ক্লাইভ সাহেব নিজে তখনও তার নিজের কামরায়। একটা লড়াই মিটতে-না-মিটতে আর-একটা লড়াই। তবু সেন্ট-ফোর্ট-ডেভিডের কম্যান্ডার শেষবারের মতো নিজের মনটাকে চাঙ্গা করে নিচ্ছিল। হাতের বন্দুকটা আর একবার পরীক্ষা করে নিচ্ছিল।
হঠাৎ গার্ড এসে খবর দিলে নবাবের বেগমসাহেবার তাঞ্জাম এসেছে।
হোয়াট!!!
নবাবের বেগমসাহেবার তাঞ্জাম।
তবু যেন ক্লাইভের কানে কথাটা ঢুকল না।
বললে–হোয়াট ডু ইউ মিন?
গার্ড আবার স্পষ্ট করে বুঝিয়ে বললে–মুর্শিদাবাদের নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলার বেগমসাহেবা কর্নেল সাহেবের সঙ্গে মিট করতে এসেছে
ক্লাইভ চিৎকার করে উঠল–আর ইউ ম্যাড? কে বেগম? কোন বেগম? নাম কী বেগমসাহেবার?
মরিয়ম বেগম!
.
এমন যে হবে কেউ ভাবতে পারেনি। আজকে যা ইতিহাস, সেদিন তা ছিল বাস্তব সত্য। উদ্ধব দাসের সময়ে মানুষ ভাবতেই পারত না জাহাজ চড়ে যে-সব সাদা চামড়ার মানুষরা এখানে ব্যাবসা করতে এসেছে, তারা একদিন আবার এখানকার নবাবের কাছ থেকে মসনদ কেড়ে নেবে। তারা ভাবত, যেমন পশ্চিম থেকে বর্গিরা এসে ধান চাল লুঠ করে এখানকার মানুষদের খুন-জখম করে পালিয়ে যায়, এই সাদা চামড়ার মানুষরা তেমনি একদিন দেশ ছেড়ে চলে যাবে নবাবের ভয়ে।
কিন্তু তখনকার মানুষরা বড় ধর্মভীরু ছিল।
তারা বলত–মাথার ওপর ভগবান আছে হে, যা করবার তিনিই করবেন আমরা তো নিমিত্ত মাত্র–
কিন্তু হিন্দুর যেমন ভগবান আছে, মুসলমানেরও তেমনই আছে আর একটা ভগবান। আর শুধু হিন্দু-মুসলমান কেন, খ্রিস্টানদেরও কি ভগবান নেই? সকলেরই তো নিজের নিজের আলাদা আলাদা ভগবান। সকলের ভগবানই তাদের নিজেদের ভক্তদের মঙ্গল কামনা করত। তাই খ্রিস্টানরা যেত গির্জায়, মুসলমানরা যেত মসজিদে, আর হিন্দুরা মন্দিরে।
আসলে অষ্টাদশ শতাব্দিতে যা ঘটল সেটা বোধহয় ভগবানে ভগবানে লড়াই। মুসলমানের আল্লাহর সঙ্গে খ্রিস্টানের যিশুর লড়াই। আর তাই যদি না হবে তো এমন বিপর্যয়ই বা ঘটবে কেন?
ইংরেজরা যেদিন প্রথম হিন্দুস্থানে এল সেদিনের সাল-তারিখ ইতিহাসের পাতার এক কোণে হয়তো লেখা আছে। কিন্তু কে জানত সেদিন যে, হিন্দুস্থানের ম্যাপের রং মবলক বদলিয়ে দিয়ে তবে তারা এখান থেকে দেশে ফিরে যাবে? সামান্য ষোলো হাজার টাকা তো মাত্র। ধারাপাতের ষোড়শ শব্দের পরে তিনটে গোল গোল শূন্য বসালে যা হয় তাই। বলতে গেলে মিনি-মাগনায় পাওয়া সেই কলিকাতা, সুতানটি আর গোবিন্দপুরের জমিদারি যে এম্পায়ারে পরিণত হবে তাই-ই বা কে জানত? সেন্ট ফোর্ট ডেভিডের কম্যান্ডার কর্নেল রবার্ট ক্লাইভই কি তা কল্পনা করতে পেরেছিল?
নবাব মির্জা মহম্মদ সিরাজ-উ-দ্দৌলা আলমগিরের কথা ছেড়ে দাও। দাদুর আদরের নাতি, উত্তরাধিকারসূত্রে অমন লাখেরাজি মৌরসিপাট্টার জমিদারি পেয়ে অনেকেরই মাথা বিগড়ে যায়। যার মাথা বিগড়ে যায় না, সে বাহাদুর মানুষ। কিন্তু রবার্ট ক্লাইভ?
ক্লাইভের আগে আরও অনেক ক্লাইভ এসেছে। ক্লাইভের পূর্বপূরুষ থেকেই তো শুরু হয়েছিল এম্পায়ার তৈরির কাজ। তারা নে এল এই মাছিমশা বনজঙ্গলের দেশে? কে তাদের আসতে বলেছে? তুমি আমি যখন বটতলার চণ্ডীমণ্ডপে বসে রামায়ণ-মহাভারত পড়ে হরিধ্বনি দিয়ে পরকালের সুখ ঐশ্বর্যের স্বর্গবাস কায়েম করতে চেয়েছি, তখন ইহলোকের সুখ-ঐশ্বর্যের পাকা বন্দোবস্ত কায়েম করতে আর-এক দেশের আর-এক মানুষের দল যে ঝড়ঝাপটা-বিপদ-বিসংবাদ অগ্রাহ্য করে পালতোলা কাঠের জাহাজ নিয়ে সমুদ্রের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তা কল্পনা করতেও পারিনি। যারাই এখানে এসেছে তারা চেয়েছে বিনা মাশুলে ব্যাবসা করতে। বিনা মাশুলে ব্যাবসা করে নিজেদের দেশে টাকা-মোহর-সোনা-দানা পাঠাতে। এ-দেশের রক্ত শুষতে। কিন্তু নবাব বাদশা তাতে বাধা দিলেই তিনি খারপ হয়ে গেলেন। মুর্শিদকুলি খাঁ থেকে শুরু করে যত নবাব ফিরিঙ্গিদের ব্যবসায় মাশুল আদায় করতে চেয়েছে, সকলের সঙ্গেই খিটিমিটি বেধেছে ইংরেজ কাউন্সিলের। যেন এটা ফিরিঙ্গিদের দেশ। যেন নবাব এখানকার মানুষের স্বার্থ না দেখে বিলেতের মানুষের স্বার্থ দেখবে। যেন নিজেদের দেশের মানুষদের উপোস করিয়ে রেখে বিদেশের মানুষকে খাওয়ানোর দায়িত্বটা বেশি বড়।
কিন্তু আসলে স্বার্থের প্রশ্নই নয়। প্রশ্নটা নতুন পৃথিবীর সঙ্গে পুরনো পৃথিবীর বিরোধের প্রশ্ন। একটা সভ্যতা আচার-নিয়ম-নিষ্ঠা-অনুষ্ঠানের শাসনে জর্জর। বিলাস-আরাম-অনাচার আঘাতে মরামরো। আর একটা বিদেশি নতুন সভ্যতা তার সমস্ত জড়তা কাটিয়ে উদার-অভ্যুদয়ের উচ্ছ্বাসে পুরনোকে নির্মূল করে তার জায়গায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবার মানসে পৃথিবীর চারদিকে প্রভুত্ব বিস্তার করতে চায়। নতুনের সঙ্গে পুরনো পারবে কেন? কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ যে সেই নতুনেরই প্রতিনিধি। নবাবের আরাম চাই, নবাবের তোয়াইফ চাই, নবাবের চেহেল-সুতুন চাই, মতিঝিল, হিরাঝিল, মনসুরগদি, বেগম বাঁদি-খোঁজা সব কিছুই চাই। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর যে সভ্যতার ট্রেডমার্ক নিয়ে ক্লাইভ এসেছে, তাদের কাছে নবাবের মসনদের নাম ফিউডালিজম। ক্লাইভের কাছে কলোনিয়ালিজম আরও বড় রাজতন্ত্র। তারা সেই উপনিবেশবাদের মন্ত্র নিয়েই এখানে এসেছে নিজেদের সাম্রাজ্যের প্রসার প্রতিষ্ঠা করতে, তাই তারা ঠান্ডা মাটির ওপরে ঘুমিয়ে কাটাতে পারে, মশার কামড় খেয়েও নিশ্চিন্ত থাকতে পারে, খেতে না পেলেও মুখে হাসি ফোঁটাতে পারে। তারাই যে অষ্টাদশ শতাব্দীর নতুন সভ্যতার ভগীরথ। সে ভগীরথকে যে ঠেকাবে তেমন শক্তি হিন্দুস্থানে কার আছে?
