তবু সেই ভোরবেলা রবার্ট ক্লাইভ একটু ভেবে নিলে।
নবাবের বেগম তার ক্যাম্পে এসেছে। এ যেমন অবিশ্বাস্য তেমনই অভাবনীয়।
একলা এসেছে, না সঙ্গে আর কেউ আছে? ৪০৮
সঙ্গে নবাবগঞ্জের ডিহিদার সাহেব আছে। আর তাঞ্জামের মধ্যে আছেন বেগমসাহেবারা!
আমার সঙ্গে কী দরকার, কিছু বলেছে?
না, শুধু আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান, আর কিছু বলেননি।
নবাবের বেগমসাহেবা! তাদের এই ক্যাম্পের মধ্যে কোথায় বসাবে, কেমন করে খাতির করবে তার ব্যবস্থাটা একবার ভেবে নিলে ক্লাইভ। তারপর বললে–আচ্ছা, ভেতরে নিয়ে আয়–
ওদিকে ব্যাটালিয়ন তৈরি হয়ে গিয়েছে। তাদের নিয়ে রওনা দিতে হবে চন্দননগরের দিকে। এই অবস্থায় নবাবের বেগমের সঙ্গে ভাল করে কথা বলাও যাবে না।
কিন্তু ভাববারও আর সময় পাওয়া গেল না। দু’জন সেপাইয়ের সঙ্গে বোরখা-পরা একটা মূর্তি এসে দাঁড়াতেই ক্লাইভ সসম্মানে নিচু হয়ে কুর্নিশ করলে।
আমি চেহেল সুতুনের বেগমসাহেবা মরিয়ম বেগম।
ক্লাইভ নিচু হয়ে বোরখা-পরা মূর্তিটার দিকে চেয়ে বললে–আমি আপনার কী নজরানা দিতে পারি বলুন?
মরালী বললে–নজরানা নিতে আমি আসিনি
ক্লাইভ বললে–বেগমসাহেবা নজরানা নিতে না এলেও, কোম্পানির উচিত নজরানা দেওয়া
মরালী বললে–না, নজরানা নেওয়ার এ সময় নয়, আর এ জায়গাও নয়। আপনি যখন মুর্শিদাবাদে নবাবের দরবারে যাবেন তখন নজরানা নিয়ে যাবেন, এখন নয়।
এ তো বেগমসাহেবার অনুগ্রহ!
অনুগ্রহ করতে আসিনি আমি। আমি আজ অনুরোধ করতে এসেছি কোম্পানির কর্নেল রবার্ট ক্লাইভের কাছে!
ক্লাইভ বললে–ওকথা বলবেন না বেগমসাহেবা। আমি কোম্পানির সারভেন্ট, আর নবাবের আন্ডারে কোম্পানি হিন্দুস্থানে কারবার করে টাকা উপায় করতে এসেছে। নবাব যা হুকুম করবেন কোম্পানি তা মাথা পেতে পালন করতে বাধ্য!
কালকে যে-ঘটনা ঘটে গেছে তার পরেও কি আর সে কথা বলা চলে?
ক্লাইভ বিনীত সুরে বললে–কোম্পানি যদি অন্যায় করে কিছু করে থাকে তো সে কথা বলা চলে বই কী!
মরালী বললে–কিন্তু নবাব তো কাল কোম্পানির ফৌজের সঙ্গে লড়াইতে হেরে গেছে, হেরে গিয়েই ফয়সালা করতে বাধ্য হয়েছে।
ক্লাইভ একটু চুপ করে থেকে বললে–বেগমসাহেবাকে কি এই কথা বলতেই নবাব আমার কাছে পাঠিয়েছেন?
মরালী বললে–নবাব এত বেইমান নয় কর্নেলসাহেব, নবাব যেকাগজে দস্তখত করেছেন তিনি তার মর্যাদা রাখতে জানেন। তা নাকচ করবার জন্যে আমি আপনার কাছে আসিনি। আমি এসেছি অন্য কাজে
অর্ডার করুন বেগমসাহেবা।
মরালী বললে–লোকের মুখে শুনেছিলুম, ইংরেজ কোম্পানির নতুন কর্নেলসাহেব খুব মতলববাজ, মানুষকে বিপদে ফেলে কাজ হাসিল করতে ওস্তাদ।
ক্লাইভ বললে–বেগমসাহেবারা চেহেল্-সুতুনের ভেতরে থেকে সব সময়ে সত্যি খবর পান না বলেই সন্দেহ হয়–
কর্নেলসাহেব দেখছি চেহেল্-সুতুনের খবরও রাখেন?
চেহেল্-সুতুনের খবর না রাখলে যে কোম্পানির চলে না বেগমসাহেবা।
কেন? চেহেল্-সুতুনে যে সুন্দরী মেয়েমানুষ থাকে তার খবর বুঝি বিলেতের কোম্পানির দফতরেও পৌঁছিয়েছে?
ক্লাইভ হাসল। বললে–সুন্দরী-মেয়েমানুষ থাকে সে খবর না পৌঁছোলেও সেখানকার বেগমসাহেবাদের তহবিলে যে অনেক টাকা আছে, তার খবর পৌঁছিয়েছে।
কোম্পানি তা হলে শুধু হিন্দুস্থানের টাকাই নয়, বেগমসাহেবাদের টাকার দিকেও নজর দেয়?
ক্লাইভ বললে–না বেগমসাহেবা, নজর কোম্পানির সাহেবরা দেয় না, বরং ঠিক তার উলটো। বেগমসাহেবারাই বরং কোম্পানির তহবিলের টাকার দিকে নজর দেন।
মরালী বললে–তার মানে?
তার মানে যে বেগমসাহেবা জানেন তা নয়, কিংবা হয়তো নতুন করে আমার মুখ থেকে মানেটা শুনতে চাইছেন। বেগমসাহেবা নিশ্চয় জানেন, নবাবের মা কোম্পানির কাছে মাল বিক্রি করতেন, এবং তার জন্যে নগদ মোটা মুনাফা পেতেন। এতদিন পরে নবাবের সঙ্গে বোঝাঁপড়া হবার ফলে সে কারবার তাদের আবার চালু হবে। তাতে কোম্পানিরও লাভ, বেগমসাহেবাদেরও লাভ বই লোকসান নেই।
মরালী বললে–বেগমসাহেবাদের লাভ হলে যে নবাবের লাভ হয় না এটা বোধহয় কর্নেল সাহেবের জানা আছে। বাংলার নবাবের আর বেগমদের স্বার্থ যে এক নয়, তাও বোধহয় কর্নেল সাহেবের জানতে বাকি নেই!
ক্লাইভ বললেনবাবের হাঁড়ির খবর আমাদের জানবার কথা নয়, বেগমসাহেবা।
তা তো নয়, কিন্তু নবাবের ক্ষতি করবার জন্যে ষড়যন্ত্র করবার সময় তো সে কথা মনে থাকে না কর্নেল সাহেবদের!
ক্লাইভ সেকথার উত্তর না দিয়ে বললে–বেগমসাহেবা কি ঝগড়া করবার জন্যেই এখানে এসেছেন? এখন কিন্তু আমার ঝগড়া করবার সময় নেই
মরালী বললে–সময় আমারও নেই কর্নেলসাহেব, কিন্তু অনেক কষ্টে সময় করে নিয়ে এসেছি
চেহেল্-সুতুনের বেগমসাহেবাদের সময় কাটে না বলেই তো জানা ছিল একদিন।
এবার থেকে জেনে রাখুন, চেহেল্-সুতুনের সব বেগমসাহেবা মাটির পুতুল নয়।
ক্লাইভ বললে–মাটির পুতুল তো আমি বলিনি তাঁদের, আমি শুধু বলেছি নবাবের কথায় তারা ওঠেন বসেন!
কিন্তু নবাবের কথায় উঠলে বসলে কি নবাবের বেগমসাহেবারা কোম্পানির ফিরিঙ্গি আমলাদের সঙ্গে সোরার কারবার করতে পারতেন? নবাবের কথা যদি বেগমসাহেবা শুনতেন তা হলে কি আমিই কর্নেল সাহেবের সঙ্গে এমন করে এখানে দেখা করতে আসতে পারতাম?
ক্লাইভের চোখ দুটো এবার কৌতূহলী হয়ে উঠল।
