হিন্দু মেয়েরা কি স্বামীকে ছেড়ে নিজের গরজে পরপুরুষের আশ্রয়ে থাকে কর্নেলসাহেব? তাও কি আমাকে বিশ্বাস করতে বলেন?
ক্লাইভ বললে–তা হলেই বুঝুন বেগমসাহেবা, নবাবের শাসনে দেশের কী অবস্থা হয়েছে, হিন্দু মেয়েরা বরং আমাদের মতো ম্লেচ্ছ লোকের আশ্রয়ে আসা নিরাপদ মনে করে, তবু নিঃসঙ্গ অবস্থায় রাস্তায় বেরোতে সাহস পায় না।
তারপর একটু থেমে বললে–বেগমসাহেবা হয়তো সবই জানেন, তবু যদি তার মনে না থাকে তো জানিয়ে রাখি যে, হাতিয়াগড়ের এক রানিবিবিকেও নবাব নিজের খেয়াল স্যাটিসফাই করবার জন্যে। নিজের হারেমে পুরে রেখেছেন
আপনি কী করে জানলেন? কে বললে–আপনাকে?
ক্লাইভ বললে–আমি জানি, আমি বিশ্বাসযোগ্য লোকের মুখে শুনেছি
কে সে?
তার নাম না-ই শুনলেন বেগমসাহেবা। নাম জানলে হয়তো তার ওপর নিজামতের অত্যাচার বাড়তে পারে!
সেই রানিবিবির এখনকার নাম কী?
বেগমসাহেবা যদি প্রতিজ্ঞা করেন কাউকে বলবেন না, তা হলে বলব।
মরালী বললে–প্রতিজ্ঞা করছি বলব না, এবার বলুন?
মরিয়ম বেগম!
মরালী হেসে উঠল–কী আশ্চর্য, মরিয়ম বেগম তো আমারই নাম, কিন্তু আমি তো হাতিয়াগড়ের রানিবিবি নই!
ক্লাইভ বললে–তা হলে অন্য মরিয়ম বেগম। চেহেল্-সুতুনে শুনেছি তিন-চারশো বেগমসাহেবা আছেন, বেগমসাহেবা কি সকলকেই চেনেন? আরও ক’জন মরিয়ম বেগম আছেন, বেগমসাহেবার পক্ষে কি তা জানা সম্ভব?
কিন্তু কে কর্নেল সাহেবকে এত খবর জানালে, তা তো কর্নেল সাহেব বললেন না!
মনে আছে!
ক্লাইভ বললে–হাতিয়াগড়ের রাজাসাহেব নিজেই
তিনি কি নিজেই এসেছিলেন কর্নেল সাহেবের কাছে?
কিন্তু বেগমসাহেবার একথার আর উত্তর দেওয়া হল না। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন সোজাসুজি ঘরে ঢুকে পড়েছে, আর বাইরে বেশিক্ষণ ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে পারেনি। অ্যাডমিরালকে দেখে বেগমসাহেবাও যেন অপ্রস্তুত হয়ে গেছে। ক্লাইভও অপ্রস্তুত! বোরখা-রা মূর্তিটা বিনা সম্ভাষণেই ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে গেল।
অ্যাডমিরালের চোখ-মুখ তখন লাল হয়ে উঠেছে অস্বস্তিতে!
রবার্ট, হোয়াট ইজ দিস?
ক্লাইভ বললে–কীসের কী?
আমি কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব বাইরে? চন্দননগর অ্যাটাক করার প্রোগ্রাম কি ভুলে গেছ তুমি? নবাবের কাছে যে চিঠি লেখা হয়েছিল তার রিপ্লাই এসেছে?
রিপ্লাইয়ের জন্যে আমি ওয়েট করব না ঠিক করেছি। রিপ্লাইয়ের জন্যে যদি ওয়েট না করে তো এতক্ষণ কার জন্যে ওয়েট করছিলে? হু ইজ দ্যাট পরদা-লেডি? তোমার সঙ্গে এর কী রিলেশন? মেয়েদের ওপর উইকনেস কি এখনও তোমার গেল? মেয়েরা কি খুঁজে খুঁজে তোমার কাছেই আসে কেবল? কই, আমার কাছে তো আসে না কেউ?
তারপর ভাল করে ক্লাইভের দিকে চেয়ে বললে–টেল মি রবার্ট, হু ইজ সি? তোমার কাছে কী করতে এসেছিল?
ক্লাইভ বললে–সেকথা তোমার জানবার দরকার নেই—
ইজ ইট এ সিক্রেট?
ইয়েস!
ও কি নিজামতের স্পাই?
না! ওকথা থাক, অন্য কথা বলল। আমি উমিচাঁদকে খবর দিয়েছিলাম আমাদের চিঠি পেয়ে নবাব কী বলেছে তা জানাতে! আমি উমিচাঁদের রিপ্লাইয়ের জন্যে অপেক্ষা করছি। সেই চিঠি পেলেই আমি আর্মি নিয়ে হুগলি রিভার পেরিয়ে চন্দননগরের দিকে যাব।
আর কতক্ষণ ওয়েট করব?
যতক্ষণ না উমিচাঁদের চিঠি আসে। সেই লেটার পেলেই বুঝব নবাব আমাদের ফ্রেন্ড না এনিমি। উমিচাঁদের লেটার না পেলে আমি কিছুই ডিসাইড করতে পারছি না!
বাইরের তাঞ্জামের ভেতরে ঢুকতেই নানিবেগম বললে–ওমা, এতক্ষণ কী করছিলি রে তুই? আমার তো ভয়ে হাত-পা হিম হয়ে আসছিল। এত কী কথা তোর সাহেব-ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে?
মরালী ভেতরে ঢুকেই বোরখার মুখটা মাথায় তুলে দিয়েছিল। বাইরের সেপাইদের হুকুম দিলে চলো, নবাব-ছাউনিতে চলো
বাইরে তখন বেশ দিন। দূর থেকে কে যেন ঘোড়া ছুটিয়ে আসছিল। ভেতর থেকে তার আওয়াজ শোনা গেল। হয়তো নবাবের লোক। নানিবেগম কলকাতায় আসছে খবর পেয়ে নিজামতের খাসনবিশ হয়তো ঘোড়সওয়ার পাঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু, না, তা নয়। ঘোড়সওয়ারটা আওয়াজ তুলতে তুলতে ধুলো উড়িয়ে কোম্পানির বাগানের দিকে এগিয়ে গেল। তাঞ্জাম সোজা এগিয়ে চলতে লাগল। তাঞ্জামের ভেতর থেকে তখন শুধু তাঞ্জামের বেহারাদের ভারী নিশ্বাস পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে হুম, হাম, হুম, হাম, হুম…
*
নবাবের ফৌজি সেপাই গোবিন্দ মিত্তিরের বাগান থেকে বেরিয়ে সোজা নবাবগঞ্জের দিকে যাচ্ছিল। সমস্ত দিন চলে সন্ধেবেলা একটা বাগানের নীচে এসে ঘাটি গেড়েছিল সবাই। সেখানে সারারাত থেকে আবার ভোরবেলা রওনা দিতে হবে।
কিন্তু ভোরবেলাই চিঠিটা এল কর্নেল রবার্ট ক্লাইভের।
চিঠিটা সবাই দেখলে। উমিচাঁদ আর ওয়াটস্ পাশেই ছিল। চিঠিটা পড়ে নবাব সবাইকে দেখালে একের পর এক। শুধু কান্ত চুপ করে সকলের মুখের দিকে চেয়ে দেখতে লাগল। কারও মুখে কোনও কথা নেই।
তোমার কী মতলব জাফর খাঁ?
শুধু জাফর আলি খাঁ নয়, কলকেই মতামত জিজ্ঞেস করলেন নবাব। এই সেদিন ফিরিঙ্গিরা যা বলেছে তাতেই রাজি হয়ে নবাব দস্তখত দিয়ে এসেছে। একটা রাত কাটতে না কাটতেই আবার নতুন আবদার জুড়ে দিয়েছে। এরা কি সত্যিই শান্তি চায়, না লড়াই চায়?
কান্ত নবাবের মুখের দিকে তাকিয়ে অনেক কষ্টে নিজের দুঃখ চেপে রাখতে চেষ্টা করল। কান্তকে তো কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে না। কান্তর তো কিছু বলবার অধিকারও নেই।
