ছোটরানির কাঁচা বয়েস?
হরিপদ বলেছিল–কাঁচা বয়েস হবে না? ছোটমশাইয়ের যে দ্বিতীয় পক্ষের বউ–বড়রানির ছেলে হল না, তাই তো ছোটরানিকে ঘরে এনে তুলেছে–
ছোটরানির ছেলে হয়েছে?
এবার বিরক্ত হয়ে গেল হরিপদ। কথা যদি বলবে তো গান গাইবে কখন দাসমশাই। ততক্ষণে ভেতর-বাড়ি পেরিয়ে রানিবিবি এসে গেছে। সেই কোথায় অন্দরমহল। একটা মহলের পর আর একটা মহল। এমনি সাতটা মহল পেরিয়ে তবে অতিথিশালার দোতলার দরদালানে আসতে হয়। সেখানে পঙ্খের কাজ করা ইটের জাফরির ফাঁক দিয়ে উঠোনের ভেতরটা সব দেখা যায়। ভেতর থেকে কার গলা শোনা গেল–কই রে হরিপদ, গান করতে বলো–
হরিপদ বললে–ওই দুগা আরম্ভ করে দাও গো ছোটরানি দরদালানে এসে হাজির হয়েছে–
কোন গানটা গাইব?
রসের গান, মেয়েছেলেরা রসের গানই চায় যে দাসমশাই—
উদ্ধব দাস আরম্ভ করলে প্রাণ রে, পিরিতের কথা আর বোলো না–
হরিপদ বাহবা দিয়ে উঠল–বাঃ বাঃ, খাসা–
প্রাণ রে, পিরিতের কথা আর বোলো না।
পিরিত করলাম প্রাণ জুড়াতে
বুকে ধরলাম প্রাণনাথে
তাতে আমার বুকের জ্বালা বাড়ল বই কমল না।
প্রাণ রে পিরিতের কথা আর বোলো না।
হরিপদ আর থাকতে পারল না। চিৎকার করে উঠল–বা দাসমশাই, বেশ—বেশ–
প্রাণ রে, তুষের আগুন ছিল ভাল।
আমিও ছিলাম প্রাণও ছিল।
এই যে আমিও গেলাম প্রাণও গেল
সবই হল ভস্মীভূত, আমার কিছুই রইল না।
প্রাণ রে, পিরিতের কথা আর বোলো না।
হরিপদ আবার বাহবা দিতে যাচ্ছিল, তার আগেই উদ্ধব দাস গান থামিয়ে দিয়েছে। মুখ ফিরিয়ে বললে–গড় হই গো খাজাঞ্চিমশাই—
কে তুই?
জগা খাজাঞ্চিবাবু এমনিতে এখানে আসে না। কিন্তু হয়তো নির্জন দুপুরবেলায় গানের শব্দ শুনে ঢুকে পড়েছে।
নটবর বললে–ও উদ্ধব দাস, খাজাঞ্চিমশাই–
খাজাঞ্চিমশাই বললে–ওইসব গান দুপুরবেলা এখানে কে গাইতে বলেছে তোকে, বেরো এখান থেকে বেরিয়ে যা–কে ঢুকতে দিয়েছে তোকে–
উদ্ধব দাস বললে–অভাজনের নিবেদন শুনুন প্রভু–
শুনো ভাই সভাজন, অভাজনের নিবেদন।
একে একে শ্রীরামচন্দ্রের কহি বিবরণ।
দেখো ভাই শ্রীরামচন্দ্র জগৎচন্দ্র কোথা হবেন রাজা।
তাহাতে কৈকেয়ী মাগি দিলেন আচ্ছা সাজা।
পরিয়ে জটা বাকল আর সকল ত্যজি অলংকার।
পাঠাইল অরণ্যেতে চতুর্দশ বৎসর।
রাম নিজ গুণে ভ্রমেণ বনে যথায় তথায়।
সীতা সতী গুণবতী দারুণ কষ্ট পায়।
শুনো একদিন দৈবাধীন আসি বসুন্ধরা…
খাজাঞ্চিবাবু আর থাকতে পারলে না। বললে–ওরে বাবা, এ যে আবার ছড়া কাটে রে—
হরিপদ বললে–আজ্ঞে, কালকে ও আমাদের মানভঞ্জনের পালা শুনিয়েছে–
উদ্ধব দাস বললে–আমি মানভঞ্জন পালা গাইতে পারি, কালীয়দমন পালা গাইতে পারি, অধীনের গুণের সীমে নাই প্রভু, আজ্ঞা হয় তো গাই এখন–
খাজাঞ্চিবাবুর তখন অত সময় নেই। বললে–এ কোত্থেকে আমদানি হল রে হরিপদ?
হরিপদ বললে–আজ্ঞে সেবার সেই এক সন আগে একবার এসেছিল, আবার এসে জুটেছে, গানটান গায় বলে আর তাড়িয়ে দিইনি, ভারী নির্ঞ্ঝাট লোক, দুটো ভাত পেলেই খুশি আর অতিথিশালায় পড়ে থাকে–
তারপর উদ্ধব দাসের দিকে চেয়ে বললে–দাসমশাই, তোমার সেই মাথুরটা শোনাও না একবার খাজাঞ্চিমশাইকে–
উদ্ধব দাসকে আর দু’বার বলতে হয় না। বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে এক কানে হাত চাপা দিয়ে গায়–
এ যমুনা পারে কে আনিতে পারে
আমরা ব্রজের কুলবালা।
খাজাঞ্চিমশাই চেঁচিয়ে উঠলদুর হ, দুর হ-বড় বউরানির কানে গেলে হয়েছে আর কী—
উদ্ধব দাস বললে–সবই আমার নিজের তৈরি প্রভু—
হরিপদ বললো খাজাঞ্চিবাবু, মুখে মুখে হেঁয়ালি বানায় আবার—
উদ্ধব দাস বলতে লাগল বলুন তো প্রভু কী?
সূর্য বংশে জন্ম তার অজ রাজার নাতি।
দশরথ পুত্র বটে নয় সীতাপতি।
রাবণের অরি নয় লক্ষ্মণের জ্যেষ্ঠ।
ভনে কবি উদ্ধব দাস হেঁয়ালির শ্রেষ্ঠ।
হরিপদ জিজ্ঞেস করলে–-বলুন তো খাজাঞ্চিমশাই, এর উত্তর কী হবে?
খাজাঞ্চিমশাই বললে–দুর, এসব ভাববার সময় আছে আমার! তোর দেশ কোথায়?
উদ্ধব দাস ছড়া কেটে উঠল–
আমার কাজ কী সংসারে হরি।
আমি রাধার দুঃখে গোকুল ছেড়ে হইলাম দেশান্তরী।
দেখলেন তো খাজাঞ্চিমশাই, ছড়ার নমুনা দেখলেন তো। গরিব লোক, অতিথিশালায় উঠেছে, থাক না ক’দিন, আপনি যেন আর কিছু বলবেন না—
খাজাঞ্চিবাবু আর কিছু বললে না। ব্যাজার হয়ে চলে গেল। সব রস মাটি। ভেতরে দুগাও বোধহয় ছোটরানিকে নিয়ে অন্দরমহলে চলে গিয়েছে। সেদিক থেকেও আর কোনও সাড়াশব্দ নেই। আর গান জমবে না।
উদ্ধব দাস বললে–আমিও যাই হে—
কেন? তুমি আবার যাবে কী করতে?
নেমন্তন্ন খেতে ইচ্ছে করছে। অনেক দিন নেমন্তন্ন খাইনি—
তা কী খাবে বলো না; ভোগবাড়িতে বলে দিচ্ছি, রান্না করে দেবে!
উদ্ধব দাস বললে–মুগের ডাল—
আরে এই সামান্য কথা, তার জন্যে ভাবনা, আজই মুগের ডাল বেঁধে দেব তোমায়—
উদ্ধব দাস পোঁটলা-পুঁটলি নিয়ে উঠল। বললে–দুর, তোমাদের মুগের ডাল আর খাচ্ছি আমি, আমি চললুম
কী গো? সত্যি সত্যিই যাচ্ছ? কোথায় যাচ্ছ?
কেষ্টনগরে।
হঠাৎ কেষ্টনগরে কেন?
ওই যে মুগের ডালের কথা মনে পড়ে গেল, যাই, কেষ্টনগরের রাজাবাবুদের বাড়ি যাই, অমন মুগের ডাল কোত্থাও খাইনি গো–
এমনি করে উদ্ধব দাস এই হাতিয়াগড়ের অতিথিশালায় অনেকবার এসেছে গেছে। হরিপদর সঙ্গে হাসিতামাশা করেছে। বাড়ির ছোটরানিকে গানও শুনিয়েছে। যেমন মুগের ডাল খেতে একদিন হঠাৎ কেষ্টনগরে চলে যায়, তেমনই আবার হয়তো কয়েকদিন এখানেই পড়ে থাকে। অতিথিশালায় দুটো ভাত পেলেই খুশি। তাড়িয়ে দিলেও ব্যাজার নেই। আবার হয়তো একদিন পোটলা-পুঁটলি নিয়ে কোথায় বেরিয়ে পড়ে। যদি কেউ জিজ্ঞেস করে–কী গো, কোথায় চললে দাসমশাই–
