আমাদের কালীকৃষ্ণকে সব বলেছেন নাকি?
হ্যাঁ, সব বলেছি।
রণজিৎ রায় মশাইয়ের সঙ্গে দেখা করেছেন?
কী করে দেখা করব, আমি তো নবাবের ছাউনিতে যাইনি।
যাননি ভালই করেছেন। ক্লাইভ সাহেব কী বললে?
ছোটমশাই বললেন যেতে না-যেতেই যুদ্ধ বেধে গেল, তাই বেশিক্ষণ কথা হল না। তারপর ত্রিবেণীতে গিয়ে বজরা বাঁধলাম। সেখানে আমার স্ত্রীর সাক্ষাৎ পেলাম।
সেকী? আপনার স্ত্রী?
আজ্ঞে হ্যাঁ, মরিয়ম বেগম। আপনি তো জানেন সব বৃত্তান্ত!
তারপর?
ছোটমশাই বললেন আমার সঙ্গে পথে এক পাগল জুটেছিল। সেই পাগলটার সঙ্গে দেখলুম ক্লাইভ সাহেবের খুব ভাব।
আপনার স্ত্রী আপনাকে চিনতে পারলেন? কথা হল তাঁর সঙ্গে?
কথা হবে কী করে? তবে সেই পাগলটার সাহস খুব, সে গিয়ে সরাসরি বেগমসাহেবাকে আমার কথা বললে।
আপনিও দেখলেন আপনার স্ত্রীকে?
ছোটমশাই বললেন–স্পষ্ট দেখতে পেলাম না, বোরখায় সর্বাঙ্গ ঢাকা ছিল, সঙ্গে আর একজন বেগমসাহেবা ছিল
মহারাজ বললেন–নানিবেগমসাহেবা
ছোটমশাই অবাক হয়ে গেলেন।
আপনি কী করে জানলেন?
মহারাজ হাসলেন। বললেন–তারপর আপনার সহধর্মিণী ক্লাইভ সাহেবের ছাউনির বাগানে গিয়ে সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছেন
আরও অবাক হয়ে গেলেন ছোটমশাই। বললেন–আপনি এসব জানলেন কী করে? কে খবর দিলে আপনাকে?
তারপর যখন আপনি ক্লাইভ সাহেবের ছাউনিতে গেলেন তখন ক্লাইভ সাহেবও সেখানে নেই, তাদের ফৌজও নেই। আপনার সহধর্মিণী কি নানিবেগম সাহেবা, কেউই নেই। বাগান ফাঁকা
ছোটমশাই স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে উঠলেন। আর বসে থাকতে পারলেন না।
তখন ক্লাইভ সাহেব ফৌজিসেপাই দলবল লশকর-গোলোজ সব নিয়ে ফরাসি চন্দননগর দখল করতে ভাগীরথীর ওপারে চলে গেছে।
হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। সব ঠিক। কিন্তু আপনি কেষ্টনগরে বসে জানলেন কী করে? দেওয়ান মশাই কলকাতায় গিয়েছিলেন নাকি? আমাদের সঙ্গে তো দেখা হয়নি। আমাকে তো কিছুই বললেন না।
মহারাজ বললেন–না, কালীকৃষ্ণ এসব কিছুই জানে না, সেই জন্যেই তো কালীকৃষ্ণকে এঘর থেকে সরিয়ে দিলাম।
ছোটমশাই উদগ্রীব হয়ে শুনছিলেন। জিজ্ঞেস করলেন-তারপর?
তারপর আপনি সাহেবের দেখা না পেয়ে এখানে চলে এলেন।
হ্যাঁ, কিন্তু ওদিকে আমার স্ত্রী? আমার স্ত্রীর কী হল? নবাব তো গোবিন্দ মিত্তির মশাইয়ের বাগানবাড়ি থেকে শুনলাম ছাউনি তুলে নিয়ে ত্রিবেণীর দিকে আসছেন, মুর্শিদাবাদে ফিরে আসবার জন্যে
মহারাজ বললেন না, তিনি পথে শুনলেন নানিবেগম আর মরিয়ম বেগমসাহেবা নবাবের সঙ্গে দেখা করবার জন্যে ত্রিবেণী থেকে তাঞ্জামে করে আসছেন, তাই শুনে আবার একটা বাগানে ছাউনি গাড়লেন
তারপর? আপনার কাছে এত তাড়াতাড়ি এ-খবর কী করে এল?
তারপর খবর পেলেন বেগমসাহেবারা তার ছাউনিতে আসতে আসতে পেরিন সাহেবের বাগানে কর্নেল ক্লাইভ সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে গেছে!
সে-খবরও নবাবের কানে গেছে নাকি? তা হলে তো নবাব খুব রেগে গিয়েছেন মরিয়ম বেগমের ওপর? তা হলে কী হবে? তা হলে ক্লাইভ সাহেবের কাছ থেকে ওরা কি আবার নবাবের ছাউনিতে গেছে?
মহারাজ বলতে লাগলেন-হ্যাঁ, আর তারপর নবাব দুই বেগমসাহেবাকে নিয়ে অগ্রদ্বীপে গেছেন। সেখানে গিয়ে শুনেছেন ইংরেজরা চন্দননগর দখল করবার জন্যে সৈন্য-সামন্ত নিয়ে ভাগীরথী পেরিয়ে ওপারে গেছে
ছোটমশাই এতক্ষণ সব শুনছিলেন। শুনে অবাক হয়ে যাচ্ছিলেন।
আপনি এত খবর কোথা থেকে পান? কে দিলে আপনাকে এত খবর?
মহারাজ সে কথার উত্তর না দিয়ে বললেন–আমি ভেবেছিলাম আপনি এখানে ফিরে না এসে ক্লাইভের সঙ্গে চন্দননগরে যাবেন। কারণ আপনার গৃহিণী অগ্রদ্বীপে নবাবের সঙ্গেই আছেন। আমার কাছে খবর এসেছিল আপনি আপনার নৌকো নিয়ে ত্রিবেণী ছাড়িয়ে পশ্চিম দিকে গেছেন। এত তাড়াতাড়িতে তো আপনার আসার কথা নয় এখানে।
ছোটমশাই বললেন আমি এসব কথা কিছুই জানতাম না—
মহারাজ বললেন–আমি এখানে বসে সব টের পাচ্ছি আর আপনি নিজে সেখানে গিয়েও সব খবর পেলেন না। ওদিকে নবাবের ছাউনিতেও যে গোলমাল বেধেছে
কেন?
আপনার স্ত্রীকে নিয়ে!
আমার স্ত্রী? মরিয়ম বেগম?
হ্যাঁ, মরিয়ম বেগম কর্নেল ক্লাইভ সাহেবের বাগানে গিয়েছিল বলে উমিচাঁদ সাহেব ভীষণ রেগে গেছে। আমার কাছে শেষ যে-খবর এসেছে তাতে মনে হচ্ছে আপনার স্ত্রীর ভীষণ বিপদ। তাকে খুন করবার চেষ্টা চলছে! আপনার পক্ষে যদি সম্ভব হয় এখনই আপনার সেখানে চলে যাওয়া উচিত
কিন্তু খুন করবে কেন?
মহারাজ হাসলেন। বললেন–দেখুন, আপনি তো গোড়া থেকেই সব দেখছেন, আপনার চেয়ে আমি বয়েসে আরও বড়, আমি সুজাউদ্দিনের আমল দেখেছি, সরফরাজের আমলও দেখেছি, আবার এই আমাদের সিরাজউদ্দৌলার আমলও দেখছি। বাকি খাজনার দায়ে মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে বৈকুণ্ঠের মধ্যে নরকযন্ত্রণাও সহ্য করেছে জমিদাররা, বগিদের হামলার সময়েও লোকেরা অকথ্য অত্যাচার সহ্য করেছে, কিন্তু এই আমলেই প্রথম দেখছি আমার প্রজারা খেতে না পেয়ে গলায় দড়ি দিয়েছে। এ-ঘটনা আগে কখনও হয়েছে?
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের মুখে ছোটমশাই আগে কখনও এমন কথা শোনেননি।
আমি নবদ্বীপে গিয়ে এবার নিজের চোখে এই ঘটনা দেখে এসেছি। এর পরেও কি আমি চুপ করে থাকতে পারি?
ছোটমশাই বললেন–সে তো আমিও হাতিয়াগড়ে দেখেছি, কিন্তু এর প্রতিকার কোথায়?
