মরালী ফিরে আসতেই কান্ত জিজ্ঞেস করেছিল–তুমি কোন সাহসে গেলে মরালী?
মরালী বলেছিল–কেন, আমি তো নবাবের ভালর জন্যেই গিয়েছিলাম
সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে তোমার ভয় করল না?
মরালী বলেছিল চেহেল্-সুতুনে আসতেই যখন ভয় করেনি তখন পেরিন সাহেবের বাগানে যেতেই বা ভয় করবে কেন?
কান্ত বলেছিল কিন্তু কেন তুমি চেহেল্-সুতুন ছেড়ে এখানে এলে? কেমন করে এলে? সঙ্গে একটা বাঁদি নাওনি, খোঁজা নাওনি, তোমার ভয় করল না?
মরালী বললে–ভয় হয়েছিল প্রথমে
তা হলে? তা হলে কী করে ভয় কাটল?
আর একজনের কথা ভেবেই ভয় কেটে গেল!
কান্ত জিজ্ঞেস করলে কার কথা ভেবে? নবাবের কথা?
মরালী বললে–প্রথমে নবাবের কথা ভেবেই কলকাতায় এসেছিলুম, কিন্তু আর একজনের কথা ভেবে ক্লাইভসাহেবের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলুম
কার কথা?
সেকথা এখন তোমায় বলব না। নবাবকেও বলিনি। আমার এত কষ্ট করা সব বোধহয় মিথ্যে হয়ে গেল। নিজেও সুখ পেলুম না, অন্যকেও সুখী করতে পারলুম না।
বলতে বলতে মরালীর মুখখানা কেমন ছলছল করে উঠেছিল সেদিন।
সত্যিই তখন কি মরালী জানত যে, যাকে নবাবের হাত থেকে বাঁচাবার জন্যে রানিবিবির ছদ্মবেশ পরে চেহেল সুতুনে এসেছিল, সেই হাতিয়াগড়ের ছোট বউরানিই আবার কোন ঘটনাচক্রে পড়ে ক্লাইভ সাহেবের ছাউনিতে গিয়ে উঠবে! তা হলে তার এত কাণ্ড করার দরকার কী ছিল।
কান্ত বলেছিল–চলো না মরালী, আমরা কোথাও চলে যাই
কোথায়?
কান্ত বলেছিল–এসব যুদ্ধ-লড়াইয়ের মধ্যে কেন থাকি আমরা। যারা নবাবের আশেপাশে রয়েছে দেখছি, তারা সবাই স্বার্থপর। কেবল নিজের নিজের সুবিধে আদায় করে নেবার জন্যে ঘুরঘুর করছে। আমি যত দেখছি ততই মনটা বিষিয়ে উঠছে মরালী–আমার আর ভাল লাগছে না–
মরালী বললে–আমার কি ভাল লাগছে বলতে চাও?
তোমার যদি ভাল না লাগে তো কেন এখানে এলে? চলো না, কোথাও চলে যাই–চলোনা, এখান থেকে গেলে কেউ জানতে পারবে না, কেউ ধরতে পারবে না।
মরালী বললে–গেলে তো যাওয়া যায়। আগে হলে হয়তো যেতে পারতুম, কিন্তু এখন যে আটকে গেছি, এখন যে বাঁধা পড়ে গেছি একেবারে
কীসের বাধা তোমার? কে তোমার আছে এখানে?
কী বলল তুমি? কেউ নেই? আমি যদি যাই তো হাতিয়াগড়ের ছোট বউরানির কী হবে? তখন তো তাকে নিয়েই টানাটানি পড়বে। আর তা ছাড়া তুমি তো জানো না,নবাবকে ছেড়ে আর যেতে পারব না।
যে তোমার সব দুঃখ-কষ্টের মূলে তার জন্যে তোমার এত দরদ?
আমার কষ্টের জন্যে কি নবাব দায়ী? যদি দায়ী হত তো আমি এখনই নবাবকে লাথি মেরে পালিয়ে যেতাম।
তা হলে কে দায়ী?
তবু তুমি তা শুনতে চাও? তুমি যদি দেরি করে সেদিন বিয়ে করতে না আসতে, তা হলে আমিই কি ছোটমশাইয়ের বাড়িতে বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে যেতাম, না রানিবিবি সেজে চেহেল্-সুতুনেই আসতে হত?
কান্ত বললে–একটা অপরাধ করে ফেলেছি বলে তার গুণোগার তো এতদিন ধরেই দিচ্ছি। আর কত গুণাগার দেব বলো?
সে কথা এখন আর ভেবে কী হবে!
গুণোগারেরও তো একটা শেষ আছে! সেই জন্যেই তো মুর্শিদাবাদে একবার গণতকারকে নিজের হাতটা দেখিয়েছিলুম।
মরালী বলেছিল ওসব কথা অনেকবার শুনেছি, যা হবার নয় তা নিয়ে কথা বলতে ভাল লাগে না। যখন চেহেলসূতুনেই চিরকাল থাকতে হবে তখন চেহেসতুনের কী করে ভাল হয় সেই কথা ভাবাই ভাল। আমি কেবল ভুলতে চেষ্টা করি যে আমি মরালী
কিন্তু সেই উদ্ধব দাস? সে কী করল? তার কী অপরাধ!
অপরাধ তার নয়, অপরাধ আমার কপালের, আর যে-মুখপোড়া আমাকে তৈরি করেছিল সেই ভগবানের! তোমার পায়ে পড়ি, এসব কথা আর তুলো না আমার সামনে। আমার ওসব কথা ভাবতেও ভাল লাগে না। নইলে যেদিন ওরা আমার সিথির সিঁদুর তেল দিয়ে ঘষে ঘষে মুছে দিয়েছে, সেই দিনই আমার নাম মরিয়ম বেগম হয়ে গেছে। ধরে নাও আমি মরে গেছি।
ছি।
বলেই কান্ত মরালীর মুখখানা নিজের হাত দিয়ে চাপা দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু মরালী তার আগেই নিজের ঘরের ভেতর চলে গিয়েছিল। যাবার সময় বলে গিয়েছিল–আমি নবাবের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি, দেখো কেউ যেন এ সময়ে ওখানে না ঢোকে–
তারপর নানিবেগমসাহেবা আর মরিয়ম বেগম নবাবের সঙ্গে দেখা করেছিল। ইতিহাসের সে এক সন্ধিক্ষণ। নবাব তখন নিঃসহায় সর্বস্বান্তের মতো চুপ করে অপেক্ষা করছিল। নানিবেগম আর মরিয়ম বেগম ঘরে যেতেই চমকে উঠল।
বললে–তোমরা কেন এসেছ?
নানিবেগম আগে উত্তর দিলে। বললে–তোর জন্যেই ভেবে ভেবে এখানে চলে এলুম মির্জা, তোর জন্যে আমাদের বড় ভাবা হয়েছিল রে, তুই একলা আছিস
নবাব বললে–কে বললে–একলা আছি, এখানে আমার সবাই আছে, জগৎশেঠজি নিজের দেওয়ানকে পাঠিয়ে দিয়েছে, ইরাজ খাঁ সাহেব আছেন, কে নেই আমার? তুমি কি ভাবো তোমার মির্জা সেই ছেলেমানুষই আছে আগেকার মতন? মির্জা মসনদ চালাতে পারে না?
না না, সে কথা বলব কেন? কিন্তু মরিয়ম মেয়ে যে বললে–তোর খুব বিপদ
কীসের বিপদ? নবাব এতক্ষণে মরিয়ম বেগমের দিকে চেয়ে দেখলে!
মরিয়ম বেগম বললে–আমি জানি আপনার বিপদ জাঁহাপনা
তুমি চেহেল্-সুতুনে বসে কী করে জানলে আমার বিপদ?
মরিয়ম বেগম বললে–আমি চেহেল্-সুতুনে বসেই তো জানতে পেরেছিলুম জাঁহাপনা যে, সফিউল্লাসাহেব আপনার সর্বনাশ করতে চাইছে, আমি তো সেই দিনই জাঁহাপনাকে সাবধান করে দিয়েছিলম। তবে আজ কেন আমাকে একথা জিজ্ঞেস করছেন? আপনি উমিচাঁদ সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেই সব টের পেতেন। আপনি জিজ্ঞেস করেছিলেন তাকে?
