আর একজন এককোণে এতক্ষণ শুয়ে ছিল। সে চেঁচিয়ে উঠল–চোর-ছ্যাঁচড় বলছ কাকে শুনি, আমি চোর–?
তুমি চুপ করো তো হে, তুমি তো বলরামভজার লোক—
লোকটা আউলচাঁদের দলের। চিৎকার করে ঘুষি বাগিয়ে লাফিয়ে আসে–তবে রে শালা–
তারপর সেই অতিথিশালার মধ্যে যে কাণ্ড শুরু হয় তাতে সকলের জড়ো হবার পালা। হাতাহাতি মারামারি পর্যন্ত গিয়ে ওঠে। কর্তাভজার সঙ্গে বলরামভজার, আউলচাঁদের সঙ্গে সাহেবধনীর ঝগড়া। তখন সকলের ভেতরের মানুষটা বেরিয়ে আসে। এমনিতে কেউ কারও ছোঁয়া খায় না, ছায়া মাড়ায় না। কিন্তু মারামারি হলে তখন আর জ্ঞানগম্যি থাকে না কারও। তখন জগা খাজাঞ্চিবাবু পর্যন্ত দৌড়ে আসে। বলে–বেরোও এখান থেকে, বেরোও–
একজন বলে আমি কেন বেরোব, আমি কি জাত ভাঁড়িয়ে বোষ্টম? ও আগে চাড়াল ছিল তা জানেন খাজাঞ্চিবাবু? ওর মেসো এখনও ঢাকায় শ্মশানঘাটে মড়া পোড়ায়–
আর তুই বুঝি ভাল জাত? তুই যে পোদ! পোদ থেকে হইছিস কর্তাভজা? পোদের জল চলে? বলুন তো খাজাঞ্চিবাবু, পোদের জল চলে?
যেদিন উদ্ধব দাস থাকে, সেদিন সবাই তাকে সাক্ষী মানে। বলে–তুমি বলো তো বাবা, তুমি বলো তো, পোদ কি ছোট জাত?
তা চাঁড়ালের থেকে তো ছোট বটে! বলো না উদ্ধব দাস, বলো না—
উদ্ধব দাস শুধু হাসে। অনেক পীড়াপীড়ি করলে বলে–আমার এখন খিদে পেয়েছে ভাই, এখন ঝগড়া করবার ক্ষেমতা নেই তোমরা ঝগড়া করো আমি শুনি–
তারপর হঠাৎ গান গেয়ে ওঠে–
হরি কে বুঝে তোমার লীলে।
ভাল প্রেম করিলে।
হইয়ে ভূপতি, কুবুজা যুবতী পাইয়ে শ্রীপতি,
শ্ৰীমতী রাধারে রহিলে ভুলে।
শ্যাম সেজেছ হে বেশ, ওহে হৃষীকেশ,
রাখালের বেশ এখন কোথা লুকালে।
মাতুল বধিলে প্রতুল করিলে।
গোপ-গোপীকুলে, অকূলে ভাসায়ে দিলে ।।
উদ্ধব দাস গান গাইলে সবার ঝগড়া থেমে যায়। উদ্ধব দাসের গানের আদর সর্বত্র। ওই গানের জন্যেই তার খাতির। একটা যন্ত্র নেই, ডুগি-তবলা নেই, একতারাও নেই। শুধু-গলায় গান গায় উদ্ধব দাস। উদ্ধব দাস বামুনও নয়, চাঁড়ালও নয়, পোদও নয়। উদ্ধব দাস বলে আমি কর্তাভজা-বলরামভজা আউল-বাউল-সাহেবধনী কিছুই নই গো
তা হলে তুমি কী?
আজ্ঞে আমি উদ্ধব দাস। হরির দাস–
শুধুই উদ্ধব দাস! অতিথশালায় এলে কেউ জিজ্ঞেস করলেই ওই নামটা শুধু বলে। কোত্থেকে আসছ, কোথায় যাবে, তারও উত্তর নেই। কোথায় যাব তা কি কেউ বলতে পারে ঠাকুর? আজকে এখানে এসেছি, কাল বাঁচব কি না কে বলতে পারে?
এই অতিথিশালাতেই হরিপদর সঙ্গে ভাব হয়ে গিয়েছিল উদ্ধব দাসের। উদ্ধব দাসের না আছে। কোনও শখ, না আছে কোনও বিকার। যা দাও তাই খাবে। দুটি খেতে পেলে আর কিছু চায় না। এইখানেই হরিপদ প্রথম দিন এসে ধরেছিল উদ্ধব দাসকে।
বলেছিল–তুমি কে গো?
আমি উদ্ধব দাস।
হরিপদ বলেছিল–শুধু উদ্ধব দাস বললে–চলবে না, তোমার বাড়ি কোথায়, তুমি কী করো–
উদ্ধব দাস রেগে গিয়ে বলেছিল–এই দেখো, তুমি তো আমাকে জ্বালালে হে! যখন যেখানে থাকি। সেই-ই আমার বাড়ি, সেই আমার ঘর।
কী করো তুমি?
দুনিয়াতে কে কী করে শুনি? করনেওয়ালা তো মাথার ওপর। সে যা করাচ্ছে তাই সবাই করছি। আকবর বাদশা যা করে গেছে, তোমার ছোটমশাই যা করছে, আমিও তাই করছি–খাচ্ছি দাচ্ছি আর ভ্যারেন্ডা ভাজছি–
সেই থেকেই হরিপদ মজা করত উদ্ধব দাসকে নিয়ে। অতিথিশালায় যারা আসে তাদের মতো জ্বালাতন করে না হরিপদকে। দাও খাব, না-দাও খাব না। খুশি হয়ে একখানা গান শুনিয়েছিল উদ্ধব দাস। তার পরদিনই হরিপদ এসে বললে–দাসমশাই, তোমাকে চুপি চুপি একটা কথা বলব, সেই গানটা একবার গাইতে হবে–
কী গান?
ওই যে কালকে গেয়েছিলে? আমাদের দুগগা তোমার গানটা শুনতে চেয়েছে!
দুগগা? দুগগা কে গো? মা-দুগগা?
আরে দুর, আমাদের দূগগা। আমাদের বড়রানির পেয়ারের ঝি।
দুগগার কথা সেই প্রথম শুনল উদ্ধব দাস। দুগগা হল রাজবাড়ির পাট-ঝি। দুগগা না হলে কোনও কাজই হবে না অন্দরমহলে। বড়রানির বিয়ের সময় বাপের বাড়ির থেকে নতুন বউয়ের সঙ্গে সঙ্গে এসেছিল। তারপর ছোটমশাই আবার একটা বিয়ে করেছে, কিন্তু সেই ছোটরানিও দুগার হাতের মুঠোর মধ্যে।
উদ্ধব দাস বললে–তা সেটা যে রসের গান গো হরিপদ, সে গান মেয়েছেলে শুনবে?
হরিপদ চোখ মটকে বলেছিল রসের গান বলেই তো শুনবে। তুমি তো জানোনা দাসমশাই, দুগগার বড় রস–
কী রকম?
হ্যাঁ, যা বলছি তাই। ওই রসেই তো একেবারে মজিয়ে দিয়েছে রানিদের। তুমি বিয়েথা করোনি। ওসব বুঝবে না–
তা সেইদিন দুপুরবেলাই ব্যবস্থা হয়েছিল গানের। কেউ ছিল না তখন। রান্নাশালার বামুনঠাকুর কাজকর্ম সেরে বাইরে গিয়েছে। বেশ করে কড়াইয়ের ডাল দিয়ে ভাত মেখে পেট ভরে খেয়ে একটু তন্দ্রা মতন এসেছিল, এমন সময় হরিপদ এসে ঠেলা মারলে। বললে–ওঠো দাসমশাই চলো–
কোথায় গো?
চলো, দেরি কোরো না, ছোটরানি গান শুনবে বলে বসে আছে দরদালানে–
উদ্ধব দাস এমনিতে উদাসী মানুষ কিন্তু কথাটা শুনে ভয় পেয়ে গেল। রসের গান শুনে যদি ছোটমশাই রাগ করে। রসের গান কি যাকে-তাকে শোনানো যায়। রসিক ছাড়া কি রস বোঝে কেউ?
হরিপদ বললে–আরে, রসের গান শুনতেই তো ছোটরানি চায়, ওই তোমার ভক্তিরসের গান নয়, ছোটরানির কাঁচা বয়েস এখন, রস করবে না তো কি হরিনামের মালা জপবে?
