কিন্তু হঠাৎ আপনার কাছ থেকে টাকা নিতে যাবই বা কেন? আমি কী এমন পুণ্য করেছি? আমি তো মন্তর-দেওয়া বামুন নয়।
বলি, কলকাতার কিছু খবর রাখেন? কলকাতার হালচালের?
নন্দকুমার বললে–কলকাতার খবর না রাখলে কি আর ফৌজদারি চালাতে পারি? শুনছি তো এখন আর নবাবের আমল নয়, এখন মরিয়ম বেগমের আমল। শেষকালে নাকি আলিবর্দি খাঁ’র সনদ চালাচ্ছে একজন মেয়েমানুষ!
উমিচাঁদ সাহেব বললে–আরে ওই ত। মেহেদি নেসারটার কাণ্ড! লোকটা নিজে ম তাল, নবাবের সঙ্গে অত দহরমমহরম, কিন্তু আখেরের কাজ গুছিয়েই নিতে পারলে না। কোথা থেকে কোন হাতিয়াগড়ের বউটাকে এনে হারেমে পুরে দিয়েছিল, সে মাগিও তেমনি জাঁহাবাজ, এখন েেহদি নেসারের পেছনে কাঠি দিচ্ছে।
কী রকম?
আর কী রকম! আমাদের আর পাত্তাই দিতে চায় না নবাব। সকলকে বাতিল করে দিতে শুরু করেছে। ওর দাদামশাই বুড়ো নবাব আমাকে বিশ্বাস করত, আমাকে বিশ্বাস করে মনের কথা বলত, এবার দেখি একেবারে উলটো! আমাকে মানতেই চায় না। আমরা কারবার করে খাই। আমাকে বলে কিনা, আমি নবাবকে খুন করবার মতলব করেছি। বলে কিনা, আমার হাতের লেখা চিঠি পেয়েছে সফিউল্লার কাছে। সফিউল্লা সাহেব খুন হয়ে গেছে, শুনেছেন তো?
তাই তো শুনলুম!
ওই মরিয়ম বেগমই তাকে খুন করে সাবাড় করে দিলে। আমি খুন করলে আমার তো গর্দান চলে যেত, আর মরিয়ম বেগমের বেলায় উলটো হল। একেবারে নবাবের নেকনজর পেয়ে গেল। নেকনজর পেয়ে এখন আমাদের ওপর চোখ রাঙায় আবার!
দেখতে খুব উমদা নাকি?
আরে টাকার চেয়ে তো আর দুনিয়ায় উমদা চিজ কিছু নেই, তবে? নাকি কিছু অন্যায় কথা বলেছি আমি, বলুন?
তা তো বটেই!
উমিচাঁদ সাহেব বললে–সেই জন্যেই তো আপনার কাছে এলাম ফৌজদারসাহেব, আপনি নবাবের কাছ থেকে কিছু নির্দেশ পেয়েছেন?
পেয়েছি!
তাই বলুন! আমাকে ক্লাইভসাহেব লিখেছে যে! ক্লাইভসাহেবকে চেনেন তো?
খুব চিনি।
উমিচাঁদ সাহেব বললে–তা হলে একটা কাজ করতে হবে দাদা, আপনিই করতে পারেন, আপনি ছাড়া আর কারও করবার ক্ষমতা নেই! টাকা যা চান তা দেওয়া যাবে।
টাকা! নন্দকুমার সাহেবের মুখ দিয়ে ফস করে কথাটা বেরিয়ে গেল। কে টাকা দেবে?
কেন, ফিরিঙ্গি কোম্পানি দেবে!
কত টাকা দেবে?
যা চান আপনি!
ফৌজদার সাহেব বললে–কী করতে হবে আমাকে?
আপনাকে এমন কিছু কঠিন কাজ করতে হবে না। ইংরেজরা ফৌজ নিয়ে চন্দননগর দখল করতে যাবে, আপনি মোট কথা বাধা দেবেন না, ফৌজ দিয়েও বাধা দেবেন না
ফৌজদার সাহেব কথাটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
উমিচাঁদ সাহেব বললে–আরে মশাই, এতে ভাবার কিছু নেই। এমন হাতিঘোড়া কাজ কিছু নয়। এটা, আসলে তো আপনার নবাবও যা, ও ক্লাইভসাহেবও তাই।
সে কী রকম?
উমিচাঁদ সাহেব বললে–আরে মশাই, চারদিকের হালচাল দেখছেন না? ওদিক থেকে পাঠান
আহমদ শা আবদালি তো এসে পড়ল বলে। এই তো এবার কলকাতা থেকে ফিরেই নবাবকে যেতে হবে আজিমাবাদের দিকে, শুনেছেন তো?
শুনেছি, পথে পাঠানদের আটকাবার জন্যে।
আটকাতে কি পারবে নাকি ভেবেছেন? এই ধরুন আপনিই যদি ফৌজ নিয়ে যান তো আপনিই কি লড়াই করতে পারবেন মন খুলে? বলুন না, পারবেন? আপনার দফতরের লোকেরা, আপনার ফৌজের সেপাইরা নিয়ম করে মাইনে পায়? আপনিই কি মাইনেফাইনে পান মাসের পয়লা তারিখে?
নন্দকুমার বললেন–অনেক লিখে লিখে তবে আদায় হয়–
আদায় হয় শেষপর্যন্ত?
ওই ন’মাসে মাসে আসে কোনওরকমে। তা-ও মাইনে বাড়াবার জন্যে তাগিদ দিচ্ছি মশাই, তারও কোনও জবাব নেই। জিনিসপত্তরের দাম বাড়ছে
আপনার মাইনে?
নন্দকুমার বললেন–নিয়ম করে মাইনে পেলে আর কী ভাবনা, উমিচাঁদসাহেব! তা পেলে তো পায়ের ওপর পা দিয়ে…
উমিচাঁদ সাহেব বললে–তা আমি জানি। ও দেখবেন, এনবাবি টিকবে না আর। যে ক’টা দিন আছেন, কাজ গুছিয়ে নিন, আখেরের কাজ গুছিয়ে নিন–নইলে পরে পস্তাতে হবে! তাই তো বলছিলাম, বড় গাছে নৌকো বাঁধুন। এরা সব বনেদি মানুষ, এই ইংরেজরা। এদের কারবারের। কায়দাকানুনই আলাদা। আমিও তো কারবার করি, আর ও-বেটাদের কারবারও দেখছি। কথার খেলাপ করে না মশাই, যার যা পাওনা-গণ্ডা, তাকে তা আগে মিটিয়ে দিলে তবে ওদের ভাত হজম হয়। আমিও তো কারবার করি তাদের সঙ্গে, আমার একটা কড়াক্রান্তির হিসেব পর্যন্ত না মিটিয়ে দিলে ওদের ঘুম হয় না, তা জানেন?
তা কী করতে হবে আমাকে, বলুন?
ওই যে আপনাকে বললুম! ক্লাইভসাহেবের সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে সব। আপনি যত টাকা চাইবেন ও-বেটারা দেবে! দু’হাজার চান দু’হাজার, চার হাজার চান চার হাজার! ও-বেটাদের মশাই হকের টাকা, কিছু দুয়ে নিন না–
তা কত নিই বলুন তো ঠিক ঠিক?
যা আপনার খুশি!
পাঁচ হাজার চাইলে দেবে?
তা দেবে না কেন, পাঁচ হাজার চাইলে পাঁচ হাজারই দেবে!
নন্দকুমার বললে–তা হলে ছ’হাজারই চাই, কী বলেন!
তা চান!
নন্দকুমার বললে–দাঁড়ান, ছ’হাজারই বা কেন, যখন মাগনা পাওয়া যাচ্ছে, তখন আট হাজারই চাই। আট হাজারই হলেই আমার ভাল হত। আমার তো অনেক ঝুঁকি–
উমিচাঁদ বললে–ঝুঁকির কথা যদি বলেন তো আট কেন, দশ হাজারই চান না পুরোপুরি।
নন্দকুমার আর পারলে না। বললে–দাঁড়ান, আমি একবার ঠাকুরঘর থেকে আসি
ঠাকুরঘর?
আজ্ঞে হ্যাঁ, ঠাকুরকে জিজ্ঞেস না করে আমি কিছু করিনে কিনা, বড় জাগ্রত ঠাকুর আমার–কালী মূর্তি
