কী ভাবছিস রে মেয়ে?
মরালী বললে–তোমার কথা ভাবছি নানিজি
তাঞ্জামের ভেতর দুলতে দুলতে মরালী যেন অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল, একদিন মরবার সংকল্প নিয়ে এসেছিল সে চেহেল্-সুতুনে, এখন বেরিয়েছে চেহেল্-সুতুনকে বাঁচাবার জন্যে; কোথায় সেই মুর্শিদাবাদ আর কোথায় এই কলকাতা!
নানিবেগম আবার জিজ্ঞেস করলে সত্যি বল তো, তুই ফিরিঙ্গি ছাউনিতে কী করতে গিয়েছিলি? মির্জা শুনলে কী বলবে বল তো! মির্জার কানে কথাটা যাবে না ভেবেছিস?
মরালী বললে–লোকটাকে দেখতে গিয়েছিলুম নানিজি—
কোন লোকটাকে?
ওই যে লোকটা তোমার মির্জাকে এত জ্বালাচ্ছে।
কে? লোকটা কে?
ক্লাইভ গো, ক্লাইভ।
তুই তারই সঙ্গে দেখা করে এলি!
হ্যাঁ নানিজি, লোকটাকে যত খারাপ ভেবেছিলুম তত খারাপ নয়।
নানিজি বললে–বলিহারি মেয়ে তুই বটে, তুই কী বলে তার সঙ্গে দেখা করলি? মির্জা যদি কিছু বলে?
মরালী বললে–বললেই বা, আমি তো তোমার মির্জার ভালর জন্যেই দেখা করলুম।
কিন্তু তোকে যদি ধরে রাখত?
মরালী বললে–এই দেখো, আমার কাছে কী রয়েছে দেখো–
বলে ওড়নাটা তুলে নানিজিকে দেখালে। একটা ধারালো ছোরা চকচক করে উঠল সেই অন্ধকারের মধ্যে।
আমার সঙ্গে কিছু ইতরামি করলে সফিউল্লা সাহেবকে যা করেছি, ক্লাইভেরও তাই করতাম। আমাকে তো চেনে না কেউ! এখন ক্লাইভ সাহেবকে দেখলুম, এবার উমিচাঁদ সাহেবকে দেখব দেখি কত বড় শয়তান সে! নানিজি, তুমি কিন্তু কিছু বলতে পারবে না তোমার মির্জাকে। আমি তোমার মির্জার ভালর জন্যেই যা-কিছু করছি। যখন একবার কাজে নেমেছি নানিজি, তখন এর শেষ দেখে তবে, ছাড়ব
তারপর একটু থেমে বললে–একটু তাড়াতাড়ি বেহারাদের চালাতে বলো নানিজি, অনেক দেরি হয়ে গেছে, তোমার মির্জা বোধহয় এতক্ষণ ছাউনি তুলে মুর্শিদাবাদের দিকে রওনা দিয়েছে। তার আগেই আমাদের পৌঁছোনো দরকার–জলদি চালাতে বলল, জলদি—
২.১০ রেড়ির তেলের আলো
চারি সমাজের পতি কৃষ্ণচন্দ্র মহামতি
ভূমিপতি ভূমিসুরপতি।
তার রাজ্যে শ্রেষ্ঠ ধাম সমাজপূজিত গ্রাম
শ্রীকান্ত সাগরে নিবসতি ॥
শ্রীউদ্ধব দাস নাম, হরিভক্তি লাভ কাম
উপনাম শ্রীশ্রীহরিদাস।
পয়ারে রচিয়া ছন্দ, লিখিতং গীতবন্ধ–
শ্রীবেগম মেরী বিশ্বাস ।
রেড়ির তেলের আলোর তলায় বসে বসে উদ্ধব দাস লিখত আর সুর করে করে পড়ত। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের কথা, তার দেওয়ান কালীকৃষ্ণ সিংহের কথা, গোপাল ভাঁড় মশাই, রায়গুণাকর, রামরুদ্র বিদ্যানিধির কাহিনীও লিখত।
সেদিন উদ্ধব দাস বাবুমশাইয়ের সঙ্গে বাগবাজারের বাগানে এসে দেখে ছাউনিতে কেউ নেই, ফাঁকা। লটবহর নিয়ে সবাই রওনা দিয়েছে চন্দননগরের দিকে। ছোটমশাই আর সেদিন অপেক্ষা করেননি সেখানে, সোজা চলে গিয়েছিলেন কৃষ্ণনগরে।
কৃষ্ণচন্দ্র এমনিতে পণ্ডিতদের নিয়ে দিন কাটাতেন বটে, কিন্তু নজর রাখতেন সব দিকে। তার লোক ছিল দিল্লিতে বাদশার দরবারে। তেমনি আবার অন্য লোক ছিল মুর্শিদাবাদে কাছারির কাজ করবার জন্যে। নতুন নবাব হবার পর থেকেই বড় ঝঞ্জাট চলছিল। আগেও ঝাট ছিল। কিন্তু নবাব আলিবর্দি খাঁ ছিল রসিক মানুষ। বয়েস হয়েছিল। অনেক ঠেকে, অনেক শিখে, অনেক দেখে জীবন সম্বন্ধে একটা জ্ঞান হয়েছিল। বাকি খাজনার জন্যে যেমন রাজা-জমিদারদের জমি বাজেয়াপ্ত করেছিল নবাব, তেমনি খালাসও দিয়েছিল অনেককে।
রামরুদ্র বিদ্যানিধিকে মহারাজ বরাবর সঙ্গে নিয়ে দরবারে যেতেন।
দরবারে একবার নবাব জিজ্ঞেস করলেন–আচ্ছা মহারাজ, আজ তিথি কী?
নবাব কৃষ্ণচন্দ্রকে মহারাজ বলে ডাকতেন।
মহারাজ রামরুদ্র বিদ্যানিধির দিকে চাইতেই বিদ্যানিধি বললেন–আজ পূর্ণিমা
নবাব জানতেন পণ্ডিতরা অনেক সময় ঠিকে ভুল করে। জিজ্ঞেস করলেন–আজ কি তা হলে সমস্ত রাতই জ্যোৎস্না থাকবে?
বিদ্যানিধি বললেন–হঁ জাঁহাপনা, আজ সমস্ত রাতই জ্যোৎস্না থাকবে
আলিবর্দি হেসে ফেললেন। বললেন–পণ্ডিত, আপনি কিন্তু মিছে কথা বলছেন
সমস্ত দরবারসুদ্ধ আমির-ওমরাহরা পণ্ডিতের মুখের দিকে তাকালেন। রামরুদ্র বিদ্যানিধিকে সবাই চিনতেন। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকেও সবাই চিনতেন। রামরুদ্র বিদ্যানিধিকে মিথ্যেবাদী বলা মানে মহারাজকেও মিথ্যেবাদী বলা।
কিন্তু আপনার এই পঞ্জিকাতেই তো আপনি লিখেছেন আজ চন্দ্রগ্রহণ?
মহারাজের মাথায় বজ্রাঘাত হল। বিদ্যানিধি মশাই কি তাকে লজ্জায় ফেলবেন নবাবের সামনে!
কিন্তু বিদ্যানিধি মশাই বললেন–না খোদাবন্দ, আজ চন্দ্রগ্রহণ বটে, কিন্তু সে-চন্দ্রগ্রহণ হিন্দুস্থানে অদৃশ্য, তাই সারারাতই আকাশ জ্যোৎস্নাময় থাকবে দেখে নেবেন–
কথাটা বিদ্যানিধি বললেন বটে, কিন্তু মহারাজের ভয় গেল না। দরবার থেকে ফিরে বিদ্যানিধির কাছে এসে মহারাজ বললেন–কী সর্বনাশে ফেললেন বলুন তো পণ্ডিতমশাই, এখন কী করে আমার মুখরক্ষে হবে?
সে অনেক কাল আগের কথা। সত্যি-মিথ্যে, বাস্তব কল্পনা, সবকিছু মিশিয়ে সেই নবাবি আমল। উদ্ধব দাস নিজে দেখেনি। বেগম মেরী বিশ্বাসও দেখেনি। শুধু চেহেল সুতুনের ভেতরে বেগমমহলের কাছ থেকে গল্প শুনেছে। নানিজি নিজে বলেছে মরালীকে। নবাব রাত্রে চেহেল্-সুতুনে এসে নানিবেগমকে বলেছিলেন–আজ কৃষ্ণনগরের পণ্ডিতকে জব্দ করব
নানিবেগম জিজ্ঞেস করেছিল–কেন গো, কীসে জব্দ করবে—
