আচারো বিনয়ো বিদ্যা প্রতিষ্ঠা তীর্থদর্শনম।
নিষ্ঠাবৃত্তিস্তপো দানং নবধা কুললক্ষণম ॥
কিন্তু ক্লাইভ সাহেব ঘুমোবার জন্যে ইন্ডিয়ায় আসেনি। আওয়াজ কানে যেতেই চেঁচিয়ে উঠেছে। কে?
আমি হরিচরণ, সাহেব!
তাড়াতাড়ি দরজা খুলেই হরিচরণকে দেখে অবাক হয়ে গেল।
তুমি? ওরা কোথায়?
আজ্ঞে, ওঁরাও এসেছেন। খবর পেলাম লড়াই থেমে গেছে, তাই আবার ওঁদের নিয়ে এখানেই ফিরে এলাম
পেরিন সাহেবের বাগানের তখন একেবারে অন্য চেহারা। সেই বড় বড় দেবদারু গাছগুলোর পাতা আগুনের ঝলসানি লেগে শুকিয়ে গেছে। নবাবের কামানের যে-গোলাটা এসে বাগানের কাছাকাছি পড়েছিল সেখানে সেটা একটা বিরাট গর্ত তৈরি করে দিয়েছে। কোথায় হালসিবাগানের উমিচাঁদের বাগান, সেখান থেকে ফৌজের গোলন্দাজরা গোলা ছুঁড়েছিল এখানে। তারপর যে কাণ্ডটা ঘটল তা যেমন আকস্মিক তেমনই ভয়াবহ। রাত পোয়াল কোনওরকমে, কিন্তু যখন ভোর হল তখন চারদিকে আর কিছু দেখা যায় না। কেবল সাদা ধবধবে কুয়াশা আর কুয়াশা। ভিজে সঁতসেঁতে জমির ওপর থেকে আকাশের মাথা পর্যন্ত সবকিছু কুয়াশায় ঢাকা।
যখন কুয়াশা কাটল তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে।
কিন্তু চোখ চাইতেই দেখা গেল নবাবের ছাউনির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ফিরিঙ্গি ফৌজ। তখন আর ফিরে আসা যায় না। ক্লাইভ তখন পাগলের মতন হয়ে গিয়েছে। সেখান থেকে আর ফেরবার উপায় নেই। তাড়াতাড়ি সকলকে চমকে দিয়ে অর্ডার দিলে ব্যাটালিয়ান, ফায়ার
কিন্তু যাকে ধরবার জন্যে এত আয়োজন, সেই নবাব তার আগেই হালসিবাগান ছেড়ে পালিয়েছে।
নবাবের সঙ্গের লোকজন তখন ধরে বসেছে–এখান থেকে সরে যেতেই হবে–
সমস্ত ঘটনাটা কান্ত নিজের চোখে দেখলে। কেউ যুদ্ধ করতে চায় না। শুধু শশী প্রাণপণে লড়ছিল। যখন পালিয়ে গিয়ে আবার ছাউনি গেড়েছিল দক্ষিণের জলাজমির পাশে, তখনও শশীর দুঃখ যায়নি।
যুদ্ধটা মিটে যেতে তারই বড় কষ্ট হয়েছিল।
বললে–তা হলে কী হবে ভাই কান্তবাবু, নবাব কেন মিটমাট করে নিলে?
যেন কান্ত মালিক। সেই কবে একদিন বেভারিজ সাহেবের গদিতে চাকরিতে ঢুকেছিল, তারপর নিজামতের চরের চাকরি থেকে কেমন করে এই নবাবের খিদমদগারের চাকরিতে ঢুকে পড়েছে! কে তার ভাগ্যকে নিয়ে এমন করে ঘুরিয়ে বেড়াচ্ছে?
আমরা কি লড়াই করতে পারি না? আমাদের গায়ে কি জোর নেই ভাই? তুমিই বলো।
কান্ত বললে–নবাব যা ভাল বুঝেছে তাই করেছে, তুমি আমি তার বিচার করব?
তা তুমি নবাবকে বুঝিয়ে বলতে পারো না? আর তুমি না বুঝিয়ে বলতে পারো, আর কেউ নেই? আমাদের ফেীজ আর ওদের ফৌজ? ওরা তো পেট ভরে খেতেই পাচ্ছে না
খেতে পাচ্ছে না?
আরে না। আমাদের চরেরা খবর এনেছে যে! আর দুটো দিন যদি চেপে থাকতে পারত তো ওরা সুড়সুড় করে পগার পার হয়ে যেত।
তুমি ঠিক জানো?
শশী বললে–আরে হ্যাঁ, আমাদের বকশিসাহেব জানে সব। ফিরিঙ্গিদের গোস্ত না হলে তো চলে, ওরা আজ পনেরো দিন গোস্ত খেতে পায়নি
কী করে তা হলে চালিয়েছে?
শুধু নুন দিয়ে ভাত খেয়েছে বেটারা! ওদের রসদও ফুরিয়ে গিয়েছে, টাকাও ফুরিয়ে গিয়েছে—
কান্ত অবাক হয়ে গেল কথাগুলো শুনে। তবে কেন নবাব এমন কাজ করতে গেল।
শশী বললে–আর আমরা তো লড়াইতে জিতেই গিয়েছিলুম ভাই
সত্যিই নবাবের ফৌজ জিতেই গিয়েছিল। কুয়াশাটা কেটে যেতেই যেন একেবারে হাজার হাজার কামানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়েছিল ক্লাইভের সেপাইরা। তখন এগোবারও উপায় নেই, পেছোবারও উপায় চলে গিয়েছে।
ক্লাইভ সাহেব সে-গল্প করেছে উদ্ধব দাসের কাছে। সে অনেক পরের কথা। তখন নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা মারা গেছে, মুর্শিদাবাদের মসনদেরও হাতবদল হয়েছে। উদ্ধব দাস গল্প শুনত, বেগম মেরী বিশ্বাস গল্প শুনত। আর শুনত ক্লাইভ সাহেবের খানসামা চাপরাশিরা।
ক্লাইভ বলত–তুমি লাক মানো পোয়েট? ভাগ্য? ভাগ্যলিপি?
উদ্ধব দাস বলত–না সায়েব, আমি হরি ছাড়া কাউকেই মানি না
ক্লাইভ বলত–ড্যাম ইয়োর হরি। আমি গড মানি না, আমি মানি শুধু লাক, আমি মানি শুধু চান্স। আর মানি কেবল এইটেকে–
বলে নিজের বন্দুকটা তুলে ধরে দেখাত।
বলত–এই বন্দুকটা দেখছ তো, এইটে আমাকে ক্লার্ক থেকে কম্যান্ডার করেছে, আবার হয়তো একদিন কম্যান্ডার থেকে ক্লার্ক করে দেবে! আই বিলিভ ইন হিম। হি ইজ মাই গ্রেটেট ফ্রেন্ড এ-ই আমার সবচেয়ে বিশ্বাসী বন্ধু
তারপর একটু থেমে আবার বলত-পলাশির লড়াইতে আমার যে ক্ষতি না হয়েছে, সেদিনের সেই মারহাট্টা ডিচের যুদ্ধে তার বেশি ক্ষতি হয়েছিল। সেদিন আমার সাতান্নজন ব্রিটিশ সোলজার মারা গিয়েছিল আর একশো সাঁইত্রিশজন উল্ডেড হয়েছিল–তা ছাড়া দুটো কামান আমার হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। আমি ভেবেছিলুম এবার আমার লাস্ট চান্স। আমি শেষ হয়ে গিয়েছি। কিন্তু এই বন্দুকটাই আমাকে সাহস দিলে–আই ফট, অ্যান্ড আই ফট টু দি লাস্ট!
তারপর?
তারপর? তার পরের কথা হয়তো আমার কান্ট্রিম্যানরাও ভুলে যাবে, তোমরাও ভুলে যাবে। আমি জানি আমি মারা যাবার পর আমার দেশের লোকরা আমাকে গালাগালি দেবে, তোমাদের হিস্টোরিয়ানরাও আমার নামে ব্ল্যাকম্পট দেবে। তারা বলবে আমি গুন্ডা, আমি ডাকাত, আমি তোমাদের নবাবকে খুন করেছি, আমি তোমাদের দেশ কনকার করেছি, কিন্তু বিলিভ মি, আজ যে আমি তোমাদের ভালবেসেছি, তার কারণ, আই লাভ ইউ, আমি নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলাকে ঘৃণা করিনি, তার এগেনস্টে আমার কোনও গ্রাজ ছিল না। আমার ঘৃণা ছিল আমার নিজের ওপর, আমার গ্রাজ ছিল আমার নিজের ওপর। কেন আমি কিছু করতে পারিনা, কেন আমাকে সবাই ওয়ালেস মনে করে, কেন আমার নিজের ফাদার আমাকে হেট করে, কেন আমাকে কেউ ভালবাসে না! আমাকে জীবনে কেউ ভালবাসেনি পোয়েট, নোবডি লাভড মি, আমি একলা, আই অ্যাম অ্যালোন ইন দিস ওয়ার্ল্ড; সেই জন্যেই তোমাদের নবাবকে খুন করে আমি আমার লোনলিনেসের প্রতিশোধ নিয়েছি। তাই তোমাদের কাস্ট্রিকে কনকার করে আমি সকলের তাচ্ছিল্যের রিভেঞ্জ নিয়েছি
