না, আমি এখন হালসিবাগানে যাচ্ছি, আমার সময় নেই। যদি আমি কখনও তোমাকে ডেকে পাঠাই তুমি আমার সঙ্গে দেখা করবে?
কেন করব না মাঠাকরুন? আমি এমন কী একটা পির-পয়গম্বর মানুষ। অধীনকে যখনই ডাকবেন, তখনই…
হঠাৎ নানিবেগম এসে হাজির।
ওরে মেয়ে, ওদিকে যে সব্বনাশ হয়েছে রে, মির্জা লড়াইতে হেরে গিয়ে ফিরে আসছে।
মরালী বললে–কী বলছ নানিজি?
তারপর উদ্ধব দাসের দিকে চেয়ে বললে–তুমি এখন যাও, পরে তোমাকে ডাকব–
উদ্ধব দাস বললে–তা তো যাচ্ছি মাঠাকরুন, কিন্তু বাবুমশাইকে গিয়ে কী বলব বনে যান? বাবুমশাই যদি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান তো আপনি দেখা করবেন তো?
কী করে দেখা করব?
যেমন করে আমার সঙ্গে দেখা করবেন বলেছেন, তেমনি করে দেখা করবেন!
তোমার কথা আলাদা।
উদ্ধব দাস বললে–কেন মাঠাকরুন, আমি কেন আলাদা হতে যাব? আপনার নিজের স্বামীর সঙ্গে দেখা করবেন, আপনার অনিচ্ছ কীসের? আপনার স্বামীর চেয়ে কি আমি আপন হলাম মাঠাকরুন!
মরিয়ম বেগম বললে–দেখো, আমার এখন অত কথা বলবার সময় নেই, তুমি কোথায় থাকো। বলো, আমি তোমায় খবর পাঠাব–
তবেই হয়েছে। আমার কি আর থাকার ঠিক আছে মাঠাকরুন।
নানিজি বললে–তোর কথা দেখছি আর শেষ হবে না, চল!
মন্দিরের ওপাশে তখন আরও লোকজনের আনাগোনার শব্দ হচ্ছে। কুয়াশা নেমে গিয়ে দিন হয়েছে। নবাবগঞ্জের ডিহিদার এসেছে নতুন খবর নিয়ে। হালসিবাগান থেকে নবাব ছাউনি তুলে নিয়ে কোথায় চলে গিয়েছিল কেউ জানে না। সেখানে খবর দিতে গিয়েছিল ডিহিদার। নানিবেগমসাহেবা হালসি গানে আসছে সে-খবরটা নবাবকে না দিলে চলে কী করে! সেখানেও নবাব নেই। তারপর গিয়েছিল কলকাতার আরও দক্ষিণে। দক্ষিণে যাওয়াও অত সোজা নয়। ফিরিঙ্গিরা শহরের দক্ষিণে খাদ কেটে রেখেছিল। নবাবের ফৌজের সঙ্গে ফিরিঙ্গিদের ফৌজের খুব একচোট লড়াই লেগে গিয়েছিল সেখানে। শেষকালে দেখা পাওয়া গেল গোবিন্দ মিত্তিরের বাগানবাড়িতে। সেখান থেকে সব খবর নিয়ে সোজা ঘোড়া ছুটিয়ে ডিহিদার নিজে চলে এসেছে ত্রিবেণীতে।
বেগমসাহেবা কি এখন হালসিবাগানে যাবেন?
দু’জনেই তাঞ্জামের ভেতর তখন উঠে এসেছে। নানিবেগম বললো হ্যাঁ চলো—
কিন্তু সেখানে গিয়ে কোনও ফয়দা নেই বেগমসাহেবা, নবাব ছাউনি তুলে নিয়ে ফিরে আসছেন
ফিরিঙ্গি কোম্পানির সঙ্গে সব ফয়সালা হয়ে গিয়েছে, ডিহিদার নিজে এসেছে খবর দিতে
নানিবেগম বললেফয়সালা হয়ে গিয়েছে? বিলকুল?
মরালী বললে–তা হোক ফয়সাল, তবু চলো নানিজি, রাস্তায় নবাবের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে
হুকুম হয়ে যেতেই ডিহিদারের দল তাঞ্জাম কাঁধে তুলে নিলে। সেপাইয়ের দল সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে চলতে লাগল। মাঝিমাল্লারা আবার সবাই যে-যার নৌকোয় গিয়ে উঠল।
ছোটমশাই হাঁ করে বসে ছিলেন। উদ্ধব দাস বজরায় আসতেই সামনে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন–কী কথা হচ্ছিল তোমার সঙ্গে এতক্ষণ? ও কে? জানতে পারলে নাকি কিছু?
উদ্ধব দাস বললে–উনি আপনারই সহধর্মিণী আজ্ঞে
কী করে জানলে? জিজ্ঞেস করলে নাকি? কী নাম?
মরিয়ম বেগম। প্রথমে কিছুতেই স্বীকার করতে চান না। শেষে বললাম বাবুমশাই আপনাকে আবার ফিরিয়ে নেবেন মাঠাকরুন, আপনি ফিরে চলুন–
তুমি বললে–ওই কথা?
তা বলব না? মুসলমান হলে কি একেবারে জাত চলে গেল মানুষের? মুসলমানরা কি মানুষ নয়, হিন্দুরাই মানুষ? চলুন আজ্ঞে, এবার লড়াই থেমে গেছে, আবার বাগবাজারে যাই
লড়াই থেমে গেছে! কে বললে?
ওই তো নবাবগঞ্জের ডিহিদার নিজে এসে খবর দিয়ে গেল, এখন দু’দলে ভাব হয়ে গেছে। এখন তো আর কামান ছোঁড়াছুড়ি হচ্ছে না সেখানে, ভয় কী আপনার?
ছোটমশাই বললেন কিন্তু নবাব যে তা হলে আরও বেড়ে উঠবে! একে সবাই নবাবের জ্বালায় অস্থির হয়ে উঠেছি, এর পর যে হাতে মাথা কাটবে
উদ্ধব দাস বললে–আমার কোনও ভয় নাই আজ্ঞে, আমি ভিখিরি মানুষ, আমায় আবওয়াবও দিতে হয় না মাথটও দিতে হয় না–আমি হরির দাস, আমি মাথট দিই হরিকে আমার একটা ছড়া শুনবেন? শুনুন —
বলে উদ্ধব দাস ছড়া আরম্ভ করলে —
যে-বিদ্যায় ফল নাই
তাকে মিথ্যা বিদ্যা জানি।
যে ব্যবসায় লভ্য নাই,
তাকে নাহি মানি।
যে-পুষ্প নয় দেবের আধার
মিথ্যা তাকে ধরা।
যে-ভূষণে শোভা নাই
মিথ্যা তাকে পরা ॥
যেকার্ষের যশ নাই
মিথ্যা সেই কার্য।
যে রাজ্যে বিচার নাই।
মিথ্যা সেই রাজ্য ॥
যে-গৃহে অতিথি নাই।
মিথ্যা সেই গৃহ।
যে-দেহতে ধর্ম নাই।
মিথ্যা সেই দেহ।
যে-দ্রব্যে রস নাই।
মিথ্যা তাহার মান।
যে-গীতে নাই হরির নাম
মিথ্যা সেই গান ॥
ছড়া থামিয়ে উদ্ধব দাস বললে–চলুন বাবুমশাই, এখন আপনার গৃহিণীর তো সন্ধান পাওয়া গেল, এবার আমার গৃহিণীর সন্ধান পাই কিনা চলুন দেখি গিয়ে
কোথায় যাব?
কেন, আবার সেই ক্লাইভ সাহেবের ছাউনিতে। তখন তো লড়াই হচ্ছিল বলে চলে এসেছিলুম, এখন তো লড়াই থেমে গেছে, এখন আপনার আর ভয় কী? আর আপনিও ক্লাইভ সাহেবকে গিয়ে বলবেন যে আপনার সহধর্মিণীর সাক্ষাৎ পেয়েছেন
ছোটমশাই আবার বাগবাজারের পেরিন সাহেবের বাগানের দিকে ফিরে চললেন।
*
বাদশাহি ফার্মান অনুসারে কোম্পানি সমস্ত বাণিজ্যাধিকার পুনঃপ্রাপ্ত হইনো কোম্পানি কলিকাতার দুর্গ সংস্কার করিতে পারিবেন৷ কলিকাতায় টাকশাল নির্মাণ করিয়া, কোম্পানির নামে মুদ্রিত টাকা প্রচলন করিবার অধিকার পাইবেন। এই মুদ্রায় কোনও বাটা দিতে হইবেনা। কোম্পানির যে সমস্ত কুঠিনবাব দখল করিয়াছেন তাহা ছাড়িয়া দিবেন। এবং বিগত আক্রমণে তাঁহাদের যে সমস্ত দ্রব্যাদি লুণ্ঠিত হইয়াছে তাহা প্রত্যর্পণ করিবেন। অথবা ন্যায়বিচারে ওই সমুদয় নষ্ট দ্রব্যের যাহা মূল্য তাহা দিবেন। ৩৯৬
