বলে চলে গেল ভেতরে। আর তার একটু পরেই হাসতে হাসতে বাইরে এল।
বললে–কিন্তু উমিচাঁদসাহেব, ঠাকুর বলছেন–তুই বারো হাজার টাকা নে–
উমিচাঁদ বললে–আপনার ঠাকুর নিজের মুখে বলেছে? তা হলে বারো হাজারের এক দামড়ি কম নেবেন না–বারো হাজারই নিয়ে নিন
দেবে তো?
নিশ্চয়ই দেবে। আপনি টাকা না দিলে কাজ করবেন না। মিছিমিছি কাজ করতে যাবেন কেন? কাচ্চাবাচ্চা নিয়ে আমরা ঘর করি, টাকা না পেলে কাজ করব কেন? আপনি এক কাজ করুন। আপনি আমার কথার ওপর বিশ্বাস করবেন না। আমি সোজাসুজি লোক পাঠাচ্ছি ক্লাইভসাহেবের কাছে। ক্লাইভসাহেব যদি উত্তরে লিখে পাঠায় গোলাপ ফুল’তা হলে বুঝে নেবেন সাহেব আপনার কথায় রাজি, আর যদি কিছু উত্তর না আসে বুঝতে হবে গররাজি
আমাকে তা হলে কী করতে হবে?
আপনাকে কিছুই করতে হবে না। ফরাসিদের কাছে নবাবের দেওয়া টাকাটা পাঠাতেও হবে না, ইংরেজরা যখন চন্দননগর হামলা করতে যাবে তখন শুধু আপনি আপনার ফৌজ নিয়ে হুগলিতে ঠুটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকবেন, বুঝলেন? তা হলে আমি চলি?
উমিচাঁদ সাহেব চলে গেল।
বারো হাজার টাকা! বারো হাজার টাকা মবলক পাওয়া গেল। ঘরের মধ্যে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল নন্দকুমার ফৌজদার সাহেব। ব্রাহ্মণ বংশে জন্মে এমন চাকরি হবে, এত টাকা হবে, বাপ-মা কি ভাবতে পেরেছিল! হঠাৎ বাইরে আবার ঘোড়ার খুরের শব্দ হল। এই ঘোড়ার খুরের শব্দটাকেই ফৌজদার সাহেবের যত ভয়। কখন হঠাৎ ডাক আসে মুর্শিদাবাদের দরবারে, কখন উজির-এ-আজম আসে, সেই ভয়েই ওষ্ঠাগত হতে হয়। নইলে বেশ চাকরি। তখত-এ-তাউসে বসে ঘুমোলেও কেউ কিছু বলবার নেই। বেশ চায়েন, বেশ আরাম।
হুজুর! কৌন? ফিরিঙ্গি কোঠি থেকে হরকরা এসেছে। দিশি হরকরা। কুর্তা-কামিজ পরা। এসেই ফৌজদার সাহেবকে মাটি পর্যন্ত মাথা নিচু করে সেলাম করলে। তারপর একটা লেফাফা এগিয়ে দিলে। দিয়ে আবার চলে গেল কুর্নিশ করে। হুকুমবরদারও চলে গেল।
ফাঁকা ঘরের মধ্যে নন্দকুমার লেফাফাখানার মুখ ছিঁড়ে ফেললে। ভেতরে একটা সাদা কাগজ শুধু। তার ওপর ফারসিতে বড় বড় হরফে লেখা–গুলাব কে ফুল।
কে লিখছে, কেন লিখছে, কোথা থেকে লিখছে, কিছুই লেখা নেই তাতে। না থাক, ফৌজদার সাহেব লেফাফাখানা নিয়ে মাথায় ঠেকালে। জয় মা কালী, জয় মা জগদম্বা, ভাগ্যিস তুমি বুদ্ধি দিয়েছিলে। নইলে তো চার হাজার টাকা লোকসান হয়ে যেত! জয় মা বগলামুখি, আজ তোমায় সোনার রেকাবিতে সিন্নি চড়াব। হিরের চামর দিয়ে তোমায় বাতাস করব, গঙ্গাজলের বদলে আজ খাঁটি গোরুর দুধ দিয়ে তোমার চরণামৃত বানিয়ে দেব! জয়, জয় করালবদনি। জয় হোক তোমার
*
অনেক কাজের ভিড়ে যেন শান্তি ছিল না ক্লাইভ সাহেবের। শুধু নবাবের ভাবনাই নয়। সেই আর্কট থেকে যে ভাবনার শুরু হয়েছে, সেই ভাবনাটাই বেড়ে বেড়ে এখন যেন সমস্ত মানুষটাকেই গ্রাস করেছে। এমনি মাঝে মাঝে হয় ক্লাইভ সাহেবের। মনে হয় কোথাও গিয়ে একটু বিশ্রাম নিলে ভাল হত। কিন্তু কে দেবে রেস্ট? কে আছে এখানে ক্লাইভ সাহেবের? নিজের পার্সোনাল আর্দালি ছিল একটা, হরিচরণ, তাকেও দিয়ে দিয়েছে ওদের কাছে।
অনেকদিন আগে মাদ্রাজে থাকার সময় এইরকম হয়েছিল। মনটা কেবল নিজের হোমে ফিরে যেতে চাইত। এই ব্যথাটা যখন হত তখনই বাড়ির কথা মনে পড়ত।
বাইরের দিকে চেয়ে দেখলে ক্লাইভ সাহেব। ফৌজ রেডি রয়েছে। তারও ওদিকে নবাবের সেপাইরা তাঞ্জামটা নিয়ে চলে যাচ্ছে। একটা পেটি বেগম, তারও তেজ কত! এতগুলো বেগম একজন নবাবকে কী করে ভালবাসতে পারে! ইন্ডিয়াতে না এলে এটাও তো দেখা হত না। সবাই বলেছে ওরা নাকি স্লেভস। হরিচরণকে জিজ্ঞেসও করেছে কতবার।
হরিচরণ বলেছে–আজ্ঞে হুজুর, আমি তো কখনও বেগমদের দেখিনি-ওরা সব বাঁদির মতন
বাঁদি মানে?
বাঁদি মানে চাকরানি, হুজুর। হারেমের বাইরে বেরোতে পারে না বেগমসাহেবারা।
কারও সঙ্গে কথা বলতে পারে না?
না হুজুর, বাইরে বেরোলে বোরখা পরতে হয়।
তা হলে কোনও পুরুষমানুষ নেই সেখানে?
না হুজুর, শুধু খোজারা আছে
সাহেব বুঝেছিল ইউনাক! স্ট্রেঞ্জ! স্ট্রেঞ্জ এই ইন্ডিয়া আর স্ট্রেঞ্জ এই ইন্ডিয়ার নবাব। বহুদিন পরে বাবাকে একটা চিঠি লিখেছিল রবার্ট। সেই তার ওয়ার্থলেস ছেলে রবার্ট! লিখেছিল–এখানে সবই অদ্ভুত বাবা। এখানকার নবাব অনেকগুলো বিয়ে করে। একটা অ্যাপার্টমেন্ট থাকে, তাকে ওরা বলে জেনানা হারেম। সেখানে এরা এদের মিস্ট্রেসদের পুরে রাখে। এখানে পলিগেমি খুব চলছে। একটা লোক এখানে একশো-দুশো ওয়াইফ রাখতে পারে! কেউ নিন্দে করে না সে-জন্যে। মেয়েদের এরা স্লেভ করে রাখে। কিন্তু আজ একটা বেগমের সঙ্গে দেখা হল, দেখলাম, সে ইনটেলিজেন্ট। আমার ধারণা ছিল, যারা অনেক বিয়ে করে, তাদের ওয়াইফরা তাদের হেট করে। তা নয়। এ-বেগমটা তার হাজব্যান্ডকে বেশ রেসপেক্ট করে দেখলাম। খুব ভাল মেয়ে বলে মনে হল। ইন্ডিয়ান মেয়েদের সম্বন্ধে ক্রমেই আমার ধারণা বদলে যাচ্ছে। যে-হিন্দু বউটাকে আমার এখানে শেলটার দিয়েছি, সে-ও খুব রেসপেক্টেবল লেডি। কিন্তু আশ্চর্য, তার বিয়ে হয়েছিল একজন পোয়েটের সঙ্গে। পোয়েটটা খুব ভাল লোক। বেশ ব্রড আউটলুক। সে মানুষকেই গড মনে করে পুজো করে। তার কাছে মানুষই গড। তার কাছে বেশ নতুন লাইট পেলাম। কয়েকদিন আগে সিলেক্ট কমিটির কাছে খবর এসেছিল যে, ফ্রান্সের সঙ্গে আমাদের ওয়ার বেধে গেছে। আমার ওপর কাউন্সিলের অর্ডার হয়েছে, এখানকার ফ্রেঞ্চ টেরিটোরি চন্দননগর অ্যাটাক করবার জন্যে। আমি তাই নিয়ে খুব ব্যস্ত আছি। আমি বেঙ্গলের মিলিটারি অ্যাফেয়ার্সটা সেটেল করতে পারলেই আর একবার ওখানে যাব। ভাই-বোন আর মা’কে আমার ভালবাসা দিয়ো। তুমি আমার বেস্ট রিগার্ডস নিয়ো–আই অ্যাম ইয়োরস
