শশীর তখনও চাকরি যায়নি। ফৌজের দলের সঙ্গে সে-ও চলেছে।
তাড়াতাড়ি দৌড়ে এসেছে সে কান্তর কাছে।
আবার কী চিঠি এসেছে ভাই?
কার চিঠি?
ওই যে ফিরিঙ্গিদের ছাউনি থেকে নাকি চিঠি এসেছে শুনলাম? আবার লড়াই লেগে গেল নাকি?
কান্ত বললে–আমি জানি না বোধহয় লড়াই হবে না—
শশী বললে–লড়াই হবে না তো নানিবেগমসাহেবা কী জন্যে আসছে?
কে বললে–নানিবেগমসাহেবা আসছে?
শশী বললে–আরে, তুমি কিছু শোনোনি? নানিবেগমসাহেবা আসছে বলেই তো ছাউনি পড়েছে এখেনে।
কে বললে–তোমাকে নানিবেগমসাহেবা আসছে?
আরে, নবাবগঞ্জের ডিহিদারের লোক এসে যে খবর দিয়ে গেছে। সে নিজেই আমাকে বললে।
কান্ত অবাক হয়ে গেল। সত্যি? ঠিক বলছ?
হ্যাঁ, ঠিক না তো কি বেঠিক? নানিবেগমসাহেবার সঙ্গে আর একজন বেগমসাহেবাও আসছে যে!
কে সে? নাম কী তার?
বললে–মরিয়ম বেগমসাহেবা। নবাবের নাকি খুব পেয়ারের বেগম।
কান্ত আর পঁড়াল না সেখানে। সোজা নবাবের দরবার-ঘরে ঢুকে গেল একেবারে। সেখানে তখন সবাই রয়েছে। নবাব তখন হুকুমনামা পাঠাচ্ছে মিরবকশির কাছে। জেনারেল বুশি যদি বাংলাদেশে আসে তো তার আগেই আজিমাবাদের পথে যেন তাকে আটকে দেওয়া হয়!
সমস্ত দরবার-ঘরটা তখন থমথম করছে।
হুকুমনামাটায় দস্তখত করে দিয়ে হঠাৎ নবাব মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলে এখনও নানিবেগমের তাঞ্জাম আসছে না কেন? কত দূরে তাঞ্জাম?
ডিহিদারের লোক কুর্নিশ করে বললে–জাঁহাপনা, তাঞ্জাম এই দিকে আসছিল, আসতে আসতে বাগবাজারে পেরিন সাহেবের বাগানের দিকে গেছে, ফিরিঙ্গি ফৌজের ছাউনির দিকে
কেন?
মরিয়ম বেগমসাহেবার মর্জি!
.
বেগম মেরী বিশ্বাসের সে-মর্জির কারণ খুঁজতে গেলে মরালীর মনের মধ্যেইঢুকতে হয়। যে-মেয়েনগণ্য এক গ্রামের মধ্যে জন্মেছিল, তার পক্ষে এ-ঘটনা সত্যিই অবিশ্বাস্য। তবু চেহেসূতুনের অন্ধকার বন্দিদশার মধ্যে যে সেদিন তাকে মরতে হয়নি, সেইটেই এক পরম আশ্চর্যের ব্যাপার। নইলে অন্য বেগমরা যেভাবে দিন কাটাত সেইভাবে জীবনটা কাটিয়ে দিলেই তো চলত। তাতে কেউই বাধা দিত না। এমনকী চেহেল্-সুতুন যেদিন খুঁড়িয়ে গেল সেদিন অন্য সকলের সঙ্গে মরালীও গুঁড়িয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারত। বহুদিন আগে ছোটবেলায় হাতিয়াগড়ের গায়ে যেসব মেয়েদের বিয়ে হতে দেখেছে সে, তারা কেউ কেউ শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরে এসে গল্প করত মরালীর কাছে। মরালী চুপ করে সব শুনত মন দিয়ে।
একসময় মরালী জিজ্ঞেস করত–তোর সতিন তোকে আদর করে ভাই?
কেষ্ট দাসীর নতুন বিয়ে হয়েছিল। সে বললে–দুর, সনি কখনও সতিনকে আদর করে? সতিন তো বুকের কাঁটা রে–
তখন থেকেই বিয়ের নাম শুনলে ভয় হত তার। বলত–তোর বর কার সঙ্গে শোয়?
আমার সতিনের সঙ্গে! সতিন যে বড়।
তুইও তো বড়।
দুর, আমার সতিন আমার মায়ের বয়েসি।
আর তোর বর? তোর বরের বয়েস কত?
আমার বর আমার বাবার চেয়েও বড়। খুব রাগ ভাই মানুষটার, হাঁপানি আছে কিনা
তা নতুন বউ ফেলে পুরনো বউয়ের কাছে শোয় কেন?
কেষ্ট দাসী বলত–ওমা, তা শোবে না, আমার সতিনের গায়ে যে খুব জোর, আমার সঙ্গে শুলে বরকে মেরে একেবারে হাড় গুঁড়িয়ে দেবে না। আমার সতিন তো তাই আমার বরকে বলে। বলে তুমি বিয়ে করেছ বেশ করেছ, পোড়ারমুখিকে মা হতে দেব না
শুনে মরালীর হাড় হিম হয়ে আসত। আহা, সেই কেষ্ট দাসীর শেষকালে পেটে ছেলে হল। কিন্তু আঁতুড়ঘরে মরা-ছেলে বিইয়ে সেই যে চোখ মটকে পড়ে রইল, আর উঠল না। তখন থেকেই শোভারাম বিয়ের কথা তুললেই মরালী ভেতরে ভেতরে সিটিয়ে উঠত। নয়ানপিসির কাছে গিয়ে বলত–তুমি বাবাকে বলো পিসি, আমি বিয়ে করব না–
নয়ানপিসি চোখ কপালে তুলে বলত–ছিঃ, ওকথা মুখে আনতে নেই, বিয়ে না করে কি আঁটকুড়ি থাকতে আছে?
কেন, আঁটকুড়ি থাকলে কী হয়?
তা জানিসনে বুঝি, সোমথ মেয়ে আঁটকুড়ি থাকলে ভূতে ঢেলা মারে যে!
ভূতে ঢেলা মারলে বুঝি আমিও ভূতকে ঢেলা মারতে পারিনে?
নয়ানপিসি অবাক হয়ে যেত মরির তেজ দেখে। শোভারামকে বলত–তুমি দাদা, একটু তাড়াতাড়ি ওর বিয়ের জোগাড়যন্ত্র করো, আমি ওর মতিগতি ভাল বুঝছিনে–
আবার বহুদিন পরে যখন চেহেল্-সুতুনে গিয়েছিল মরালী তখনও সেইরকম। তখনও নানিবেগম দেখত এ এক অদ্ভুত মেয়ে। অনেক মেয়ে দেখেছেনানিবেগম। সকলকে নিয়ে এতদিন সামলে এসেছে। কেউ এসেছে কান্দাহার থেকে, কেউ খারাশান। কেউ বা চট্টগ্রাম, আবার কেউ বা আগ্রার তয়ফাওয়ালি ঘরানার মেয়ে। কিন্তু প্রথম দিনটা থেকেই মরালী যেন নানিবেগমের বুকটা জুড়ে সব আদর কেড়ে নিয়েছে। কোনও নিয়মকানুন মানবে না, কোনও আদবকায়দা শিখবে না।
পেশমন বেগম কতবার নালিশ পেশ করেছে–মরিয়ম বেগমকেই তুমি বেশি ভালবাসো নানিজি, আমাদের দিকে একবারও নজর দাও না
মরিয়ম বেগমের কাছে এসে নানিবেগম কতবার বলেছে–সকলের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারিসনে কেন তুই, সবাই যে তোর নামে শিকায়ৎ করে–
মরালী বলত–তা হলে তুমি আমাকে বকো আমাকে মারো—
নানিবেগম বলত–তুই রাগ করছিস কেন, আমি কি তাই বলেছি?
মরালী বলত–তা হলে আমিই খারাপ, ওরা সবাই ভাল
সে এক তুমুল কাণ্ড বাধিয়ে বসত তখন মরিয়ম বেগম। খাবে না, দাবে না, কিছু করবে না। বিছানায় মুখ গুঁজে পড়ে থাকত। সমস্ত চেহেল্-সুতুনে যখন সবাই গান-বাজনা নিয়ে আছে, তখন মরালী নিজের ঘরে মুখ-গোমড়া করে থাকলে নানিবেগমের ভাল লাগত না। নিজের মেয়েরা মায়ের দিকে ফিরেও চেয়ে দেখত না। মির্জা মহম্মদ ঘসেটি বেগমকে মতিঝিল থেকে তাড়িয়ে দিয়ে নজরবন্দি করে রেখেছে, ময়মানা বেগমের ছেলেকে খুন করে ফেলেছে, সমস্তই যেন নানিবেগমের দোষ। আমিনা বেগমের ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে সোরার কারবার বন্ধ হয়ে গেছে, তাও যেন নানিবেগমের দোষ। যতদিন নবাব আলিবর্দি খাঁ সাহেব বেঁচে ছিল ততদিন নানিবেগমের ভয়ে সবাই তটস্থ থাকত। চেহেল্-সুতুনের সব কানুন কায়দা সবাই মেনে চলত। ভিস্তিখানায় ঠিক সময়ে পানি দিত ভিস্তিওয়ালা। ঠিক সময়ে ইনসাফ মিঞা নহবতখানায় উঠে নহবতে সুর লাগাত। জুম্মা মসজিদে ঠিক সময়ে সিন্নি চড়ত।
