মারাঠারা নাছোড়বান্দা। বললে–আমাদের চৌথ চাই-ই চাই–চৌথ আমরা ছাড়ব না
সেকথা শুনে বাদশা বলেছিলেন–তোমরা যাও বাংলাদেশে, আলিবর্দিকে উৎখাত করে তোমরা তোমাদের পাওনা উসুল করে নাও–আমার কোনও আপত্তি নেই
এক-একজন ঐতিহাসিকের এক-এক রকম মত। কিন্তু গোলাম হোসেন বলেছেন, আলিবর্দি দিল্লির বাদশার কাছ থেকে পেয়েছিলেন সাতহাজারি মনসবি আর সুজা-উল-মুলক হেসাম-উ-দ্দৌলা উপাধি। আর তার বিনিময়ে নবাব নজরানা পাঠিয়েছিলেন এক কোটি টাকা।
উদ্ধব দাসও লিখেছে। সে কিন্তু এসব টাকাকড়ি লেনদেনের কথা লেখেনি। তার কাছে সবাই সমান। দিল্লির বাদশা থেকে শুরু করে নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা, কর্নেল ক্লাইভ, মিরজাফর, বেগম মেরী বিশ্বাস, কান্ত সরকার, ছোটমশাই সবাই একাকার। সে কারও চাকরও নয়, কারও কাছ থেকে তার উপাধি পাওয়ার লোভও ছিল না। কোনও নবাব কি রাজাকে খুশি করবার জন্যেও সে বেগম মেরী বিশ্বাস’ লেখেনি। তাই তার লেখার মধ্যে ক্লাইভ সাহেবের নিলেও আছে, আবার গুণগানও আছে। তেমনি নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলার নিন্দে-প্রশংসা আছে। উদ্ধব দাস নিজে নিন্দে-প্রশংসার ধার ধারত না বলেই এমন অকাতরে সবকিছু লিখে যেতে পেরেছে সে।
এক জায়গায় এসে কিন্তু থমকে গেছে উদ্ধব দাস।
উদ্ধব দাস লিখেছে তোমরা কেউ নবাবকেও চিনতে পারোনি, ক্লাইভ সাহেবকেও চিনতে পারোনি। আমি তো তোমাদের মতো দূর থেকে দেখিনি ওদের। একেবারে কাছাকাছি ছিলাম, একেবারে ঘেঁষাঘেঁষি। লোকে আমাকে পাগল বলত তাই আমাকে কাছে ঘেঁষতে দিত। ভাবত আমি কিছুই বুঝি না বুঝি।
সত্যিই তো, কান্তই কি বুঝত মরালীর বরের মনের মধ্যে এত কাব্য ছিল। নইলে মরালীর জন্যে অমন করে সবকিছু ভুলে গিয়ে নিজেকে জলাঞ্জলি দিলে। আর মরালীই কি জানত উদ্ধব দাসের বাইরের পাগল চেহারাটার আড়ালে অমন একটা রসিক মন লুকিয়ে আছে। যদি বুঝত তা হলে তো সমস্ত ইতিহাসটাই উলটে যেত। বুঝলে হয়তো শেষপর্যন্ত পলাশির যুদ্ধটাই হত না। যখন বুঝল তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তখন আর শোধরাবার সময় নেই। তখন সব নিশ্চিহ্ন হয়ে নিঃশেষ হয়েছে।
গোবিন্দ মিত্তিরের বাগানবাড়িতে যখন সমস্ত লেখাজোখা সইসাবুদ শেষ হয়েছে তখন হঠাৎ নবাবের ছাউনিতে খবর এল, ত্রিবেণীর ঘাটে নানিবেগম এসে হাজির হয়েছে।
হঠাৎ নানিবেগম সাহেবা এল কেন?
তা জানি না জাঁহাপনা।
কথাটা কান্তর কানেও গেল। কান্তর সমস্ত শরীরে একটা রোমাঞ্চ খেলে গেল। নানিবেগমসাহেবার সঙ্গে আর কেউ এসেছে নাকি? আর কেউ?
এখানে কে তাদের আসতে বললে?
তাও জানি না জাঁহাপনা!
উমিচাঁদ সাহেব আর ওয়াটস্ সাহেব দাঁড়িয়ে ছিল পাশে। কাশিমবাজারের কুঠি নতুন করে খোলা হবে। নবাবের দরবারেও ফিরিঙ্গি কোম্পানির একজন প্রতিনিধি রাখতে হবে। নবাবই বেছে নিয়েছেন। ওয়াটস সাহেবকে। বেশ নাদুসনুদুস চেহারা। তারা নবাবের সঙ্গেই রওনা দেবে রাজধানীর দিকে।
তা তারা যে আসবে তা আগে খবর দাওনি কেন?
আগে খবর মেলেনি জাঁহাপনা!
নবাব মির্জা মহম্মদ যেন অস্বস্তিতে উসখুস করতে লাগলেন। বাংলার নবাব যেন ছেলেমানুষ। দিদিমার সামনে নিজের দৌরাত্ম প্রকাশ করতে লজ্জা হতে লাগল।
সঙ্গে বেগমসাহেবাও আছেন জাঁহাপনা।
আবার বেগমসাহেবা সঙ্গে এসেছেন কেন? কোন বেগমসাহেবা? মিরজাফর আলি, রণজিৎ রায়, ইয়ার লুফৎ খাঁ, ইরাজ খাঁ সবাই অবাক হয়ে গেল। নবাবের ছাউনিতে বেগমসাহেবাদের আসা নতুন নয়। কিন্তু সে তো নবাবের সঙ্গে। এমন করে হুকুম না পেয়ে তো আসার নিয়ম নেই!
কোন বেগমসাহেবা?
মরিয়ম বেগমসাহেবা।
নবাব চুপ করে রইলেন খানিকক্ষণ। তারপর শরবতের পাত্রে চুমুক দিলেন। অনেক ঝড়ঝাপটা গিয়েছে কদিন ধরে। ফিরিঙ্গিদের হাতে বন্দি হতে হতে নবাব বেঁচে গিয়েছেন। তারপর ফিরিঙ্গিদের সবকিছু শর্তে নির্বিকারে দস্তখত দিয়ে লজ্জায় মুখ কলঙ্কিত করে রয়েছেন। ঠিক এই সময় এখানে না এলে হত না?
সবাই উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। খানিক পরেই ছাউনির বাইরে যেন ঘোড়ার খুরের শব্দ হল। ওই ওরা এল নাকি?
কে?
জাঁহাপনা, কর্নেল ক্লাইভ সাহেবের খত নিয়ে ফিরিঙ্গি ঘোড়সওয়ার এসেছে।
নবাব বললেন–ভেতরে নিয়ে এসো
ঘোড়সওয়ার ভেতরে এল না। তার চিঠি নিয়ে এল নবাবের পাহারাদার। সে-চিঠি সে মিরবকশির হাতে দিলো মিরবকশি সে-চিঠি মিরমুনশির হাতে দিলে। মিরমুনশি সে-চিঠি খুলে পড়তে লাগল নবাবকে শুনিয়ে শুনিয়ে
ইয়োর মেজেস্টি, মনসুর-উল-মুলক, সিরাজ-উ-দ্দৌলা শা কুলি খান, হেবাৎ জঙ, আলমগির! আপনার সন্ধির শর্ত অনুযায়ী ইহা জ্ঞাপন করা যাইতেছে, আপনি স্বীকার করিয়াছেন ইংরাজের শত্রু নবাবের শত্রু এবং ইংরাজের বন্ধু নবাবেরও বন্ধু। সম্প্রতি ইয়োরোপ প্রদেশ হইতে ইন্ডিয়ায় সংবাদ আসিয়াছে যে, ফ্রান্সের সহিত ইংলন্ডের যুদ্ধ-ঘোষণা হইয়াছে। সুতরাং এখন হইতে ফ্রান্স আমাদের শত্রু। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ফরাসি-অধিকৃত চন্দননগরও শত্রু অধিকৃত দেশ। চন্দননগরের ফরাসি কোম্পানি আমাদের শত্রুস্থানীয়। আশা করা যায়, সন্ধির শর্ত অনুযায়ী তারা আজ হইতে আপনারও শত্রু বলিয়া গণ্য হইলেন। আমরা আজ ফরাসিদের চন্দননগর আক্রমণ করিতে অগ্রসর হইতেছি আশা করি, আপনি আমাদের সহায় হইবেন।
*
পেরিন সাহেবের বাগানের ভেতরে তখন সার সার সোলজার দাঁড়িয়ে আছে। কর্নেল ক্লাইভের কম্যান্ড পেলেই তারা কুইক-মার্চ করতে শুরু করবে।
