ক্লাইভ বললে–কিন্তু আমি তো পোয়েটকে জানি, পোয়েট তো তা করবার লোক নয়, পোয়েট তো ভেরি গুড ম্যান–
দুর্গা বললে–তা তুমি কি মেয়েমানুষ যে তোমার হাত ধরে সে টানাটানি করবে? তুমি তো বেটাছেলে, তোমার সঙ্গে সে তো ভাল ব্যাভার করবেই বাছা–
ক্লাইভ সাহেব হো হো করে হাসতে লাগল।
দুর্গা বললে–হেসো না বাছা, আমরা মরছি নিজের জ্বালায় আর তুমি দাঁত বার করে হাসছ–
ক্লাইভ বললে–হাসতে যে আমার বড় সাধ দিদি। ছোটবেলা থেকে যে হাসবার সুযোগই পাইনি। কেবল সকলের সঙ্গে ঝগড়া আর মারামারি করেছি, কেউ আমাকে হাসতেই দেখেনি জীবনে, এই শুধু তুমি আজ হাসতে দেখলে–এই তো তোমার সঙ্গে আমি হাসছি, কিন্তু তুমি জানো না কাঁদতে পারলে আমি বেঁচে যাই
ওমা, তোমার আবার কী হল, তুমি তো দিব্যি খাচ্ছদাচ্ছ আর লড়াই করছ
ক্লাইভ সাহেবের মুখখানা যেন হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। হঠাৎ যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল সাহেব। যেন আর চিনতেই পারা গেল না তাকে। আর দাঁড়াল না সাহেব সেখানে। ঘর ছেড়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
দুর্গা হরিচরণকে জিজ্ঞেস করলে তোমার সাহেবের কী হল গো? মুখখানা অমন সাদা হয়ে গেল কেন হঠাৎ?
হরিচরণ বললে–ওরকম হয় মাঝে মাঝে, ও নিয়ে তুমি ভেবো না
তা আমাদের ওপর রাগ করলে নাকি?
হরিচরণ বললে–না, রাগ করবে কেন? মাথার মধ্যে ভাবনা রয়েছে তো, কেবল ভাবছে আর। কেবল ভাবছে–
মদ খেয়েছে বুঝি?
হরিচরণ বললে–না তো, সাহেব তো আর মদ খায় না, তুমি বলার পর থেকে তো সাহেব মদ ছেড়ে দিয়েছে, গোরুর গোস্ত খাওয়াও ছেড়ে দিয়েছে
সেকী?
হ্যাঁ দিদি, আর তা ছাড়া ওসব পাবে কোথায় যে খাবে! এতদিন তো নবাবের ভয়ে কেউ খাবারদাবার কিছু বেচতই না আমাদের, আমরা তো পেট ভরে খেতেও পাইনি
ওমা, তাই নাকি?
হরিচরণ বললো দিদি, তোমাদের কিছুই বলিনি এতদিন তোমরা মনে কষ্ট পাবে বলে
দুর্গা বললে–তা তো আমরা জানতুম না! না বাপু, আমরা তোমাদের ঘাড়ে বসে আর খাব না
হরিচরণ বললে–না দিদি, এখন আর তা নেই, এখন তো নবাবের সঙ্গে মিটমাট হয়ে গেছে, এখন টাকা ছাড়লেই সব মাল পাওয়া যাবে
তা হলে সাহেব তোমার অমন গম্ভীর হয়ে যায় কেন হঠাৎ?
হরিচরণ বললে–সে তোমাকে পরে বলব দিদি, সে অনেক কথা।
দুর্গা বললে–বলো না শুনি—
হরিচরণ বললে–কাউকে বোলো না যেন, কেউ জানে না, সাহেবের মা মারা গেছে
সেকী? কবে?
মাস ছয়েক আগে। মা ছাড়া তো সায়েবের আপনার কেউ ছিল না। বাপ তো না-থাকার মধ্যেই। কেবল মদ গিলেই পড়ে থাকে দিনরাত
তা অশৌচ টশৌচ কিছু হয় না সায়েবদের?
তুমিও যেমন দিদি, ওদের আবার অশৌচ হবে। আর খবর তো এল মারা যাবার দুমাস পরে, তখন মা মরে ভূত হয়ে গেছে
দুর্গার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল–আহা গো
জানো দিদি, সাহেব লুকিয়ে লুকিয়ে এক-একদিন কাঁদে, কেউ টের পায় না, শুধু আমি লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেছি
দুর্গা বললে–কাঁদতে বুঝি সায়েবের লজ্জা করে খুব?
না, লজ্জা করবে কেন? কিন্তু আমাদের কর্নেল তো, সায়েবকে কাঁদতে দেখলে সেপাইদের মন যদি নরম হয়ে যায় তো তারা তো যুদ্ধ করতে পারবে না। সেইজন্যে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে
দুর্গার নাক দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল–আহা গো, এ কী চাকরি বাছা তোমাদের, মায়ের মিত্যুতেও প্রাণভরে কাঁদতে পারবে না–এমন চাকরি না করলেই পারো
হঠাৎ দূর থেকে ডাক এল-হরিচরণ!
হরিচরণ বললে–ওই সাহেব ডাকছে দিদি, আমি আসছি, তোমাদের সব ব্যবস্থা আমি এসে করে দিচ্ছি–
বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল হরিচরণ।
ছোট বউরানি এতক্ষণ আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল। এতক্ষণে কাছে এসে বললে–দুগ্যা, এ তো বড় জ্বালা হল দেখছি–ঘুরে ফিরে সেই আমাদের এখেনেই আসতে হচ্ছে–
দুর্গা বললে–তা কী করবে বলল, আমার কি দেশে ফিরে যেতে অসাধ? কপালের গেরো থাকলে কে খণ্ডাবে?
তা এদের লড়াই তো থেমে গেল, এবার হাতিয়াগড়ে ফিরে যেতে আপত্তি কী? এখন তো রাস্তা ফাঁকা
দুর্গা বললে–রাস্তা না-হয় ফাঁকা, কিন্তু সেই রেজা আলি বেটা তো এখনও হাতিয়াগড়ে ঘাঁটি আগলে বসে আছে। একবার জানতে পারলে কি আর রেহাই দেবে তোমাকে? আর সেই বশির মিঞা, সে-ও তো ওত পেতে আছে
তা নবাব যদি কোনওকালে না মরে তো চিরকাল এমনি করে এখানে পড়ে থাকব?
দুর্গা বললে–তাই তো নবাবের মিত্যু কামনা করছি ছোট বউরানি, দিনরাত মিত্যু কামনা করছি
তা তুই নবাবকে উচাটন করতে পারিস না? নবাবকে বাণ মারতে পারিস না? তা হলে তুই ছাইয়ের মন্তর শিখেছিস
দুর্গা বললেন ছোট বউরানি, এবার দেখছি তাই-ই করতে হবে। এ ফিরিঙ্গিদের দিয়ে কিছু হল না। মায়ের মিত্যুতে যেসব মানুষ কেঁদে ভাসিয়ে দেয় তাকে দিয়ে কিছু হবে না, আমাদের সায়েব দেখছি মেয়েমানুষেরও বেহদ্দ, আমাকে শেষকালে ঝাড়ফুক করতে হবে
*
নাদির শা’র আমলে যে বংশের ইতিহাস শুরু, সেবংশ বড় সাধারণ বংশ নয়। বড় সামান্য অবস্থা থেকে একেবারে বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব। হাজি আহম্মদই শুধু যে সারাফত আলির সর্বনাশ করেছিল তা-ই নয়, ছোট ভাই আলিবর্দি খাঁর প্রসাদেও দিল্লির বাদশার সর্বনাশের অন্ত ছিল না। হলওয়েল সাহেব লিখেছে–মারাঠারা যখন মহম্মদ শার কাছে চৌথের দাবি করেছিল তখন বাদশা বলেছিলেন–নবাব আলিবর্দি খাঁ খাজনা পাঠায়নি, আমি চৌথ দেব কী করে?
