মাদ্রাজের গভর্নর ডেসপ্যাঁচ পাঠিয়েছে ক্যালকাটার সিলেক্ট কমিটিকে যেন এখুনি চন্দননগর অ্যাটাক করা হয়।
ডেসপ্যাচটা পেয়ে পর্যন্ত সারারাত কর্নেল ক্লাইভ ঘরের মধ্যে পায়চারি করেছে। অ্যাডমিরাল ওয়াটসনকে ঠিক এই কথাই বলেছিল সন্ধেবেলা।
কিন্তু নবাবের সঙ্গে যে আমরা টুস করেছি?নবাব যদি সে-টুস না ভাঙে তো আমরা সে-টুস কী করে ভায়োলেট করতে পারি?
ক্লাইভ বলেছিল–পারি। লাভ আর ওয়ারের ব্যাপারে কোনও নিয়ম কেউ কখনও মানেনি, আমরাও মানব না
কিন্তু এই ইন্ডিয়াতে ফ্রেঞ্চরা যে নবাবের ফ্রেন্ড!
ক্লাইভ বলেছিল–এখন আর তারা নবাবের বন্ধু নয়। ফ্রেঞ্চরা এখন আমাদের শত্রু, সুতরাং নবাবেরও শত্রু!
তা হলে নবাবকে সেকথা জানিয়ে আগে চিঠি লেখো–তারপরে চন্দননগর অ্যাটাক করো!
ক্লাইভ বলেছিল–ঠিক আছে, আমি নবাবকে লেটার লিখব
বলে দু’জনে দু’দিকে চলে গিয়েছিল। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন হয়তো ফোর্টের ভেতর গিয়ে আরামে নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়েছিল, কিন্তু ক্লাইভের ঘুম নেই। ঘরের মধ্যে একবার বিছানায় শুয়েছে, আবার উঠে পায়চারি করেছে।
তারপর যখন ভোর হয়েছে, তখনই হরিচরণের ডাক।
দুর্গাকে দেখে সাহেবের মুখে হাসি বেরোল। পাশেই ঘোমটা দেওয়া সেই ম্যারেড লেডি!
কী বাবা, আমাদের কিছু হিল্লে করতে পারবে তুমি? এখন তো তোমাদের লড়াই থেমে গেছে।
হরিচরণ বললে–আমরা সেই ত্রিবেণী পর্যন্ত গিয়েছিলুম হুজুর
ত্রিবেণী? তা অত দূর পর্যন্ত গিয়েছিলে তো আবার ফিরে এলে কেন? তোমাদের হাতিয়াগড়ে ফিরে যেতে পারলে না?
দুর্গা বললে–ফিরব কী করে? সেখানে দেখি, সেই বাউন্ডুলে লোকটা একটা বজরার ওপর বসে বসে গান গাইছে
কার কথা বলছ? আমাদের সেই পোয়েট? সে তো তোমরা চলে যাবার পরেই আবার এই ক্যাম্পে এসেছিল।
এখানেও এসেছিল? মরবার আর জায়গা পেলে না মিনসে? আবার এখেনে এসেছিল কী করতে? মরতে?
সায়েব বললে–সে একজন জেন্টলম্যানকে নিয়ে এসেছিল এখানে। তোমরা নেই শুনে চলে গেল
তা মিনসেকে তুমি কেন ঢুকতে দিলে বাবা এখেনে?
ক্লাইভ বললে–পোয়েটকে আমার বড় ভাল লাগে দিদি
তা ভাল লাগে ততো ভাল লাগুক, তা বলে তোমার বাড়ির মধ্যে ঢুকতে দাও কেন?
ক্লাইভ বললে–তা তোমার মেয়েরই তো হাজব্যান্ড সে? তাকে আমি তাড়িয়ে দিতে পারি?
হ্যাঁ বাবা তাড়িয়ে দিয়ে, আমি বলছি, তাড়িয়ে দিয়ো, অমন জামাইয়ের মুখে ঝাটা মারি আমি! তুমি যদি তাকে ধরে রাখতে বাবা তো আমি তোমার সামনে তার মুখে সাত ঝাটা মেরে বিদায় করতাম
ক্লাইভ হাসল। অদ্ভুত এই ইন্ডিয়ার মানুষরা। নিজের জামাইকে এরা বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় অপমান করে। অথচ জামাই কিছু বলতে পারে না। মুখ বুজে চলে যায়। ক্লাইভ ম্যাড্রাসে এদের কথা শুনেছিল। অথচ এই বেঙ্গলেই হাজব্যান্ডের চিতায় উঠে ওয়াইফরা নাকি পুড়ে মরে। এরা এত ফেথফুল, আবার এত জুয়েল। কী অদ্ভুত মানুষ এই বেঙ্গলি লেডিরা।
আবার থাকবার ব্যবস্থা হয়েছিল দু’জনের। ঘরের মধ্যে পৌঁছিয়ে দিয়ে ক্লাইভ বললে–তোমাদের এখানে হয়তো খুব কষ্ট হবে দিদি
দুর্গা বললে–তা কষ্ট তো হবেই সায়েব, আমাদের কপালে কষ্ট থাকলে কে খণ্ডাবে বলো? নইলে নিজের ঘরদোর থাকতে আমরা ম্লেচ্ছদের হাতে পড়ি?
ক্লাইভ হাসতে লাগল–আমরা বুঝি এখনও আনটাচেবল দিদি? এতদিন যে আমার এখানে থাকলে তোমরা, তোমাদের জাত চলে যাবে তো!
ওমা, কী বলছ তুমি সায়েব? জাত যাবে না? আমাদের জাতের আছেটা কী শুনি? জাত তো তুমি আমাদের মেরে দিয়েই বসে আছ
তা হলে কী হবে?
কী আর হবে! প্রায়শ্চিত্তির করতে হবে। সাধ করে কি তোমার এখানে আসতে চাইনি আমরা! আমরা হরিচরণকে পইপই করে বললাম, আমাদের অন্য কোথাও নিয়ে চলল! তা ও-ও হয়েছে তোমার মতো
সাহেব দুর্গার কথা বুঝতে পারলে না। হরিচরণকে জিজ্ঞেস করলে প্রায়শ্চিত্তির মানে কী?
হরিচরণ বুঝিয়ে দিলে। ব্রাহ্মণদের ডেকে খাওয়াতে হবে, ভুরিভোজন করাতে হবে। অনেক টাকা দক্ষিণে দিতে হবে। গোবর খেতে হবে।
গোবর? তার মানে?
হরিচরণ গোবর কথাটা বুঝিয়ে দিতেই সাহেব বললে–ও, ইউ মিন কাউ ডাং? দ্যাট ইজ গোবর? কেন? গোবর খেতে হবে কেন?
আজ্ঞে, তা তো খেতেই হবে। গোবর খেলে সব পাপ ধুয়ে মুছে পবিত্র হয়ে যাবে!
ক্লাইভ বললে–তা হলে তুমি? তুমি গোবর খাবে না?
আজ্ঞে, আমি তো সেপাইদের দলে নাম লিখিয়েছি, আমার আত্মীয়স্বজনেরা জানে, আমার জাত চলে গিয়েছে।
তা তুমি যে দেশে টাকা পাঠাও তোমার বাড়িতে, সে-টাকা তারা নেয়?
হরিচরণ বললে–সে-টাকা তারা কি অমনি নেয়, গঙ্গাজলে ধুয়ে তবে সিন্দুকে তোলে
ক্লাইভ হাসতে লাগল।
দুর্গা বললে–আর যদি কখনও এখানে আসে সে-মিনসে তো তাকে ঢুকতে দিয়ো না বাবা, তা তোমায় বলে রাখছি–
কী করেছে তোমার জামাই, বলো তো দিদি?
দুর্গা বললে–করবে আবার কী, সে আমার জামাই নয়
কিন্তু সে যে বলেছিল, তার ওয়াইফের নাম মরালী
তা মরালী কি আর কারও নাম হতে নেই? এই যে তোমার নাম ক্লাইভ, ওনামে কি আর কেউ নেই তোমাদের দেশে? একলাই তুমি একেশ্বর হয়ে জন্মেছ?
সত্যি বলছ?
দুর্গা বললে–তা সত্যি বলছি না তো কি মিথ্যে কথা বলব তোমার সঙ্গে?
ক্লাইভ বললে–তা হলে ত্রিবেণীতে তাকে দেখে তোমাদের অত ভয় হয়ে গেল কেন?
তা রাস্তাঘাটে বাউন্ডুলে মিনসে দেখে ভয় হবে না? তুমি নেই, যদি অপমান করে, হেনস্থা করে, যদি মেয়ের হাত ধরে টানাটানি করে?
