রাত যখন গম্ভীর হল, তখন সামান্য একটু শব্দ হতেই মরালী বিছানা ছেড়ে উঠে পরদা ঠেলে বাইরে এল। কান্ত দাঁড়িয়ে ছিল।
মরালী বললে–সেটা পেয়েছ?
কান্ত চাদরের ভেতর থেকে বার করে একটা ছোরা মরালীর দিকে বাড়িয়ে দিলে। মরালী সেটা নিয়ে নিজের বোরখার মধ্যে পুরে ফেললে। তারপর আবার পরদা সরিয়ে ভেতরে চলে যাচ্ছিল–
কান্ত ডাকলে–শোনো।
মরালী ফিরল। বললে–কী?
কোথায় পেলুম জানো? নবাবের ঘরের গোসলখানার পথে। কেউ বোধহয় সরিয়ে রেখেছিল। তুমি যখন কাল নবাবের সঙ্গে কথা বলে উঠে এলে, তখন বোধহয় কেউ উঁকি মেরে দেখেছিল। কিন্তু আর একটু দাঁড়াও, আর-একটা জরুরি কথা আছে
মরালী দাঁড়াল! বললে–বলল, শিগগির বলল, কেউ দেখে ফেলবে
তুমি একটু সাবধানে থেকো মরালী।
আমাকে ভয় পাওয়াচ্ছ?
না, ভয় পাওয়াচ্ছি না। ওদের কথা শুনে তোমার জন্যে আমার ভয় হচ্ছে।
কেন? কারা?
তুমি তো চেনো সকলকে। নবাব তোমার নাম করাতে ওরা খুব চটে গেছে। আমি দেখলুম, ওরা তিনজনে চুপি চুপি কী সব পরামর্শ করছে। শশীর নাম শুনেছ তো? আমার বন্ধু? শশীকে খবর রাখতে বলেছিলাম। সে আমাকে বললে।
কী বললে?
ওই যে উমিচাঁদ সাহেব কাশিমবাজার যাবার পথে হুগলির ফৌজদার নন্দকুমার সাহেবের সঙ্গে কথা বলে বারো হাজার টাকা ঘুষ দেবার কথা বলেছে, ওইটে জানাজানি হওয়াতে এখন সবাই তোমার ওপর রেগে গেছে।
মরালী বললে–তা আমার ওপর রেগে কী করবে? খুন করে ফেলবে আমাকে?
যদি তাই করে?
তা খুন করলে না-হয় খুনই হব। আমার বেঁচে থাকায় তো কারও কোনও লাভ-লোকসান নেই
কান্ত আরও কাছে এগিয়ে গেছে। বললে–ছি, কেন ওসব কথা যে বলো তুমি বারবার। তোমার মুখে কিছু আটকায় না দেখছি
মরালী সেকথার উত্তর না দিয়ে বললে–ক্লাইভসাহেবের সঙ্গে দেখা করার পর থেকেই তো ওরা চটে গেছে, এখন না-হয় আরও একটু বেশি করেই চটল। আমি কি কারও পরোয়া করি? দেখি না কাল নন্দকুমার আর উমিচাঁদ সাহেব এসে কী জবাবদহি করে–
বলে মরালী পরদা সরিয়ে নিঃশব্দে ভেতরে চলে গেল। কান্তর উত্তর শোনবার জন্যে আর দাঁড়াল না।
*
এক-একজন মানুষ সংসারে থাকে যারা নিঃশব্দে নিজের কার্যসিদ্ধি করে যায়। তারা আড়ালে থাকতেই ভালবাসে। তারা আড়াল থেকেই সব লক্ষ করে। উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাদের থাকে বটে, কিন্তু সে-উচ্চাকাঙ্ক্ষা অন্যের ক্ষতি করে না। সে-উচ্চাকাঙ্ক্ষা শুধুই কেবল স্বার্থসিদ্ধির জন্যে, অন্যের সর্বনাশ করবার জন্যে নয়। অন্যে যদি বড় হয় তো হোক, তার সঙ্গে আমার বড় হওয়াটা বাধা না-পেলেই আমি নিশ্চিন্ত!
অষ্টাদশ শতাব্দীর যারা শীর্ষস্থানীয় আমির ওমরাহ, তারা নিজের উন্নতি চাইত তো বটেই। কিন্তু উন্নতি তো কোনওদিন কারও চিরস্থায়ী হয়ে থাকবার জিনিস নয়। আজ বড় হলাম, কিন্তু কাল তো আবার ছোট হয়ে যেতে পারি। কাকে কখন ধরলে আমার বড় হওয়াটা অব্যাহত থাকবে সেটা যে-লোক বিচার-বিবেচনা করে চলতে পারে, সেই এ-সংসারে আজীবন বড় হয়ে থাকে।
আজ নাহয় মির্জা মহম্মদ সিরাজ-উ-দ্দৌলা বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব, কিন্তু কাল নবাব না থাকতেও পারে, পতনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের পতন যেন না হয়, তাই নজর রাখতে হয়, কে ভাবী নবাব! এখন থেকে সেই ভাবী নবাবেরও প্রিয়পাত্র হয়ে থাকি।
যে-দূরদৃষ্টি থাকলে এই বিচার খাঁটি বিচার হয়, সেই দূরদৃষ্টি সকলের ছিল না। ছিল দু’জন লোকের। প্রথম নন্দকুমার, দ্বিতীয় মুনশি নবকৃষ্ণ। অষ্টাদশ শতাব্দীর দু’জন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পুরুষ। উদ্ধব দাস নবকৃষ্ণের কথা আগে লিখেছে। এবারে লিখছে নন্দকুমারের কথা।
হুগলির ফৌজদার নন্দকুমার। ব্রাহ্মণ বংশাবতংস। আহ্নিক করে, জপ করে, গায়ত্ৰীনা আউড়ে জল গ্রহণ করে না। কিন্তু চোখ আর মন পড়ে থাকে মুর্শিদাবাদে। রাজধানী থেকে দূরে থাকতে হয় বলে অসুবিধে যা হবার তা হয়। কিন্তু উদ্যোগী পুরুষের কাছে কোনও কাজই অসাধ্য হতে পারে না।
ফৌজদারের কাছে যারাই আসে তাকেই জিজ্ঞেস করে-মুর্শিদাবাদের খবর কী?
যারা আসে ফৌজদারের কাছে তারা জানে মুর্শিদাবাদের খবর মানে নবাবের হাঁড়ির খবর। নবাবের প্রিয়পাত্র কে,নবাব এখন কার কথায় ওঠে বসে, নবাবের মেজাজ এখন কেমন, জগৎশেঠজি এখন কার দলে, মিরজাফর সাহেবের সঙ্গে নবাবের এখন কীরকম সম্পর্ক ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক জানবার এবং জানাবার মতো কথা। কোন আমলার এখন নসিব খুলল, নবাব এখন হিন্দুদের দিকে ঝুঁকেছে, না মুসলমানদের দিকে, এইসব। মোহনলাল, মিরমদন যখন হিন্দু আর তারা যখন নবাবের নেকনজরে পড়েছে, তখন নন্দকুমারের ওপরেও একদিন নবাবের নেকনজর পড়তে পারে।
ফৌজদারের কাছে ফিরিঙ্গিরাও আসে। সোনার দেশ ছেড়ে এই মশা, মাছি, জ্বর, গরম, হিংসে, খুনখারাবি আর খোশামোদের দেশে এসে দুটো পয়সার লোভে পড়ে আছে তারা। কিন্তু শুধু কারবার করলে চলে না। কারবার করতে গেলে ট্যাক্সো দিতে হয় নিজামতে। তাই নিজামতের খবর নিতে আসে ফৌজদারের কাছে।
কেউ বলে–শুনছি, এখন নবাবের সবচেয়ে পেয়ারের লোক মরিয়ম বেগম
মরিয়ম বেগম? সে আবার কে জনাব?
একজন বললে–হাতিয়াগড়ের রাজার ছোট তরফের বউ–তারই কথায় যে নবাব ওঠে বসে—
সেকী? কী করে হল? এখন বুঝি পেশমন বেগমসাহেবের রাহুর দশা যাচ্ছে?
এসব গুজব সব সুবাতেই আস্তে আস্তে ছড়িয়ে গিয়েছিল, এককালে নবাবের ওপর ফৈজি বেগমের যে ক্ষমতা ছিল এখন নাকি মরিয়ম বেগমের সেই ক্ষমতা হয়েছে। এখন নাকি নবাব কারও সঙ্গে লড়াই করবে কি না তা নিয়ে পরামর্শ করে মরিয়ম বেগমের সঙ্গে। আবার মরিয়ম বেগমও নাকি চেহেল-সূতুনের আদবকায়দা নিয়মকানুন কিছুই মানে না। যখন খুশি তখনই হারেম থেকে বাইরে যায়।
