কার কাছ থেকে সব খবর পেলেন?
কেন, আমাদের জগৎশেঠজির কাছ থেকে! আমিই তো জগৎশেঠজিকে বললাম রায়মশাইকে কলকাতায় পাঠাতে।
রায়মশাই কে?
আজ্ঞে, জগৎশেঠজির দেওয়ান। রায়মশাই তো সবই জানেন।
আমার স্ত্রীর ব্যাপারটাও জানেন নাকি?
তা আর জানেন না? আর কেই বা না জানে? নাটোরের রানি ভবানীর পর্যন্ত কানে গিয়েছে। প্রথমে ভয় পেয়েছিলেন তিনি। নবাবের চরের তো শেষ নেই। ওই যে মনসুর আলি মেহের মুহুরি আছে, ও বেটা এদিকে আমাদের দলেও আছে, আবার নবাবের দলেও আছে। আমাদের খুব সাবধানে কাজ করতে হচ্ছে কিনা। বশির মিঞার নাম শুনেছেন তো?
ছোটমশাই বললেন—হ্যাঁ হ্যাঁ, শুনেছি বটে, আমার অতিথিশালাতেও একবার গিয়েছিল, কী একটা হিন্দুর নাম নিয়ে উঠেছিল–
সে বেটা এখন মুর্শিদাবাদে রয়েছে।
কেন?
আজ্ঞে, নবাব যখন দলবল নিয়ে কলকাতায় লড়াই করতে গেছে, তখন রাজধানীটা ফাঁকা পড়ে থাকবে, সেটা দেখবার জন্যেই রয়েছে। সেই জন্যেই তো আমি রাত্তিরে গিয়ে উঠেছিলাম শেঠজির। বাড়িতে। সেই পাঠান পাহারাদার আছে শেঠজির, ভিখু শেখ, চেনেন তো? ভারী বিশ্বাসী লোক, তাকে বললাম একটু দেখিস বাবা, আমি যে এখানে এসেছি তা যেন কেউ না জানতে পারে, বলে তার হাতেও একটা মোহর গুঁজে দিলাম। বলা তো যায় না, আজকাল দিনকাল তো বদলে গেছে সব, সেই আলিবর্দি খাঁ’র আমল হলে আর এমন ভাবতাম না। মনে আছে তো সেই রামরুদ্র বিদ্যানিধির ব্যাপারটা?
ছোটমশাই বললেন–হ্যাঁ, কর্তাবাবার কাছে শুনেছিলাম।
দেখুন, সেই দু’লাখ টাকার বকেয়া বাকি খাজনা, এককথায় খুশি হয়ে মকুব করে দিলেন। তিনি ছিলেন জহুরি, গুণের কদর করতে জানতেন। সেসব দিন কোথায় চলে গেল! .
তা জগৎশেঠজি কী বললেন? রাজি হলেন রায়মশাইকে পাঠাতে?
রাজি কি আর হন? রাজি করালাম। মহারাজার চিঠি নিয়ে গিয়েছিলাম, এসব কাজ তো আর নায়েব-গোমস্তা দিয়ে হয় না। বললাম আপনার কথাও বললাম। বললাম, মহারাজ হাতিয়াগড়ের রাজামশাইকে পাঠিয়েছেন ক্লাইভ সাহেবের কাছে আর আপনার কাছে পাঠিয়েছেন আমাকে
তা জগৎশেঠজি বললেন–রায়মশাইকে নবাবের কাছে পাঠিয়ে কী ফায়দা হবে?
আমি বললাম–নবাবকে অন্তত বুঝিয়েসুঝিয়ে কিছুদিন থামিয়ে তো রাখা চলবে।
তা জগৎশেঠজি আবার জিজ্ঞেস করলেন–থামিয়ে রেখে লাভ কী?
আমি সব বুঝিয়ে বললাম–এখন ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে লড়াই হলে ফিরিঙ্গিরাই হেরে যাবে, তাতে আমাদের ক্ষতি। আর কিছুদিন পরে লড়াই হলে ভাল
জগৎশেঠজি জিজ্ঞাসা করলেন–কেন?
আজ্ঞে শেঠজি, ইংরেজদের আরও দু-তিনটে জাহাজ আসার কথা আছে, তারা আগে আসুক, তবে তো ইংরেজরা হারাতে পারবে নবাবকে।
কিন্তু ওদিক থেকে আহমদ শা আবদালি যদি এসে পড়ে?
সে এলে তখন দেখা যাবে!
তা ছাড়া যদি জেনারেল বুশি এসে পড়ে কর্ণাট থেকে, তখন কী হবে? তার আগেই তো সবফয়সালা হয়ে যাওয়া ভাল।
আমি বুঝিয়ে বললাম জগৎশেঠজি, তারা কেউ না-ও তো আসতে পারে। তারা এসে পড়লে তখন না-হয় অন্য পথ খুঁজে বার করা যাবে। আমার কথায় রায়মশাই সায় দিলেন। তিনিও বললেন এখন লড়াইটা না হতে দেওয়াই ভাল! ইংরেজরা আগে ভাল করে তৈরি হয়ে নিক! মানে, যদি কোনওরকমে একটা মিটমাট করিয়ে দেওয়া যায় দু’পক্ষে, সেইটেই আমাদের পক্ষে ভাল।
ছোটমশাই হঠাৎ বললেন–মহারাজ কখন আসবেন নীচেয়?
এই এলেন বলে, খবর পাঠিয়ে দিয়েছি। আজকে আবার একজন মস্ত কুস্তিগির আসছেন কুস্তি লড়তে–
কুস্তি লড়তে? ছোটমশাই অবাক হয়ে গেলেন কথাটা শুনে! মহারাজ আবার কুস্তি দেখতে ভালবাসেন নাকি?
কালীকৃষ্ণ মশাই বললেন–মহারাজের তো ওই খেয়াল। গোপাল ভাড় মশাইয়ের ভাঁড়ামিও শুনতে ভালবাসেন, রায়গুণাকরের কাব্য শুনতেও ভালবাসেন, আবার শিবরাম বাচস্পতির ষড়দর্শনের ব্যাখ্যাও শুনতে ভালবাসেন, সঙ্গে সঙ্গে আবার মুজাফর হুসেনের কুস্তি দেখতে ভালবাসেন–আজ দিল্লি থেকে এক কুস্তিগির আসছে যে
তা হলে তো মহারাজ ব্যস্ত খুব!
তার আগে কুস্তি হয় কি না তাই দেখুন!
কেন?
কালীকৃষ্ণ মশাই বললেন–সেই জন্যেই তো তিনি পঞ্জিকা দেখছেন, তর্কালঙ্কার মশাইকে ডেকে পাঠিয়েছেন–মল্লক্রীড়ার জন্যে আজ প্রশস্ত সময় কিনা জানতে
হঠাৎ ভেতর থেকে ডাক এল। মহারাজার খাসচাকর এসে খবর দিলে, ডাক পড়েছে মহারাজার কামরায়।
মহারাজ যাদের সঙ্গে গোপনে দেখা করেন, তাদের ভেতরে খাসকামরায় ডাক পড়ে। কালীকৃষ্ণ সিংহ মশাই উঠলেন। বললেন–চলুন, নীচে যখন এলেন না, তখন আপনার সঙ্গে নিরিবিলিতে কথা বলতে চান, চলুন
কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ির ভেতরে কখনও যাননি ছোটমশাই। ভেতরেও সদরমহল আছে। শিবমন্দির, পুকুর, অতিথিশালা, চণ্ডীমণ্ডপ, কুস্তির আখড়া, বিরাট কাণ্ডকারখানা। কাছারিবাড়ি পেরিয়ে একেবারে পুব দিকে গিয়ে মহারাজার খাসকামরা। বিরাট রাজবাড়ি। প্রকাণ্ড রাজবাড়ির পেছনে রাজবাড়ির অন্দরমহল।
ছোটমশাই গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন।
আসুন
তারপর কালীকৃষ্ণের দিকে চেয়ে বললেন–আপনি এখন নিজের কাজে যান দেওয়ানমশাই, আমি পরে ডেকে পাঠাব, ভেতরে খবর দিয়ে দেবেন ছোটমশাইয়ের কথা, ইনি আজকে থাকবেন এখানে
কালীকৃষ্ণ চলে যেতেই মহারাজ ছোটমশাইয়ের দিকে চেয়ে বললেন–এত তাড়াতাড়ি চলে এলেন যে?
ছোটমশাই বললেন না এসে উপায় কী বলুন, কোনও কাজই হল না যে–
