নীচেয় কারও নাম নেই। না থাক, বুঝতে কষ্ট হয় না উমিচাঁদের লেখা
একখানা কাগজে ক্লাইভ লিখলে–গুলাব-কেফুল। তারপরে খামের মুখটা আঠা দিয়ে এঁটে সেপাইটার হাতে দিয়ে বললে–এই নাও–সোজা হুগলির ফৌজদার সাহেবের বাড়ি দিয়ে আসবে, কিছু বলতে হবে না
দুর্গা সাহেবের মুখখানার দিকে চেয়ে অবাক হয়ে গেল। এই এতক্ষণ বেশ হেসে হেসে কথা বলছিল তার সঙ্গে, আর এখনই মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল কেন?
হ্যাঁ বাবা, একটা কথা বলব?
কী দিদি, বলো?
তোমার মুখটা মাঝে মাঝে অমন গম্ভীর হয়ে যায় কেন বলো দিকিনি বাবা! বেশ হাসিখুশি আছ, আর হঠাৎ কী হয়? কার কথা ভাবো?
ক্লাইভ বললে–কিছু মনে কোরো না দিদি, আমার একটা রোগ আছে—
রোগ? সেকী?
হ্যাঁ দিদি, রোগ! ওই একটাই আমার রোগ। আমার নার্ভ মাঝে মাঝে অসাড় হয়ে যায়, তখন কিছু ভাল লাগে না। মাঝে মাঝে আমার এত ব্যথা হয় যে, আমি অজ্ঞান হয়ে যাই
দুর্গা বললে–অজ্ঞান হয়ে যাও?
হ্যাঁ দিদি, অজ্ঞান হয়ে যাই, ছোটবেলা থেকে রোগটা আমার আছে, এই রোগের যন্ত্রণায় এক-একবার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করে, ভীষণ ব্যথা হয়
আহা গো, তা কবিরাজ দেখাও না কেন? হাকিম দেখালেও তো পারো! রোগ পুষে রাখা তত ভাল নয় বাছা, বিদেশ-বিভূঁইয়ে এসে শেষে কি বেঘোরে প্রাণটা দেবে?
ক্লাইভ বললে–আমার নিজেরও তাই ভয় হয় মাঝে মাঝে
তবে বাবা তুমি একটু শুয়ে পড়ো, আমি যাই, একটু গড়িয়ে নাও। খাওয়াদাওয়ার সময়ের ঠিক নেই, ঘুমেরও ঠিক নেই, পিত্তি তো পড়বেই! এক কাজ করতে পারো না, ভোরবেলা উঠে খালিপেটে ছোলা ভিজোনো জল খেতে পারো না? ও পিত্তির ব্যথা, আমারও আগে হত, এখন সেরে গেছে
ক্লাইভ সাহেব কিছু উত্তর দিলে না দেখে দুর্গা ভেতর দিকে চলে গেল। বললে–আমি চললুম, তুমি একটু গড়িয়ে নাও
হায় রে, গড়িয়ে নিলেই যেন চলবে! খবরটা অ্যাডমিরাল ওয়াটসনকে দিতে হবে। দুর্গা চলে যেতেই বাইরের পাহারাদারকে ডাকলে–আর্ডালি
অগ্রদ্বীপে নবাবের ছাউনির ভেতরে সমস্ত আবহাওয়া যেন তখন থমথম করছে। কাল রাত থেকেই নবাব খুব মেজাজ গরম করেছে। মিরবকশি থেকে শুরু করে ছোটখাটো চৌকিদারটা পর্যন্ত ভয়ে তটস্থ হয়ে আছে। উমিচাঁদ সাহেব আর হুগলির ফৌজদার নন্দকুমার সাহেবকে জরুরি তলব দিতে ডেকে পাঠানো হয়েছে।
.
পাশের ছাউনি থেকে হঠাৎ মরিয়ম বেগমসাহেবার ডাক এল কান্তর কাছে।
মরিয়ম বেগমসাহেবা কান্তবাবুকে এত্তেলা দিয়েছে।
যাচ্ছি–
বলে কান্ত পাশের কামরায় গেল। কামরার পরদা তুলে দেখলে মরালীর একেবারে অন্য চেহারা। একখানা লাল ওড়নি মাথায় ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে।
আমাকে আবার এসময়ে ডাকলে কেন? নবাব খুব বের হয়ে রয়েছে; যদি জানতে পারে?
মরালী বললে–একটা জরুরি কথা, পরদার ফাঁক দিয়ে দেখছিলাম কদিন ধরে একটা লোকের সঙ্গে ফিসফিস করে কথা বলছ, ও লোকটা কে?
রোগা লম্বা মতন ছেলেটা? ওরই নাম তো শশী। ওর কথাই তো তোমাকে লিখেছিলুম।
ওর সঙ্গে তোমার কীসের এত কথা?
কান্ত মরালীর মুখের দিকে চেয়ে যেন ভয় পেয়ে গেল।
ও কেবল জিজ্ঞেস করে ভেতরের খবরাখবর।
কীসের খবর?
কান্ত বললে–এই যুদ্ধ বন্ধ হলে ওর চাকরি চলে যাবে ফৌজ থেকে, তাই খুব ভয় ওর। ও জানতে চায় যুদ্ধ হবে কি হবে না–ছেলেটা ভাল, খুব নিরীহ গোবেচারি মানুষ!
মরালী গম্ভীর গলায় বললে–তা হোক, ওর সঙ্গে এত কথা বলতে হবে না, ও-লোকটা ভাল নয়।
না না, আমি বলছি, খারাপ লোক নয় তেমন!
তা যোক ভাল লোক, তবু ওর সঙ্গে কথা বোলো না। ও কারও চর নিশ্চয়ই
বা রে, তুমি কী করে জানলে?
আমি যা বলছি শোনো, ওর সঙ্গে এত কথা বলতে হবে না, আমি গোঁফ দেখলে লোক চিনতে পারি, ও নিশ্চয়ই কারও চর, ওর ছায়া মাড়াবে না।
হঠাৎ বাইরে কীসের শব্দ হল। তারপর বোঝা গেল, ঘোড়া ছুটিয়ে কারা আসছে এদিকে
মরালী বললে–যাও, এবার চলে যাও, উমিচাঁদ আর নন্দকুমার এসে গেছে, নবাবের ঠিক পাশে পাশে থাকবে তুমি, সব দিকে নজর থাকে যেন, যাও
*
অষ্টাদশ শতাব্দীর মানুষ বুঝি অস্থায়ী যুগের মানুষ। সুখ, ঐশ্বর্য, দুঃখ, জী, সমস্তই তখন অস্থায়ী। তবু বোধহয় অস্থায়ী জিনিসের ওপর মানুষের কোনওদিনই আস্থা নেই। তাই সেই ক্ষণস্থায়ীকে স্থায়ী করবার জন্যে হুগলির ফৌজদার নন্দকুমার অত ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল। নইলে তিন লাখ যার বার্ষিক খেলাত তার পক্ষে মাত্র বারো হাজার টাকায় নবাবের এত বড় ক্ষতি করা সম্ভব হত না।
নবাবের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে, নবাব যখন জবাবদিহি চাইলে তখন সেই যুক্তিই দিলে ফৌজদার সাহেব।
বললে–জাঁহাপনা কী করে ভাবতে পারলেন যে, আমিনবাবের দুশমনদের কাছ থেকে টাকা নেব? নবাব তো আমার কোনও ক্ষতি করেননি যে, আমি নবাবের ক্ষতি করব?
নবাবের গলা বড় গম্ভীর। কিন্তু কান্তর মনে হল নবাব যেন নন্দকুমারের সামনে করজোড় প্রার্থনা জানাচ্ছে। মনে মনে বড় কষ্ট হতে লাগল কান্তর। নবাবের সামনে দাঁড়িয়ে যে-লোক এমন করে মিছে কথা বলতে পারে তাকে তো কেটে ফেলা উচিত। কোতল করা উচিত। এরা কি বোঝে না যে নবাবের ক্ষতি মানে সকলের ক্ষতি? নবাব বাঁচলেই তো সবাই বাঁচবে। নবাবের পর যদি আহমদ শা আবদালি এই বাংলাদেশে আসে, সে কি আর আমাদের এমন করে বাঁচাবে! সে তো লুটপাট করে দেশ-গাঁ উজাড় করে সবাইকে ভিটে-মাটি ছাড়া করবে! আর এই যে মরালী নবাবকে না বলে সাহেবের সঙ্গে দেখা করে এল, অন্য নবাব হলে কি এত বড় গুণাহ বরদাস্ত করবে!
