলকে ছাড়িয়ে দিয়ে অন্য লোক রাখুন না!
অত সোজা নয় বেগমসাহেবা! নবাব হলে তুমিও বুঝতে পারতে অত সহজে কাউকে ছাড়ানোও যায় না, অত সহজে কাউকে বহাল করাও যায় না।
মরিয়ম বেগম বললে–সেকী? কেউ দোষ করলেও তাকে বরখাস্ত করা যাবেনা? তা হলে আপনি কীসের নবাব জাঁহাপনা?
লোকে বাইরে থেকে তাই-ই জানে বটে! লোকে জানে আমি সকলের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। আমি ইচ্ছে করলে যাকে যা-খুশি তাই-ই করতে পারি, নবাব হয়েও আমি যা-খুশি তাই-ই করেছি। এই নানিজি সমস্ত জানে। আমি ঘসেটি বেগমকে এখনও নজরবন্দি করে রেখেছি। আমি মিরজাফর খাঁর জায়গায় মিরমদনকে বসিয়েছি। আমার নিজের দেওয়ান মোহনলালকে আমি দেওয়ান-ই-আলা, মোদার-উল-মহান করেছি, গোলাম হোসেন খাঁ-কে মুলুক থেকে তাড়িয়েছি। কিন্তু তাতে ফল ভাল হয়নি বেগমসাহেবা, তাতে আমার বদনামই হয়েছে! আর তা ছাড়া দেখো না, আমি তো তোমাকেও তোমার খসমের কাছ থেকে নিয়ে এসে চেহেলসতুনে পুরে রেখে দিয়েছি।
মরিময় বেগম বললে–কেমন চেহেল্-সুতুনে পুরে রেখেছেন তা তো দেখতেই পাচ্ছি, তাই তো আপনার অনুমতি না নিয়েই আমি ক্লাইভসাহেবের সঙ্গে গিয়ে দেখা করে এলুম —
নবাব বললে–তা জানি—
কিন্তু কই, আমি আপনার শত্রুর কাছে গিয়েছিলুম বলে আমাকে তো জিজ্ঞেস করলেন না, কেন সেখানে গিয়েছিলুম!
নবাব নানিবেগমসাহেবার দিকে তাকালে। বললে–নানিজি, বলতে পারো যাদের আমি শাস্তি দিই তারা কী জন্যে আমাকে এত ভালবাসে? আর যাদের আমি কোনও ক্ষতি করি না তারা কেন আমার শত্রুতা করে? এই ইংরেজরা, এদের সবকিছু শর্তে আমি তো রাজি হয়ে ওদের তাবাকুফে দস্তখত করে দিয়েছি, তবু কেন ওরা শর্ত ভাঙতে চাইছে এখন?
নানিবেগম বললে–কিন্তু কেন তুই ওদের বিশ্বাস করতে গেলি মির্জা?
বিশ্বাস করলুম কি সাধে! ওদিকে আহমদ শা আবদালি পাঠানটা যে দিল্লি হয়ে আমার মুলুকে আসছে! দুদিকে দুটো শত্রু নিয়ে আমি কেমন করে সামলাব!
মরিয়ম বেগম কথার মাঝখানে বাধা দিলে।
বললে–জাঁহাপনা, নবাব কখনও দেখিনি জীবনে, আর হয়তো কখনও পরে দেখবও না। কিন্তু একটা কথা আপনাকে বলে যাই জাঁহাপনা, আপনার নবাবি যদি না টেকে তো সে আপনার নিজের জন্যে
আমি বড় বেশি অত্যাচারী, তাই না?
মরিয়ম বেগম বললে–না, আপনার বড় বেশি সহ্যক্ষমতা!
লোকে কিন্তু অন্য কথা বলে। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র থেকে শুরু করে জগৎশেঠজি পর্যন্ত বাই বলে, আমি নাকি বড় অত্যাচারী, বড় অহংকারী, বড় বদমিজাজি! বলে, আমার অহংকার নাকি নবাবি পাবার পর আকাশ ছুঁয়ে গেছে
মরিয়ম বেগম বললে–লোকে যা-ই বলুক, আমি নিজে যা জানি তা-ই বললুম; এত সহ্যক্ষমতা ভাল নয়! ক্লাইভসাহেবের ছাউনিতে যাবার জন্যে আমাকে আপনার শাস্তি দেওয়া উচিত ছিল।
নবাব বললে–শাস্তি দিতে গেলে তো আমার নিজের মাকেই আগে বেশি শাস্তি দিতে হয় বেগমসাহেবা। কিন্তু কী শাস্তি তুমি চাও বলল, শাস্তি দেবার ক্ষমতাটা এখনও আমার হাতেই আছে!
কিন্তু আমি কী অপরাধ করেছি তা তো শুনতে চাইলেন না আমার কাছে?
তুমি নিজেই বলো তুমি কী অপরাধ করেছ?
আমি যদি নিজে নিজের অপরাধ স্বীকার না করি তো আপনি তা জোর করে আদায় করে নিতে পারবেন না?
নবাব বললে–তুমি হাসালে বেগমসাহেবা। এককালে তাও করেছি। লোকের কাছ থেকে জোর করে অপরাধ স্বীকার করিয়ে নিয়েছি। লোকে আমার নামে ভয়ে থরথর করে কেঁপেছে। হয়তো এখনও কাঁপে। নবাব-বাদশাদের ভয়ে লোকে না কাপলে মসনদ চালানোই হয়তো যায় না। কিন্তু এতদিন পরে ভাবছি এবার না-হয় ভয় না করে আমাকে একটু ভালই বাসুক! তাতেও যদি একটু শান্তি পাই।
তাতে আপনি না-হয় বাঁচলেন, কিন্তু আপনার মসনদ? আপনার মসনদের জন্যেই তো মুর্শিদাবাদ থেকে আপনি এতদূরে এসেছিলেন ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই করতে আপনার মসনদের জন্যেই আপনার মাসিকে নজরবন্দি করে রেখেছেন, শওকত জঙকে খুন করেছেন, হোসেনকুলির নাম পর্যন্ত মুছে ফেলেছেন। এতদিন যা-কিছু করেছেন সব তো নিজের মসনদের জন্যেই করে এসেছেন! আপনি আর আপনার মসনদ কি আলাদা?
নবাব কী যেন ভাবলে কিছুক্ষণ। তারপর বললে–কিন্তু তখন যে ভেবেছিলাম মসনদ পেলেই আমি সুখ পাব, শান্তি পাব, আনন্দ পাব–
আর এখন?
এখন ভাবছি সেই দিনগুলোই যেন বেশি ভাল ছিল, যখন মসনদ পাইনি।
কিন্তু সত্যিই কি জাঁহাপনা সেই দিনগুলো ফিরে পেতে চান? মসনদ পাবার আগেকার দিন?
সে কি আর পাওয়া সম্ভব?
মরিয়ম বেগম বললে–সবই সম্ভব জাঁহাপনা, সম্ভব সবই।
কী করে তা সম্ভব বলে দাও
আপনি সকলকে একসঙ্গে বরখাস্ত করে দিন। আমি যাদের যাদের নাম করব তাদের সকলকে বরখাস্ত করে দিন।
নবাব বললে–এখন ফরাসিদের সঙ্গে ইংরেজদের লড়াই বেধেছে, ওদিকে আহমদ শা আবদালি বাংলা মুলুকের দিকে আসছে, এই সময়ে সকলকে বরখাস্ত করব কী করে?
