তা হলে নবাবের অমতেই কি বেগমসাহেবা কোম্পানির ক্যাম্পে এসেছেন?
মরালী বললে–নবাবের বেগমসাহেবারা মাটির পুতুল নন বলেই আসতে পেরেছি।
তারপর একটু থেমে বললে–কিন্তু নবাব আপনাদের কী শত্রুতা করেছে যে, তাকে দিয়ে এমন অপমানের শর্তে দস্তখত করিয়ে নিলেন?
ক্লাইভ বললে–বেগমসাহেবা দেখছি নবাবের আম-দরবারের ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামান।
মরালী বললেনবাবের লোকসান হোক এ আমরা চাই না বলেই এত কথা বলছি।
যাক, তবু একজনকে পাওয়া গেল যিনি নবাবের লোকসান কামনা করেন না। বেগমসাহেবা যে নবাবের শুভাকাঙ্ক্ষী, এটা জেনেও আনন্দ হল।
মরালী বললে–আপনার উপহাস শোনবার জন্যে আমি এখানে আসিনি কর্নেলসাহেব, আর আপনার উপহাসের পাত্রীও আমি নই।
ক্লাইভ বললে–আমার অপরাধ মাপ করবেন বেগমসাহেবা
মাপ করবার কথা নয়, নবাব যখন দাসখতে দস্তখত করে দিয়েছে, তখন সবকিছু অপমানের জন্যে। তৈরি হয়েই আপনার কাছে এসেছি
বলুন, বেগমসাহেবার আমি কী উপকার করতে পারি?
মরালী বললে–আমি মুর্শিদাবাদ থেকে বেরিয়েছিলুম নবাবকে সৎ-পরামর্শ দেবার জন্যে। কারণ আশেপাশে যারা আছে, তারা কেউই নবাবের মঙ্গল চায় না। কিন্তু আমি এসে পৌঁছোবার আগেই যা হবার তা হয়ে গেছে। এখন আমি এসেছি অন্য কাজে!
হুকুম করুন!
আমার সঙ্গে নানিবেগমসাহেবা আছেন, তিনি বাইরে তাঞ্জামে অপেক্ষা করছেন।
সেকী? তাকে বাইরে রেখে এসেছেন কেন? ভেতরে নিয়ে আসুন।
বলে ক্লাইভ নিজের আর্দালিকে কী হুকুম করতে যাচ্ছিল, কিন্তু মরালী বাধা দিলে।
বললে–একটা বিশেষ কারণেই তাকে বাইরে রেখে এসেছি, নানিবেগমের সামনে সে কথা বলা যাবে না।
তা হলে এদেরও বাইরে যেতে বলি?
বলে ইঙ্গিত করতেই গার্ড-পাহারা-সেপাই সবাই বাইরে চলে গেল। ক্লাইভ সাহেবের ঘরের মধ্যে তখন একেবারে দুজনে দুজনের মুখের দিকে চেয়ে রইল।
এবার বলুন বেগমসাহেবা।
মরালী বললে–আপনার ছাউনিতে একজন জেনানা আছে
জেনানা!
মিথ্যে কথা বলবেন না কর্নেলসাহেব। আমি খুব ভাল লোকের মুখ থেকে খবর পেয়েছি আপনার ছাউনিতে একজন হিন্দু মেয়েমানুষ আছে, গেরস্তের বউ; আপনি তাকে আপনার অন্দরমহলে লুকিয়ে রেখে দিয়েছেন।
ক্লাইভ কিছু উত্তর দিতে পারলে না। চুপ করে রইল।
মরালী বলতে লাগল–বরাবর মুর্শিদাবাদের নবাবদেরই বদনাম আছে যে, তারা নাকি পরের বউ-মেয়ে-ঝিদের চেহেল্-সুতুনে এনে পুরে রাখে। কর্নেল সাহেবেরও কি সেই দোষ আছে?
কে বেগমসাহেবাকে একথা বললে?
কর্নেলসাহেব আগে বলুন যে, আমি যে-খবর পেয়েছি সে-খবর মিথ্যে!
ক্লাইভ বললে–বেগমসাহেবা তো নিজে মুসলমান, আমি যদি হিন্দু মেয়েকে নিজের জেনানাতে রেখেই থাকি, তাতে বেগমসাহেবার কীসের আপত্তি? বেগমসাহেবা কি আমার প্রাইভেট লাইফের ওপরেও নজর দিতে চান? আর আমি যদি হিন্দু মেয়েকে নিয়ে ঘরে তুলে থাকিই তো তাতেও কি নবাবের বিরুদ্ধাচরণ করা হয়? নবাব যদি একশো-দু’শশা জেনানা রাখতে পারেন তার চেহেল্-সুতুনে, নবাবের প্রজারা কি তা পারে না? আর তা ছাড়া, আমি তো নবাবের প্রজাও নই
হঠাৎ বাইরে থেকে গার্ড ডাকলে—হুজুর
কে?
অ্যাডমিরাল ওয়াটসন সাহেব আয়া হুজুর।
ক্লাইভ সাহেবের মুখটা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। তারপর বললে–একটু ওয়েট করতে বলো—
গার্ড চলে যেতেই বেগমসাহেবার দিকে চেয়ে ক্লাইভ বললে–আমি লর্ড জেসাস ক্রাইস্টও নই, নবাব মির্জা মহম্মদ সিরাজউদ্দৌলাও নই, আমি যদি আমার ক্যাম্পে মেয়েমানুষ রাখিই তো কার কীসের ক্ষতি? নবাবের সঙ্গে আমার সন্ধির যে-টার্মস তাতে তো মেয়েমানুষ রাখা-না রাখার কোনও শর্তও নেই। আমি আমার ক্যাম্পের ভেতরে বসে যা-খুশি তাই-ই করতে পারি
মরালী বললে–তারা কি এখন এখানে আছে?
ক্লাইভ বলে–বেগমসাহেবা কার কাছ থেকে শুনলেন, সেকথা আগে বলুন।
মরালী বললে–শুনেছি একজন রাস্তার লোকের কাছ থেকে
কে সে?
সে একজন পাগল, পাগল কবি!
পোয়েট? তার সঙ্গে বেগমসাহেবার কোথায় দেখা হল?
ত্রিবেণীতে! কিন্তু যেখানেই দেখা যোক, কথাটা সত্যি কি না কর্নেলসাহেব বলুন, যদি সত্যি হয় তো আমি কর্নেল সাহেবকে অনুরোধ করব তাদের নিজেদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে। পরের বাড়ির বউকে নিজের কাছে আটকে রাখা যে ভাল নয় তা কর্নেলসাহেব নিশ্চয়ই বোঝেন।
ক্লাইভ বললে–বেগমসাহেবার সদুপদেশ পালন করতে পারলে আমি খুশিই হতাম, কিন্তু বাংলাদেশের নবাবের যা চরিত্র তাতে তাকে একলা ছাড়তেও ভয় হয়। আমার হাত থেকে ছাড়া পেলেও নবাবের দৃষ্টি থেকে ছাড়া পাবে এমন আশা কম, বেগমসাহেবা।
মরালী বললে–বাংলার নবাব সম্বন্ধে অনেক কথাই বলতে পারতাম কর্নেলসাহেব, কিন্তু এখন সেসময় আমার নেই–যা হোক, আমার অনুরোধ আমি রেখে গেলাম কর্নেল সাহেবের কাছে, যদি সম্ভব হয় কর্নেলসাহেব সে-অনুরোধ রাখবেন, আর সম্ভব না হলে রাখবেন না আমার কিছু করবার নেই–
কিন্তু সেই গৃহস্থবাড়ির বউয়ের জন্যে বেগমসাহেবার এত উদ্বেগ কেন, জানতে পারি কি?
মরালী বললে–উদ্বেগ অন্য কারণে, উদ্বেগ তিনিও আমার মতো মেয়েমানুষ বলে! মেয়েমানুষ না হলে মেয়েমানুষের দুঃখ কে বুঝবে, কর্নেলসাহেব তা নিজেই বুঝতে পারেন।
কিন্তু যদি এমন হয় যে তারা নিজের ইচ্ছেতেই এখানে আছে? তাদের নিজেদের গরজেই এখানে আছে? তা হলেও কি বেগমসাহেবা আমাকেই দোষী করবেন?
