শশী চলেই যাচ্ছিল। হঠাৎ ফিরে দাঁড়িয়ে বললে–একটা কথা তোমাকেকদিন ধরে ভাই জিজ্ঞেস করব করব ভাবছি তোমার বিয়ে হয়ে গেছে নাকি?
কান্ত অবাক হয়ে গেল শশীর কৌতূহল দেখে।
বললে–কেন? ও-কথা জিজ্ঞেস করছ কেন?
না, দেখি কিনা, তুমি রোজ রাত জেগে চিঠি লেখো। এত চিঠি বউ না থাকলে আরকাকে লিখবে।
কান্ত বললে–কেন, বিয়ে না করলে আর কারও খবর নিতে নেই? মানুষের কি বউ ছাড়া আর কেউ থাকতে নেই? বাপ-মা-ভাই-বোনও তো থাকে মানুষের।
শশী বললে–কিন্তু তুমি তো নিজেই বলছ তোমার সংসারে কেউ নেই।
কান্ত বললে–তা তো বলেছি, কিন্তু পরও তো সময়ে সময়ে নিজের মানুষের চেয়ে আপন হয়
শশী বললে–সে তো হল মনের মানুষ! তোমার আবার তেমন মনের মানুষ কেউ আছে নাকি?
না ভাই, আমি লিখি সারাফত আলি সাহেবকে?
সারাফত আলি? সে আবার কে?
সে মুর্শিদাবাদের চকবাজারে একজন খুশবু তেলওয়ালা!
কিন্তু সে তো মুসলমান!
তা মুসলমান কি মনের মানুষ হয় না? তুমি তো হাসালে দেখছি
শশীর যেন ভুল ভাঙল। বললে–না, আমি ভেবেছিলুম তোমার বউ আছে, সেই বউয়ের কথা ভেবে ভেবে রাত জেগে তাকে চিঠি লেখো–
বাইরে তখন বেশ আলো হয়েছে। এখনই সব ফৌজের সেপাইরা কুচকাওয়াজ করতে বেরোবে। দাঁতন নিয়ে সবাই মুখ ধুতে যাচ্ছে। তৈরি হয়ে নিতে হবে তাড়াতাড়ি। শশীর আর সময় ছিল না। শশী চলে যেতেই কান্ত চিঠিটা বার করে আবার লিখতে বসল।
*
এদিকে ত্রিবেণীর ঘাটের ওপর শিবের মন্দিরটার আড়ালে যেতেই মরালী উদ্ধব দাসের দিকে চেয়ে বললে–কী বলবে, বলো।
উদ্ধব দাস বললে–আমার শুধু একটি জিজ্ঞাসা মাঠাকরুন, আমি শুধু আপনার আসল নামটি জিজ্ঞেস করব আপনার নামই কি মরিয়ম বেগম?
মরালী বললো হ্যাঁ
তা হলে আপনিই তো বাবুমশাইয়ের বউ?
মরালী বললেন– না
কেমন যেন সন্দেহ হল উদ্ধব দাসের। বললে–আপনি মাঠাকরুন মিছেই নারাজ হচ্ছেন, আপনি ভাবছেন আপনি মুসলমান হয়ে গেছে বলে বাবুমশাই আপনাকে গ্রহণ করবেন না। কিন্তু তিনি আপনার জন্যে পাগল মাঠাকরুন।
মরালী বললে–কিন্তু বাবুমশাইয়ের জন্য তোমার এত টান কেন? তুমি কী করো?
আমি? আমি কিছুই করিনে মাঠাকরুন। আমি ছড়া বানাই আর হরির নাম করি–আমি ভক্ত দাস আমার নাম উদ্ধব দাস, আজ্ঞে।
তোমার সংসার নেই।
উদ্ধব দাস বললে–সংসার করা আমার হল না মাঠাকরুন! আমার কথা ছেড়ে দেন—
তোমার বউ ছেলেমেয়ে?
বউই নেই তার ছেলেমেয়ে!
তুমি বিয়ে করোনি?
করেছিলুম মাঠাকরুন! কিন্তু বিয়ের রাতেই আমার বউ পালিয়ে গেল—
তারপর?
তারপর আর কী মাঠাকরুন। তারপরে আর কিছু নেই।
মরালী জিজ্ঞেস করলে কেন, তোমার বউ পালিয়ে গেল কেন?
আজ্ঞে মাঠাকরুন, পালিয়ে তো যাবেই, আমার মতো বাউন্ডুলে বরের সঙ্গে কে ঘর করবে তাই বলুন? আর আমি যে কুরূপ মাঠাকরুন। কে আমাকে পছন্দ করবে! আমি তাই একটা ছড়া বেঁধেছি মাঠাকরুন, শুনবেন? শুনুন
না, ছড়া থাক। তুমি আর একটা কথার উত্তর দাও।
কী, আজ্ঞে করুন–
তোমার বাবুমশাই কি হাতিয়াগড়ে থাকেন?
তা তো জিজ্ঞেস করিনি মাঠাকরুন, আমার নিজের বিয়ে হয়েছিল হাতিয়াগড়ে–তা আমার সঙ্গে বাবুমশাইয়ের পথে দেখা। আমি গিয়েছি বরানগরে ক্লাইভ সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে, এদিকে বাবুমশাইও গিয়েছেন
ক্লাইভসাহেব? ক্লাইভ সাহেবকে তুমি চেনো?
উদ্ধব বললে–তা চিনব না? ক্লাইভসাহেব যে আমাকে কবি বলে খুব খাতির করে মাঠাকরুন। আমার ছড়া শোনে, আমার গান শোনে। ক্লাইভ সাহেবের ছাউনিতেই আমার বউ ছিল যে–সাহেব বড় ভাল লোক
বোরখার ভেতরে মরিয়ম বেগম যেন উসখুস করতে লাগল।
বললে–তোমার বউ ক্লাইভ সাহেবের কাছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ মাঠাকরুন! আমি কথা বলতে গেলাম। ভাবলাম জিজ্ঞেস করব কেন আমার কাছ থেকে পালিয়ে গেল, কিন্তু আমার সঙ্গে কথাই বললে–না আমার সামনে বেরোলেই না সাহেব অনেক বললে–তবু বেরোল না
তা তোমার বউ সাহেবের কাছে এল কী করে?
তা কী করে বলব মাঠাকরুন।
সাহেবের কাছেই থাকে নাকি এখনও?
হ্যাঁ মাঠাকরুন, এখনও থাকে, তবে এবার যখন দেখা হল, বললেন, তাদের কোথায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। যুদ্ধ-বিগ্রহ হচ্ছে কিনা, তাই ছাউনির ভেতরে আর রাখতে সাহস হয়নি। আমরা যখন ফিরে আসছিলাম তখন আজ্ঞে কামানের গোলার শব্দ পেলাম–খুব কামানের লড়াই হয়ে গেল নবাবের সঙ্গে
নবাব কোথায় তা জানো তুমি?
আজ্ঞে না মাঠাকরুন! আমি ভিখিরি মানুষ, নবাব বাদশাদের খবর জেনে আমার কী লাভ? ছড়া বানিয়ে আমি নবাবিসুখ পাই।
বোরখাটা আবার নড়ে উঠল। বেগমসাহেবা বললে–আমার একটা কথা রাখবে তুমি?
আজ্ঞা করুন।
তুমি আবার একটা বিয়ে করে ফেলল।
না মাঠাকরুন। একবার বিয়ে করেই ভুল করে ফেলেছি, আর করব না। আমাকে বিয়ে করে কোনও কন্যাই সুখী হবে না ।
বেগমসাহেবা বললে–ক্লাইভ সাহেবের ঘর করছে বলে তোমার আপত্তি?
না মাঠাকরুন, আমি জাত মানিনে, আমার বউ যদি মুসলমানের ছোঁয়া অন্নও খেত তাতেও আমি আপত্তি করতাম না–
তোমার বউ মুসলমান হয়েছে নাকি? হলেও হতে পারে মাঠাকরুন। মুসলমান হওয়া কি খারাপ? আমরাও যেমন মানুষ তারাও তেমনি মানুষ তো। মানুষ মাত্তরই তো হরি মাঠাকরুন? তাঁদের মধ্যেও হরি আছেন, তাই তো আমি হরির মধ্যেই মানুষকে দেখতে পাই, আবার মানুষের মধ্যে হরিকে। আমি হরি নিয়ে একটা ছড়া বেঁধেছি, একটু শুনবেন আজ্ঞে?
