প্রতিকারের কথা শুধু মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র কেন, সবাই ভেবেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর জমিদার, রাজা মহারাজা, তালুকদার সবাই ভুক্তভোগী। গুণের আদর কোথায় আছে আপনিই বলুন? আমার টোলের পণ্ডিতদের কে আদর করে? তাদের আদর করে লাভ নেই বলেই কেউ আদর করে না। তার চেয়ে সরকারি আমলা-আমির-ওমরাহদের খাতির করলে লাভ বেশি। এই দেখুন না, আমার এক প্রজা সুতোর ব্যবসা করে, তাকে নিজামতে সরকারি মাশুল দিতে হয় শতকরা কুড়ি টাকা, আর বেভারিজ সাহেব কলকাতায় সোরার কারবার করত, সে বছরে তিন হাজার টাকা এককালীন নজরানা দিয়ে লাখ লাখ টাকা মুনাফা করে, তার বেলায় কোনও বিচার নেই–
একটু থেমে মহারাজ বললেন–আপনি কিছু ভাববেন না ঘোমশাই, আপনি হয়তো সামান্য রাজা, আমি হয়তো মহারাজ, এখানে আপনাতে আমাতে কোনও প্রভেদ নেই। আমরা সবাই ভুক্তভোগী। গীতাতেও দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন করবার কথা আছে। রাজা যদি অন্যায় করে তো তারও শাস্তি দেবার বিধাম আমাদের ধর্মে আছে, সেটা অন্যায় কর্ম নয়। স্বয়ং মহাত্মা ব্যাসদেব মহাভারতে অশ্বমেধ পর্বের তৃতীয় অধ্যায়ে যুধিষ্ঠিরকে উপদেশ দিয়েছেন, মানুষ সমস্ত কর্মই ঈশ্বর প্রেরণায় করে থাকে, তাতে ব্যক্তিবিশেষের কোনও অপরাধ হয় না
নহি কশ্চিৎ স্বয়ং মর্ত্যঃ স্ববশঃ কুরুতে ক্রিয়াং।
ঈশ্বরেণ চ যুক্তোহয়ং সাধ্বসাধুচ মানবঃ
করোতি পুরুষঃ কর্ম তত্র কা পরিবেদনা ॥
কথা বলতে বলতে হঠাৎ দেউড়ির ঘণ্টা বেজে উঠল। মহারাজা উঠলেন। কাঁধের চাদরটা তুলে নিয়ে বললেন–আজকে আবার আমার আখড়ায় কুস্তি হবে, দিল্লি থেকে একজন কুস্তিগির এসেছে–পাঁজি দেখে সময়টা ঠিক করছিলুমপণ্ডিত মশাইকে আবার ডেকে পাঠিয়েছে কিনা
ছোটমশাই বললেন আমার কুস্তি দেখতে ভাল লাগে না
মহারাজ বললেন–আরে ভাল কি আমারই লাগে ছোটমশাই? কিন্তু তবু এত বড় রাজত্ব চালাতে হয়, ও গোপাল ভাঁড়কেও যেমন ঘাড়ে নিয়েছি, তেমনি রায়গুণাকরকেও ঘাড়ে নিয়েছি ইচ্ছে না। থাকলেও ঘাড়ে নিতে হয়। শুধু নিজের বউটি আর আমিটি নিয়ে থাকলে তো বনে গিয়ে বাস করলেই
কিন্তু ওদিকের কী হবে?
কোন দিকের? আপনার স্ত্রীর ব্যাপারটা?
হ্যাঁ।
সে আমার লোক আছে। আমি তো বলেছিলুম আপনাকে যে, আমার কাছে সব খবরই আসে। আপনি এসে বলবার আগেই আমার কাছে সব খবর এসে গেছে।
কে সে?
সে আপনার জেনে দরকার নেই। নবাবের ফৌজের দলে যখন সেপাই নিচ্ছিল, তখন সে-ও সেপাইয়ের দলে নাম লিখিয়ে দিয়ে ফৌজের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। তাকে কেউ চেনে না। সে একটা বাঙালি হিন্দু সেপাই, সে-ই সব খবর দেয়–
তারপর একটু থেমে বললেন–আপনি এখন বিশ্রাম করুন, আহারাদি করুন, তারপর যেমন-যেমন খবর আসে আপনাকে জানাব, আপনি সেইমতো কাজ করবেন।
ছোটমশাইও উঠে নীচে নেমে এলেন।
*
শীত বেশ আঁকালো হয়ে পড়েছে অগ্রদ্বীপে। নবাবের ছাউনিতে অনেক রাত পর্যন্ত সলাপরামর্শ চলেছে। শেষরাত্রের দিকে সবাই ঘুমোতে গেছে। উমিচাঁদ আর ওয়াটস্ দু’জন ছাড়া আর সবাই ছিল নবাবের সামনে। এতদিনের সব আয়োজন, সব আলোচনা, সমস্ত যেন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। নিজের হাতে সে-সন্ধিতে সই করে গেছে ক্লাইভ, নিজেই আবার যেন সেই কাগজটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে।
মিরজাফরকে দেখে বললেন–আপনিই তো এদের সঙ্গে ফয়সালা করতে বললেন আমাকে? এখন এর পরেও এদের বিশ্বাস করতে বলেন? ফরাসিরা আমার দোস্ত, তাদের সঙ্গে শত্রুতা করা মানে তো আমার সঙ্গেও শত্রুতা করা
মিরজাফর সাহেব মাথা ঠান্ডা রেখে বললে–জাঁহাপনা তো হুগলির ফৌজদার নন্দকুমারকে ডেকে পাঠিয়েছেন
শুধু নন্দকুমারকে কেন, উমিচাঁদকেও ডেকে পাঠিয়েছি। আমি নন্দকুমারকে বারবার বলেছি, ইংরেজরা যেন ফৌজ নিয়ে চন্দননগরের দিকে না যেতে পারে। তার পরেও কেন উমিচাঁদের কথায় সে কোনও বাধা দিলে না?
মিরজাফর কোনও উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল।
তা হলে আমি যে খবর পেয়েছি, তা কি সত্যি?
জাঁহাপনা তো মিথ্যে খবরও পেতে পারেন। ফৌজদারের তো শত্রুর অভাব নেই
মিথ্যে খবর? মিথ্যে খবর আপনারই বারবার দিয়ে আমাকে বিভ্রান্ত করেছে। আমি আপনাদের কথা শুনেই কাফেরদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করেছি। এখন বলুন, আমি ঠিক করেছি না ভুল করেছি
না জাঁহাপনা, আমরা এখনও বলছি, আপনি ঠিকই করেছেন। ইংরেজরা কখনও মিথ্যে কথা বলে না। তারা কখনও সন্ধি ভাঙে না। ইংরেজদের দেশে যদি কেউ মিথ্যে কথা বলে তাকে সবাই একঘরে করে দেয়, তার ছোঁওয়া পানি পর্যন্ত কেউ খায় না
নবাব বললেন–তা হলে ক্লাইভ উমিচাঁদকে চিঠি লেখেনি?
সে-চিঠি কি জাঁহাপনা দেখেছেন?
সব জিনিস দেখা যায় না। আপনাদের ক্লাইভ তত বোকা নয়, উমিচাঁদও তত বোকা নয় যে, সে চিঠি অন্য কেউ দেখতে পাবে। কিন্তু উমিচাঁদ নন্দকুমারকে গিয়ে বারো হাজার টাকা দেয়নি বলতে চান?
ইয়ার-লুৎফ খাঁ পাশ থেকে বললে–সঁহার মনে সন্দেহ জাগাবার জন্যেই এ-খবর কেউ দিয়েছে হয়তো
তা হলে বলব কে এ-খবর দিয়েছে? আপনারা শুনতে চান?
শুনলে আমরা সবাই খুশি হব জাঁহাপনা!
মরিয়ম বেগম!
.
পাশের ঘরে কথাটা নানিবেগমসাহেবার কানে গেল। মরালীর কানেও গেল। কিন্তু তার পরে আর কারও মুখ দিয়ে কোনও কথা বেরোল না। শুধু শোনা গেল, উমিচাঁদ সাহেব আর নন্দকুমার এলে সব অভিযোগ প্রমাণ হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত অগ্রদ্বীপে থাকাই স্থির হয়ে গেল। চারদিকে হুহু করে হাওয়া দিচ্ছে। ঠান্ডায় হিম হয়ে আসে হাত-পা। কিন্তু বাংলার ইতিহাস সেই ঠান্ডায় বুঝি সেদিন হিম হয়ে থাকেনি। হলে অন্য রকম হত। সে-ইতিহাসের বুকে আগে অনেক ঝড় বয়ে গেছে। ভাস্কো-ডা-গামা যেদিন হিন্দুস্থানের উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছিল, সেদিনও এমনি হাড় কাঁপানো শীতের হাওয়া বয়েছে। ১৫৯৯ সালে যেদিন এক অল্ডারম্যানের বাড়িতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রাণ-প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, সেদিনও এমনি হাত-পা হিম হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু হাত-পা হিম হয়ে গেলে ইতিহাসের চলে না। তাকে অনাদি অতীতকাল থেকে এগিয়ে চলতে হয় সামনের দিকে এগিয়ে চলাই তার ধর্ম। মহম্মদ বখতিয়ার খিলজিই আসুক আর সুলতান মুঘিস-উদ্দিন উজবুকই আসুক, একদিন সকলকেই যথাস্থানে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু যে ফিরবে না, সে এই ইতিহাস। উদ্ধব দাস সেই ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তাই লিখে গেছে এই বেগম মেরী বিশ্বাস।
