উদ্ধব দাস বললে–আমার কথা আর কী শুনবেন মাঠাকরুন, আমার কথা শোনবার মতো নয়–আমি ভিখিরি, দেবাদিদেব শিবও যেমন আমিও তেমনি দু’জনেই ভিক্ষে করে বেড়াই, দু’জনেরই সংসার থেকেও সংসার নাই
তারপর মরালীর দিকে চেয়ে বললে–বাবুমশাইকে তাই তো বলছিলুম মাঠাকরুন, আপনার বউ চলে গেছে ভালই হয়েছে বাবুমশাই, আমার মতন ভিখিরি সেজে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ুন, দেখবেন আর কোনও দুঃখু থাকবে না
ডিহিদার সেপাইরা অনেকক্ষণ সহ্য করেছে। আর দেরি সহ্য হচ্ছিল না কারও। কিন্তু নবাবের বেগমসাহেবা নিজে কথা বলছে, তাতে বাধা দেয়ই বা কী করে? ওদিকে অনেকখানি সকাল হয়ে গেছে। হুকুম ছিল ত্রিবেণীতে বজরা থেকে নামবার সঙ্গে সঙ্গে শিবিকা তৈরি থাকবে, সেই শিবিকা বেগমসাহেবাদের নিয়ে সোজা গন্তব্যস্থানের দিকে যাবে। নবাবগঞ্জেও খবর দেওয়া হয়ে গেছে। সেখানেও ডিহিদার আছে। সেই নবাবগঞ্জের ডিহিদার আবার শিবিকা পৌঁছে দেবে হালসিবাগানে।
ডিহিদার সাহেব আবার সামনে এসে কুর্নিশ করে দাঁড়াল।
বেগমসাহেবা, তাঞ্জাম নবাবগঞ্জে পৌঁছুতে তাওয়াকুফ হয়ে যাবে
মরালী ডিহিদারের দিকে ফিরে ধমকে উঠল–থামুন আপনি, বেগমসাহেবার সঙ্গে কেমন করে কথা বলতে হয় তার কায়দা জানেন না
নানিবেগমসাহেবা অনেকক্ষণ ধরে তাঞ্জামের ভেতরে অপেক্ষা করছিল। কিন্তু আর পারলে না। তাঞ্জাম থেকে বেরিয়ে সোজা মরিয়ম বেগমসাহেবার কাছে এল। মেয়ে কার সঙ্গে কথা বলছে এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে!
মরালী বললে–যাচ্ছি নানিজি, চলো, বলে নানিজির দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ পাগলা উদ্ধব দাস একটা কাণ্ড করে বসল। বললে–মাঠাকরুন কি চলে যাচ্ছেন?
কী রে মেয়ে, কার সঙ্গে কথা বলছিস? দেরি হয়ে যাচ্ছে যে!
এই উল্লুক! বলে ওদিক থেকে ধমকে উঠল একজন সান্ত্রি!
কিন্তু আশ্চর্য! উদ্ধব দাস সেকথায় কানই দিলে না। গালাগালি দিয়ে উদ্ধব দাসকে রাগানো যায় না। উদ্ধব দাসের কাছে গালাগালিও যা, স্তুতিও তাই।
বললে–আমার যে একটা কথা ছিল মাঠাকরুন
মরালী ফিরে দাঁড়াল–আমার সঙ্গে?
হা মাঠাকরুন।
বলো! বলে মরালী উদ্ধব দাসের কাছে এসে দাঁড়াল।
উদ্ধব দাস বললে–সকলের সামনে তো বলা যাবে না, আপনাকে একটু অন্তরালে বলব—
নানিবেগমসাহেবা পেছন থেকে বললে–ও মেয়ে, আবার কার সঙ্গে কথা বলছিস? কে ও?
মরালী বললে–দাঁড়াও নানিজি, আমি ওর সঙ্গে একটু কথা বলে আসি
ওর সঙ্গে তোর এত কী কথা? তোর সকলের সঙ্গে কী এত কথা থাকে রে?
মরালী বললে–শুনিই না নানিজি, কী বলতে চায় ও?
বলে উদ্ধব দাসের দিকে চেয়ে বললে–এসো।
ঘাটের ওপর যেখানটায় অশ্বত্থ গাছটা ছিল সেখান থেকে একটু এগিয়েই একটা মন্দির। মন্দিরের ওপাশে একটু ঝোঁপঝাড়ের মতন। বজরার গলুইয়ের ওপর থেকে ছোটমশাই এতক্ষণ সব কাণ্ড দেখছিলেন। চারদিকে বেশ ফরসা হয়ে এসেছে। সবাই চুপচাপ উদ্ধব দাসের দিকে চেয়ে আছে। পাগলাটার সাহস দেখে সবাই তাজ্জব হয়ে গেছে। এত সেপাই-সান্ত্রি, ডিহিদার সাহেব নিজে দাঁড়িয়ে, আর পাগলা লোকটা কিনা বেগমসাহেবার সঙ্গে বেশ ভাব জমিয়ে ফেললে!
ছোটমশাই গলুইয়ের ওপাশে সরে গিয়ে দেখতে লাগলেন। যতটা স্পষ্ট দেখা যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর দেখা গেল না। পাগলাটা বোরখা-পরা বেগমসাহেবার সঙ্গে মন্দিরের আড়ালে চলে গেল। সত্যিই কি ছোট বউরানি নাকি! পাগলাটা তো ঠিক ধরেছে? পাগলা হলে কী হবে, লোকটার তো চোখ আছে!
*
গোবিন্দ মিত্তিরের বাগানবাড়িতে তখন নবাবের ছাউনি পড়েছিল। কান্ত শেষরাতে ঘুম থেকে উঠে চিঠি লিখছিল–তোমাকে একদিন চিঠি লিখতে পারিনি মরালী। একদিন যে কী রকম করে কেটেছে তা ভগবানই জানেন। তুমি আমাকে যে ভার দিয়েছ তা বর্ণে বর্ণে পালন করার চেষ্টা করছি। কিন্তু আমি একলা কত পারব। শেষপর্যন্ত নবাব ভীষণ বিপদে পড়েছিলেন। আমরাও সবাই বিপদে পড়েছিলুম। ফিরিঙ্গিরা যে এত ফন্দিবাজ তা আগে কেউ জানতে পারেনি। আমাদের ফৌজ নিয়ে পালাতে হয়েছিল। হালসিবাগান ছেড়ে। সে এক বিপর্যয় কাণ্ড। শেষপর্যন্ত যদি কন্নড় দেশ থেকে ফরাসি জেনারেল বুশিসাহেব এসে পড়ত তা হলে আর এমন হত না। ওদিক থেকে আহমদ শা আবদালির মথুরা লুঠ করে দিল্লি চড়াও হবার খবর কানে আসাতে নবাব কেমন হয়ে গেছেন। কদিন ধরেই দেখছিলাম নবাব খুব মনমরা। আমি কী করব। ওদিকে জগৎশেঠজির দেওয়ান রণজিৎ রায় মশাই এসে পরামর্শ দিলেন ফিরিঙ্গি কোম্পানির সঙ্গে মিটমাট করে নিতে।
বাইরে থেকে কে যেন ডাকলেও কান্ত, কান্ত!
শীতের দিনে অত ভোরে আবার কে ডাকে? তাড়াতাড়ি চিঠিটা বিছানার তলায় লুকিয়ে রেখে বাইরে এল কান্ত।–কে?
আমি শশী গো? কী করছিলে? চিঠি লিখছিলে নাকি?
কান্ত বললে–তুমি এত সকালে? কী খবর?
ভাই, খবর তো আমার কাছে নয়, তোমার কাছেই। খবর নিতেই তো এসেছি।
কান্ত বললে–আমার কাছে আর কোনও নতুন খবর নেই
শশী বললে–রণজিৎ রায় লোকটা ভাল নয় তো ভাই
কেন?
শশী বললে–বেশ তো লড়াই চলছিল, ও বেটা আবার কী করতে এল? যুক্ষুটুঙ্কু সব থামিয়ে দেবে নাকি?
কান্ত চেপে গেল। বললে–তা জানি না
তা হলে ওদের ক্লাইভ আর ওয়াটসন সাহেব দু’জনে নবাবের সঙ্গে দেখা করতে এল কেন? মিটমাটের কথা বলতে বুঝি?
কান্তর এমনিতেই বিরক্তি লাগছিল। তাড়াতাড়ি চিঠিটা শেষ করে ফেলা যেত। কিন্তু তা হবার নয়।
