আজ পণ্ডিত বিদ্যানিধি বললে, চন্দ্রগ্রহণ হিন্দুস্থানে দেখা যাবে না তাই দেখব মিনারে উঠে
ওদিকে মহারাজেরও ভাবনার অন্ত নেই। কী করে মুখরক্ষে হবে মহারাজের তাই নিয়েই ভাবনা।
নবাব বলেছিলেন–যদি চন্দ্রগ্রহণ দেখা যায়, তা হলে কী হবে পণ্ডিতমশাই?
তা হলে আপনার যা অভিরুচি, তাই-ই করবেন!
তা মহারাজের ভাবনা দেখে রামরুদ্র বিদ্যানিধি বললেন–মহারাজ চিন্তা করবেন না, গ্রহণ হবে না—
মহারাজ বললেন কিন্তু এ আপনি কী বলছেন পণ্ডিতমশাই, সর্বগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ কখনও না হয়ে যায়? আপনি প্রলাপ বকছেন নাকি? এক বছর মাথা ঘামিয়ে যা গণনা করে বার করেছেন, এক দিনের কথায় তা আজ রদ হয়ে যাবে? আপনি বলছেন কী?
বিদ্যানিধি বললেন আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন মহারাজ, স্নানাদি করতে যান, আজকে আমার সঙ্গে দিবারাত্রির মধ্যে আর দেখা করতে আসবেন না
বুঝেছি, আপনি পালিয়ে যাবেন। কিন্তু নবাবের মুল্লুক ছেড়ে কোথায় পালাবেন?
বিদ্যানিধি বললেন–মহারাজ, প্রাণের মায়া কি আমার এত বড় যে বিপদের সময়ে মহারাজকেও ত্যাগ করব? আমি তেমন লোক নই
সেই দিনই বিদ্যানিধি ভাগীরথী পাড়ে গিয়ে পুজো আরম্ভ করলেন। একটা তামার কলসি আগেই জোগাড় করেছিলেন। আর জোগাড় করেছিলেন একশো আটটা লোহিতবর্ণ জবাফুল। সামনে পেছনে কেউ কোথাও নেই। মহারাজের সাঙ্গোপাঙ্গরা সেই পুজোর জিনিসপত্র নিয়ে গিয়ে ভাগীরথীর নির্জন একটা বাঁকে তুলে দিয়ে এল। বিদ্যানিধি মশাই সেই একশো আটটা জবাফুল দিয়ে যথাবিধি নিজের উপাস্যদেব সহস্রাংশুর পুজো করতে লাগলেন। তারপর সন্ধে হবার সময়েই তামার কলসিটা পুজোর বেদিতে রেখে মন্ত্রবলে রাহুকে আকর্ষণ করে কলসির মধ্যে পুরে ফেললেন। তার ওপরে একখানা তামার থালা ঢাকা দিয়ে পাঁচটি শিবলিঙ্গ স্থাপন করে একমনে উপাস্য দেবতার জপ শুরু করলেন।
নবাব মিনারের ওপর চাঁদোয়া খাঁটিয়ে চন্দ্রগ্রহণ দেখবেন বলে তখন আসর আঁকিয়ে বসেছেন। গল্প করতে করতে বললেন–মহারাজের পণ্ডিতটা একটা বুজরুক হে! মৌলবি সাহেবও আমাকে বলেছিল যে, দিল্লির পঞ্জিকাতেও নাকি লেখা আছে রাত চার দণ্ডের সময় গ্রহণ লাগবে আর দ্বিতীয় প্রহরে ছাড়বে, আর পূর্ণগ্রাস হবে
কিন্তু না, সবাই দেখলে গ্রহণ হল না।
নবাব তখন নিজের মহলে ঘুমোতে গেলেন। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের কিন্তু আর ঘুম এল না। তিনি বিদ্যানিধি মশাইয়ের খোঁজে বেরোলেন। বিদ্যানিধি মশাইয়ের তখন বাহ্যজ্ঞান নেই। সেই জনমানবহীন গঙ্গাগর্ভে মাঘ মাসের দুঃসহ ঠান্ডার মধ্যেও একলা নাগ্রে দৃষ্টিস্থাপন করে সহস্রাংশুর নাম জপ করে চলেছেন। শেষে যখন রাত শেষ হয়ে এল, তখন চাঁদ নিষ্প্রভ হয়ে গেছে। বিদ্যানিধি মশাইও গাত্রোত্থান করে শিব পাঁচটি গঙ্গাগর্ভে বিসর্জন দিলেন। তারপর তামার থালাটি তুলতেই সমস্ত পৃথিবী ঝাপসা হয়ে এল। নবাব ঘুম থেকে উঠে দেখলেন, অস্তগামী চাঁদ আকাশপটে মিলিয়ে যাচ্ছে
মহারাজ বিদ্যানিধির ঘরে এসে পণ্ডিতকে একেবারে জড়িয়ে ধরলেন।
বললেন–আপনি আমার মুখ রক্ষে করেছেন পণ্ডিতমশাই, আজকে আমি যথার্থ নবদ্বীপের মহারাজা–
তারপর সকালবেলাইনবাব আলিবর্দি খা দরবারে এলেন। এসেই বিদ্যানিধি মশাইকে জ্যোতিষশাস্ত্র সম্বন্ধে অনেক প্রশ্ন করলেন। শেষে বললেন–কী খেলাত পেলে আপনি খুশি হবেন পণ্ডিত?
বিদ্যানিধি পঁড়িয়ে উঠে কুর্নিশ করে বললেন–মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের অভীষ্টই আমার অভীষ্ট জাঁহাপনা!
বিদ্যানিধির সেই কথাতেই নবাব আলিবর্দি সেবার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের বকেয়া খাজনা সমস্ত মকুব করে দিয়েছিলেন।
উদ্ধব দাসই লিখে গেছে এসব কাহিনী আদিকালের। আদিযুগের মানুষগুলোর সঙ্গেই ওইসব কাহিনী হারিয়ে গিয়ে নিঃশেষ হয়েছে। সেই আলিবর্দি খাঁ-ও নেই, সেই রামরুদ্র বিদ্যানিধিও নেই। শুধু আছেন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র আর বিদ্যানিধি মশাইয়ের পঞ্জিকা। সেই পঞ্জিকা নিয়েই তিনি নাড়াচাড়া করছিলেন সেদিন।
হঠাৎ খবর এল দেউড়িতে হাতিয়াগড়ের ছোটমশাই এসেছেন সাক্ষাৎ করতে।
বড় অসময়ে ফিরে আসা দেখে সন্দেহ হল মহারাজের। ক্লাইভ সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে বলে দিয়েছিলেন তাকে। এত তাড়াতাড়ি তো ফেরবার কথা নয়। দেওয়ানজিকে ডাকতেই তিনি এলেন। কালীকৃষ্ণ সিংহ মশাই।
মহারাজ জিজ্ঞেস করলেন-হঠাৎ এত তাড়াতাড়ি হাতিয়াগড়ের রাজা ফিরে এলেন কেন?
কালীকৃষ্ণ সিংহ মশাই তার আগেই সব আলোচনা করেছেন ছোটমশাইয়ের সঙ্গে। জলাঙ্গীর ঘাটে তার বজরা রাখা আছে। চেহারা শুকিয়ে গেছে ক’দিনের মধ্যেই। এই কিছুদিন আগেই দেওয়ানমশাই তাকে তার নিজের বজরায় তুলে দিয়ে এসেছেন। তখনও দেখেছেন, আবার এখনও দেখছেন।
বললেন–আপনার শরীর খুব খারাপ হয়ে গেছে এই ক’দিনেই
ছোটমশাই বললেন–এ ক’দিনে বিশ্রামও হয়নি, কোনও কাজও হয়নি! শরীরের আর অপরাধ কী দেওয়ানমশাই, সেই সব কথাই মহারাজ বাহাদুরকে বলতে এসেছি
কিন্তু ক্লাইভ সাহেব কী বললেন?
ছোটমশাই বললেন–মুশকিল হল কী, আমিও যেই গেলাম অমনি নবাবও গিয়ে পড়লেন ওখানে। যদি জানতুম ঠিক এই সময়েই নবাব ওখানে যাবেন তো আমি আর যেতাম না।
নবাবের কী হাল দেখলেন?
খুবই খারাপ হাল দেওয়ানমশাই, খুবই খারাপ! কালীকৃষ্ণ সিংহ মশাই বললেন–আমি আপনি আসার ক’দিন আগেই মুর্শিদাবাদ থেকে ফিরেছি। সেখানেই এইসব খবর পেয়েছিলাম।
