কেউ বলে–আহা, অত কথা কী ফৌজদার সাহেব, আমি শুনেছি মরিয়ম বেগমসাহেবা নাকি আবার সুরত বদলে মর্দানার কাপড়ে পরে আন্ধেরি রাতে মুর্শিদাবাদে ঘুরে বেড়ায়–
নন্দকুমার সাহেব জিজ্ঞেস করে রাত্রে শহরে ঘুরে বেড়ায়? কেন?
কেন আবার? নবাবের দুশমনদের ধরবার জন্যে! কে নবাবের দুশমন আর কে দোস্ত তা জানতে কোশিস করে–
যারা শোনে তারা হতবাক হয় বেগমসাহেবাদের আক্কেল শুনে। বলে–ইয়ে বড়ি তাজ্জব বাত জনাব–
একজন শ্রোতা বলে-নবাবকা দোস্ত কঁহা! সবহি তো দুশমন হ্যায়।
খবরটা ওলন্দাজ কুঠিতেও যায়। চন্দননগরের ফরাসিকুঠিতেও যায়। হুগলির ইংরেজ কুঠিতেও যায়। নবাবের সঙ্গে ইংরেজদের লড়াইয়ের খবর যখন আসত তখন সেক’দিন খুব গরম হয়ে থাকত ফৌজদারের দফতর! কখন কী হয়, কখন কী হুকুম আসে, তারই জন্যে সবাই উন্মুখ হয়ে থাকত। শুধু যে ইংরেজের সঙ্গে লড়াই, তা তো নয়, কাল হয়তো ওলন্দাজের সঙ্গেও লড়াই হতে পারে, কিংবা ফরাসিদের সঙ্গেও হতে পারে। হিন্দুস্থানে কেউ বলতে পারে না কাল তার কপালে কী লেখা আছে। নবাবি-নিজামতে কাউকে বিশ্বাস করে কথা বলার নিয়ম নেই। কে কখন কোন ফাঁকে গিয়ে নিজামতে কথাটা লাগাবে, আর নিজামত থেকে ডাক আসবে সঙ্গে সঙ্গে। আর তখনই নোকরি খতম। শুধু নোকরি নয়, জানও খতম। তারপর যদি একবার মরিয়ম বেগমসাহেবার কানে যায় তো একদম ফরসা। তা ছাড়া মেহেদি নেসার সাহেব আছে, ইয়ারজান সাহেব আছে, মনসুর আলি মেহের মোহরার সাহেব আছে, এমনকী খুদে জাসুস বশির মিঞা আছে–
তারপরে একদিন খবর এল নবাবের ফৌজ ইংরেজ ফৌজের কাছে লড়াইতে হেরে গেছে। লড়াইতে হেরে গিয়ে তাবাকুফে দস্তখতও করেছে। ওয়াটস্ ফিরিঙ্গি আর উমিচাঁদ সাহেবের ওপর মুর্শিদাবাদের দরবারে যাবার হুকুমত হয়েছে। দু’জনে রওয়ানা দিয়েছে কলকাতা থেকে।
তখনও ফৌজদার সাহেব রোজ জপ করতে করতে মনে মনে বলছে–হে মা, হে কালী, হে জগদম্বা, নবাব যেন ভালয় ভালয় মুর্শিদাবাদে ফিরে যায় মা, হুগলিতে যেন না আসে
নবাব হুগলিতে এলেই যত ঝঞ্জাট। আসবার আগে থেকে তোড়জোড়, থাকার সময় ঝামেলা, চলে যাবার পরেও ভাবনা দূর হয় না। নবাব যখন আসে তখন তো আর একলা আসে না, সঙ্গে করে ভূত-পিশাচদেরও নিয়ে আসে। নবাবের চেয়ে ভূত-পিশাচরাই নবাবিআনায় বেশি দড়। তাদের খাই মেটানোই বেশি শক্ত। কোথায় মদ, কোথায় মেয়েমানুষ, কোথায় টাকা, কোথায় কী, সব জুগিয়েও সুনাম পাওয়ার আশা নেই। নবাবের ভূত-পিশাচদের খুশি করতে করতেই ফৌজদারদের প্রাণান্ত!
শেষকালে হঠাৎ কলকাতা থেকে নবাবের কাছারির একটা খত্ এল।
নবাব লিখে পাঠিয়েছে ইংরাজেরা আমার সন্ধি অগ্রাহ্য করিয়া মদীয় দোস্ত চন্দননগরে ফরাসিদের নগরী ও কেল্লা দখল করিতে অগ্রসর হইলে হুগলির ফৌজদারসাহেব জনাব নন্দকুমারের উপর ফৌজ লইয়া বাধাপ্রধান করিবার হুকুম হইল। ইহার অন্যথা না হয়।
চিঠিটা পড়ে ফৌজদার প্রথমে হতবাক হয়ে গেল। আবার যুদ্ধ! আবার লড়াই। খবরটা প্রথমে চাপাই ছিল। ফৌজদার সাহেব বার দুই চিঠিটা পড়লে। তারপর লোকটার দিকে চেয়ে দেখলে।
বললে–টাকা? টাকা কই?
কীসের টাকা?
কেন, লাখ টাকার কথা লেখা রয়েছে যে!
চিঠির সঙ্গে আর একটা চিঠি। সে চিঠিতে লেখা আছে–এই পত্রবাহকের হাতে এক লাখ টাকা পাঠাইলাম। এই টাকা ফরাসি সরকারকে দিবে। তাহাদের নিকট হইতে নবাব সরকার দুই লাখ টাকা লইয়াছিল। এই টাকার সাহায্যে তাহারা ইংরাজকে শায়েস্তা করুক, ইহাই আমি চাহি।
এই থলেটার ভেতর কী আছে জানি না হুজুর, এইটেও আপনাকেও দেবার হুকুম হয়েছে।
ফৌজদার সাহেব থলিটা নিয়ে মুখের বাঁধনটা খুলে ফেললে। বেটা বদমায়েস লোক। টাকাটা বাজেয়াপ্ত করতে চেয়েছিল। তারপর টাকাটা নিজের সিন্দুকের মধ্যে পুরে বললে–যা, এখন যা–
একটা চিঠি দেবেন না, হুজুর?
আবার কীসের চিঠি?
চিঠি পেলেন, টাকা পেলেন, তার রসিদ দেবেন না?
লোকটা হুঁশিয়ার বটে। বললে–যা, আমার দফতরে, রসিদ দেবে আমার খাস মুনশি
ফৌজদারের দফতরও বড় দফতর। হুগলির ফৌজদারের মাইনেও কম নয়। সামান্য ব্রাহ্মণসন্তানের পক্ষে বাৎসরিক তিন লাখ টাকার চাকরি বড় ছোট চাকরি নয়। কিন্তু তবু টাকাকে তো বিশ্বাস নেই, টাকা আজ আছে, কাল নেই। তা ছাড়া নবাবের চাকরির কোনও ঠিকঠিকানাও নেই। অনেক তদবির করে চাকরিটা পাকা করে নিয়েছে ফৌজদার সাহেব। কিন্তু দিনকাল যা পড়েছে তাতে কোন দিন কে এসে লাথি মেরে তাড়িয়ে দেবে গদি থেকে। বলবে–ভাগো
তারপর আবার ছোকরা নবাব। মেয়েমানুষের কথায় ওঠে বসে। ওদের কাছে চাকরি করাও যা, ওদের মুখের থুতু খাওয়াও তাই। সবসময়ে মুর্শিদাবাদের নিজামতের দিকে হা করে থাকতে হয়।
কিন্তু দুদিন যেতে না যেতেই হঠাৎ একদিন উমিচাঁদ সাহেব এসে হাজির। দেখে ফৌজদার সাহেবের একেবারে একগাল হাসি।
আপনি?
উমিচাঁদ সাহেব কিন্তু হাসল না। বললে–আশেপাশে কেউ নেই তো? থাকলে এখন ঘরে ঢুকতে বারণ করে দিন–গোটাকতক জরুরি কথা আছে। কিছু টাকা মবলক উপায় করতে চান?
টাকা! বলে কি পাঞ্জাবিটা! টাকা আবার সংসারে কে না উপায় করতে চায়! টাকাই তো কলিযুগের মোক্ষ, উমিচাঁদ সাহেব! নবাবি আমলে আমাদের হরিনাম টুরিনাম তো সব ফকিকারি, টাকাই তো একমাত্র সত্য।
