চিঠিটা শেষ করে ক্লাইভ চিঠির মুখটা বন্ধ করতে যাচ্ছিল। তাড়াতাড়ি চিঠিটা হোমের ডাকে না দিলে আবার যাবে না। আর এই জাহাজে যদি না যায় তো আবার কবে যাবে, তার কোনও ঠিক নেই। এই চিঠিটাই পৌঁছোতে সাত মাসও লাগতে পারে, আট মাসও লাগতে পারে–
তুমি আছ নাকি সাহেব?
হ্যাঁ দিদি, কী হল?
দুর্গা বাইরে থেকে ভেতরে ঢুকল–তুমি তো বাবা আমাদের বলোনি, হরিচরণ বললে, তাই জানতে পারলুম!
কার কথা বলছ দিদি? আমি তো ঠিক বুঝতে পারছি না?
তোমরা নাকি লড়াই করতে যাচ্ছ আবার! তা হলে আমরা কোথায় থাকব?
কেন দিদি, তোমরা এখানেই থাকবে! তোমাদের সমস্ত ব্যবস্থা তো আমি করে দিচ্ছি।
তা তুমি থাকবে না এখানে, তা হলে আমরা কী করে থাকব? কার ভরসায় থাকব?
ক্লাইভ বললে–বাঃ, আমি কি বরাবরের মতো চলে যাচ্ছি? তোমাদের পাহারা দেবার জন্যে আমি তো তোক রেখে যাচ্ছি–
তা নবাবের সঙ্গে তোমাদের লড়াই যখন মিটে গেছে, এবার আমাদের বাড়ি পাঠিয়ে দাও না বাবা, আর কদ্দিন এরকম করে ছন্নছাড়া হয়ে থাকি? আমাদের বাড়ি পাঠাবার একটা ব্যবস্থা করে দাও না আমরা যে আর পারিনে বাবা
ক্লাইভ বললে–তোমাদের কষ্ট যে হচ্ছে, তা কি আর বুঝতে পারছি না? কিন্তু নবাবের সঙ্গে মিটমাট হয়েছে, কে বললে–তোমায়? নবাব এখনও যে আমার পেছনে লেগে রয়েছে। এই দেখো না, আমাদের সঙ্গে নবাবের যে কথা হয়েছে, সেকথার আবার খেলাপ করতে চাইছে।
তা তোমরা এত সব বড় বড় বীর রয়েছ, নবাবকে মেরে ফেলতে পারছ না? অমন হতচ্ছাড়া নবাব থেকে লাভটা কীসের? বউ-ঝি যে-দেশে ঘরে নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে না, সে-দেশের নবাবের মুখে ঝাটা মারি।
দাঁড়াও না দিদি, আর দুটো দিন সবুর করো, তোমাদের নিশ্চিন্তে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে তবে আমি দেশ ছেড়ে যাব!
দেশ ছেড়ে যাবে মানে!
ক্লাইভ হাসতে লাগল বা রে, আমার নিজেরই বুঝি ঘরবাড়ি নেই? আমার নিজের বুঝি বাপ-মা’কে দেখতে ইচ্ছে করে না? আমার বউ ছেলেমেয়ে বুঝি নেই ভেবেছ?
ওমা, তাই নাকি? তোমার মা বেঁচে আছে?
কেন, বেঁচে থাকবে না কেন? আমি এখানে এসে যুদ্ধ করে বেড়াই বলে আমার বাবা-মা থাকবে না?
দুর্গা কপালে হাত দিলে।
ও আমার কপাল! তবে যে হরিচরণ বললে, তোমার মা মারা গেছে বলে তুমি নাকি আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদো?
হরিচরণ বলেছে তোমাদের ওই কথা? আরে, আমার মা বেঁচে আছে কি না, তা আমার আর্ডালি জানবে কী করে?
বলে ডাকতে লাগল আর্ডালি, আর্ডালি—
দুর্গা বললে–না বাবা, ওকে আর তুমি বোকো না। ও হয়তো বুঝতে পারেনি। কী বুঝতে কী বুঝে ফেলেছে। যাক গে, শুনে মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল বাবা। সত্যিই তো, তুমি এমন ভাল লোক, তোমার মা কেন মারা যাবে। আহা, তোমার মা বেঁচেবর্তে থাক। আশীর্বাদ করি, এবার যুদ্ধটুদ্ধ ছেড়ে দেশে ফিরে গিয়ে মায়ের কোল-জোড়া হয়ে থাকো। যাই বলো, তোমাদের চাকরি কিন্তু বড় বিচ্ছিরি চাকরি বাবা। এমন চাকরি আর কক্ষনও নিয়ো না। তোমার ছেলেমেয়ে বউ–তাদের ছেড়ে বা আছ কী করে বাবা এই এত দূরে? তাদের জন্যে তোমার মন কেমন করে না?
ক্লাইভ সেই রকমই হাসতে লাগল।
বললে–মন কেমন করলে কি চলে দিদি? তোমাদের দেশের মতো আমাদের দেশে এমন আরাম তো নেই। সে ঠান্ডার দেশ, তোমাদের দেশ থেকে মালমশলা গেলে তবে আমরা খেতে পাই, তা জানো? বউ-ছেলেমেয়ে-পরিবার ছেড়ে না-এলে চলবে কেন? দেশের লোক খাবে কী?
দুর্গা বললে–তা ভাল, তুমি কাজকম্ম তো যথেষ্ট করলে, এখন আমাদের একটা হিল্লে করে দিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাও, বাপ-মা’র প্রাণটা জুড়োক
তা তোমাদের ভাবতে হবে না দিদি, আমি যেখানেই যাই না কেন, তোমাদের একটা ব্যবস্থা করে দেবই–
কিন্তু তুমি চলে গেলে যদি আবার সেই পাগলা বাউন্ডুলেটা আসে?
কে? সেই পোয়েট?
পোয়েট ফোয়েট বুঝিনে বাবা, তাকে এখানে ঢুকতে দিলে আমি একশা কাণ্ড করে বসব, তা বলে রাখছি।
হঠাৎ বাইরে থেকে একজন সেপাই একটা চিঠি নিয়ে এল। ক্লাইভ সাহেবের মুখখানা কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে।
বললে–তুমি একটু বসো দিদি, আমি আসছি—
বলে বাইরে বারান্দায় এসে খামটা খুলে চিঠিটা পড়তে লাগল। দিয়েছে হুগলি থেকে উমিচাঁদ।
লিখেছে–সাহেব, আমি তোমার কথামতো হুগলির ফৌজদার নন্দকুমারের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। লোকটা বামুন হলে কী হবে, এক নম্বরের ফেরেব্বাজ। টাকার জন্যে লোকটা সব করতে পারে। আমি তাকে টাকার লোভ দেখাব, যাতে তোমাদের বিরুদ্ধে ফৌজ না পাঠায়। তোমরা চন্দননগরে হামলা করলেও সে চুপ করে থাকবে হাত-পা গুটিয়ে, এই শর্তে তাকে আমি দশ-বারো হাজার টাকা ঘুষ দেবার কথা বলব। তুমি এই লোকের মারফত শুধু একটা কথা লিখে নন্দকুমারের কাছে পাঠিয়ে দাও–’গুলাব কে ফুল’। আমি যেই ফৌজদারের দফতর থেকে বেরিয়ে আসব, তখনই যেন সে সেই চিঠিটা নিয়ে গিয়ে ফৌজদারকে দেয়। তোমার যে টাকা দেবার অমত নেই, সেইটেই কথাটার মানে, তা । আমি তাকে বুঝিয়ে বলব। চিঠিটা খুব সাবধানে নিয়ে যেতে বলবে সাহেব। চারদিকে নবাবের চর পিলপিল করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি আর ওয়াটসাহেব মুর্শিদাবাদ যাচ্ছি। নবাব এখন অগ্রদ্বীপেছাউনি করেছে। এই সঙ্গে আর-একটা কথা তোমাকে জানিয়ে রাখি–নবাবের এক বেগম মুর্শিদাবাদ থেকে এসেছে। সঙ্গে নানিবেগমসাহেবা আছে। নবাবের দিদিমা। বড় জাহাবাজ মেয়েমানুষ ওই মরিয়ম বেগমসাহেবা। আমাদের সব খবরদারি করবার জন্যে চর লাগিয়েছে। আমাদের ইয়ার সফিউল্লা সাহেবকে ওই মাগিটাই খুন করেছে। খুব সাবধান। ও-মাগিটার কাছে পেট কাপড়ে সব সময় ছোরা থাকে। বলা যায় না, ওই বেগম হয়তো অন্য কোনও ছুত করে তোমাদের বাগানেও যেতে পারে। মেয়েমানুষ বলে যেন রূপ দেখে গলে যেয়ো না। তোমার তো আবার মেয়েমানুষের ওপর দুর্বলতা আছে। ও মাগি সব পারে খুব সাবধান। এদিকে আমার দ্বারা তোমাদের যা উপকার করা সম্ভব, তা করছি। ভবিষ্যতেও আরও করব। আশা করি, আমার কথা তোমরা ভুলে যাবেনা। সুদিন এলে আমাকে নিশ্চয়ই তোমরা মনে রাখবে আশা করি।
