তারপর একটু থেমে বলত–এই যে তোমাদের বেগম মেরী বিশ্বাস, এও জানে! যেদিন শুনলুম নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা খুন হয়েছে, সেদিন আমি কেঁদেছি, হ্যাঁ, তোমাদের হিস্টোরিয়ানরা হয়তো। বিশ্বাস করবে না পোয়েট, কিন্তু বিলিভ মি, বিশ্বাস করো, আই হ্যাভ শেড টিয়ার্স, আমি রিয়্যালি কেঁদেছি, কিন্তু সে কান্না আমার কেউ দেখেনি, আমাদের চোখের জল দেখাতে নেই, আমি ওয়ারিয়র, আমার কাঁদতে নেই, আমার কাদা ক্রাইম, আমাদের ডিউটি শুধু ডু অর ডাই
বলে রবার্ট ক্লাইভ শুধু গড়গড় করে গড়গড়ার নলটা টানত আর পেট-ভরতি ধোঁয়া ছাড়ত।
যখন রাত অনেক হত, দমদমার বাগানবাড়ির বাইরের আলোগুলো যখন একে একে নিভে আসত, তখন উদ্ধব দাস উঠত। বলত আমি আসি সায়েব।
সেকালে অনেকে দেখেছে সেই উদ্ধব দাসকে। তখন মিরজাফর খাঁ’র রাজত্ব। আরও অরাজক, আরও ভয়ানক সেকাল। রাস্তায় ডাকাতের ভয়। একলা একলা পথে বেরোয় না কেউ। বেরোলে দল বেঁধে বেরোয়। বিশেষ করে রাত্তিরবেলা। কিন্তু তখন ব্রিটিশ রাজত্বের সবে গোড়াপত্তন হতে শুরু করেছে। সেই যুগে উদ্ধব দাস একা একা রাস্তায় চলত। পায়ে তখন খড়ম উঠেছে, গায়ে চাদর, হাতে একটা তুলোট কাগজের পুঁথি। লোকে উদ্ধব দাসকে কিছু বলত না। জানত বুড়ো নিরীহ কবি, কাব্য লিখছে ভারতচন্দ্রের মতো। তখন লেখা শেষও হয়নি। তবু লোকে পুঁথির নাম জানত। বলত বেগম মেরী বিশ্বাস কাব্য।
আর আসলে কান্তই বা তখন কোথায়? ইতিহাসের জঞ্জালের সঙ্গে নিজামতের চর কান্ত সরকারও কখন আর সকলের সঙ্গে তলিয়েই গিয়েছিল। নানিবেগম, ঘসেটি বেগম, ময়মানা বেগম, গুলসন বেগম, তক্কি বেগম, বব্বু বেগম, সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ, বশির মিঞা, মেহেদি নেসার, সফিউল্লা খাঁ, ইয়ারজান, ছোটমশাই, সবাইয়ের সঙ্গে কান্ত সরকারও বিস্মৃতির তলায় তলিয়ে গিয়েছে। তার কথা আর কারও মনে নেই। এই এতদিন পরে বেগম মেরী বিশ্বাস’ পুঁথি আবিষ্কার না হলে হয়তো চিরকালের মতোই সে তলিয়ে যেত। কিন্তু দুশো বছর পরে যে আবার তার নামটা ছাপার অক্ষরে উঠল এ-ও ওই উদ্ধব দাসের জন্যে! উদ্ধব দাস লিখে গেছে…।
কিন্তু সেকথা এখন থাক। উদ্ধব দাসের কথা বলার অনেক সময় পরে পাব। আগে সেইদিনকার সেই পেরিন সাহেবের বাগানের ঘটনাটা বলি।
ভোরবেলা তখনও কেউ জাগেনি। কিন্তু রবার্ট ক্লাইভের তখন অনেক কাজ। অনেক ভাবনা। শুধু নবাবের সঙ্গে ফয়সালা হলেই যে সব সমস্যার সুরাহা হয়ে গেল এমনই আশা আর যারই থাক, রবার্ট ক্লাইভের ছিল না।
ক্লাইভ অ্যাডমিরাল ওয়াটসনকে বলেছিল–একটা এনিমি গেল, এবার অন্য এনিমিটার শেষ করে দিতে হবে
সমস্ত বেঙ্গলে যদি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ব্যাবসা করে যেতে হয় তা হলে এখানে ফ্রেঞ্চদের বাড়তে দিলে চলবে না। আজ যদি সাউথ থেকে জেনারেল বুশি এসে পৌঁছোত তো এমন করে সন্ধিপত্রে সই করত না নবাব।
কাগজের ওপর নিজের দস্তখত করতে নবাবের বড় কষ্ট হচ্ছিল। যেন হাতের আঙুলগুলো কঁপছিল। জেনারেল বুশি এসে পৌঁছোল না। নবাব যেন বড় একলা। বড় নিঃসহায়। তাকে নিঃসহায় পেয়ে যেন তাকে দিয়ে এরা দাসখতই লিখিয়ে নিচ্ছে।
বাইরে এসে ক্লাইভ বললে–এবার চন্দননগর
প্রথমে অ্যাডমিরাল বুঝতে পারেনি। জিজ্ঞেস করেছিল–হোয়াই? কেন?
তুমি বুঝতে পারছ না, আজ যদি জেনারেল বুশি এসে পড়ত তো আজ কি এই ভিকট্রি হত? যতদিন চন্দননগরে ফ্রেঞ্চ পাওয়ার থাকবে ততদিন এখানে আমাদের কোম্পানির কোনও আশা নেই–
হাউ ডু ইউ নো?
ক্লাইভ বললে–আই নো। আমি জানি। ফ্রেঞ্চদের সম্বন্ধে আমার চেয়ে তুমি বেশি জানোনা ওয়াটসন, দে আর স্কাউড্রেলস–তারা চায় ইন্ডিয়া থেকে হটিয়ে দিয়ে নিজেরা বিজনেস করবে। আর বিজনেস মানেই রুল করবে ওভার ইন্ডিয়া! একটা কান্ট্রির দু’জন মাস্টার থাকতে পারে না
হোয়াট ইউ মিন?
আই মিন হোয়াট আই সে! আমি বেঙ্গলের ফ্রেঞ্চ টেরিটোরি অ্যাটাক করব
তুমি কি পাগল হয়েছ? এখুনি তো তুমি টুস-টার্মস-এ সিগনেচার করে এলে? তাতে লেখা রয়েছে নেটিভ বা ইউরোপের যে-কেউ নবাবের ফ্রেন্ড সে ইংরেজদেরও ফ্রেন্ড, যে নবাবের এনিমি সে ইংরেজদেরও এনিমি–
ক্লাইভ ঘোড়াটার লাগাম ধরে টান দিলে একটা।
সেদিন রবার্ট ক্লাইভ অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের কথার উত্তর দিতে পারেনি। সেদিন রাস্তায় চলতে চলতে কেবল মনে হয়েছে, কীসের সন্ধি, কীসের মিটমাট, কীসের ফয়সালা। লাইফ-ই কি টুস মেনে চলে? লাইফের সঙ্গেই তো অনেকবার সন্ধি করতে চেয়েছে রবার্ট ক্লাইভ। অনেকবার। কতবার ভেবেছে, আবার ইংলন্ডে ফিরে যাবে। ইংলন্ডে ফিরে গিয়ে পার্লামেন্টের মেম্বর হবে। দেশে ফিরেও তো গিয়েছিল একবার। বিয়ে করে সংসার পাতবে একদিন। আর দশজন যেমন করে সংসারী হয়ে ইংলন্ডের সিটিজেন হয়ে বাস করছে, তেমনি করে সে-ও সিভিল লিস্টের খাতায় নাম লিখিয়ে ভদ্রলোক হবে। কিন্তু তা পেরেছে কি? কেন পারে না তা? লাইফের সব সন্ধি কেন ওলটপালট হয়ে যায়? লাইফের সব হিসেব কেন গোলমাল হয়ে যায়?
সেই অবস্থাতেই রাত্রে বাড়িতে এসে ভেবেছে কেবল। তারপর হঠাৎ অনেক রাত্রে ক্যাম্পে খবর এসেছে, ইউরোপে ফ্রান্সের সঙ্গে ওয়ার বেধে গেছে ইংলন্ডের। ওয়ার। ওয়ার।
খবরটা পেয়েই বিছানার ওপর উঠে বসেছে ক্লাইভ।
