উদ্ধব দাস হাত জোড় করে ডিহিদারকে বললে–হুজুর, ধর্মাবতার, আমাদের বাবুমশাইয়ের বউকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে এরা।
বাবুমশাইয়ের বউ? কোন বাবুমশাই? তুমি কে?
আজ্ঞে, আমি হরির দাস উদ্ধব দাস। আমাকে সেপাইবাবাজি বললে, মরিয়ম বেগমসাহেবা যাচ্ছে, তাই আমি বললাম উনি তো বাবুমশাইয়ের বউ, তোমরা ওঁকে মরিয়ম বেগমসাহেবা নাম দিয়েছ ওঁকে ছেড়ে দাও।
সেই ভোরবেলা ত্রিবেণীর ঘাটে সেদিন সে এক কাণ্ড শুরু হয়ে গেল। ঘাটের অন্য দিকে যেসব নৌকো বাঁধা ছিল হল্লা চিৎকার শুনে মাঝিমাল্লারা তখন জেগে উঠেছে। হল্লা শুনে তারাও ঘাটের ওপর গিয়ে হাজির হয়েছে। সেই ঝাপসা অন্ধকারের মধ্যে ভিড় জমে গেল চারদিকে।
হুজুর, আমি কী অপরাধ করলাম? আমি তো কারও গায়ে হাত তুলিনি?
ডিহিদার বোধহয় বেশি কথা শোনবার লোক নয়। হুকুম দিলে বাঁধে একে—
তা বাঁধো বাবাজি, কেউ আমাকে বাঁধতে পারেনি, দেখো, তোমরা যদি পারো
তোকে বাঁধতে পারিনে ভেবেছিস?
উদ্ধব দাস বললে–হুজুর, কেউ কি কাউকে বাঁধতে পারে? ভালবাসাই তো একমাত্র বন্ধন হুজুর, সে কি আপনাদের আছে? তা হলে একটা ছড়া শুনবেন হুজুর? আমি ভালবাসা নিয়েই একটা ছড়া লিখেছি–শুনুন–
আশার অধিক দেয় যদি তাকে বলে দান।
পণ্ডিত যারে মান্য করে তাকেই বলে মান ॥
দরিদ্র দুর্বলে দয়া তাকেই বলে পুণ্য।
স্বনামে যে বিক্রিত হয় তাকেই বলি ধন্য ।
দেবতায় করে বশীভূত তাকেই বলি সাধ্য।
বাহুবলে করে যুদ্ধ তাকেই বলি বীর।
আখের ভেবে কর্ম করে তাকেই বলি ধীর ॥
ইশারায় কর্ম করে তাকেই বলি বশ।
মফসসলে ব্যাখ্যা করে তাকেই বলি যশ ॥
দশের কাছে দুষ্য হয় না তাকেই বলি ভাষা।
অন্তরেতে ভালবাসে তাহাই ভালবাসা ॥
উদ্ধব দাস আরও বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ডিহিদার মশাইয়ের বোধহয় একটু রসবোধের অভাব ছিল। বললে–থাম থাম পাগলা।
তারপরে সেপাইদের একজনকে কী ইঙ্গিত করতেই সে উদ্ধব দাসের কাছে এসে তার গলাটা ধরলে। ধরে বললে–চল
সামান্য শান্তিতে বোধহয় ডিহিদার খুশি হল না। বললে–হাত দুটো বাঁধ আগে ওর
উদ্ধব দাসও হাত দুটো বাড়িয়ে দিলে। বললে–এই নাও বাবাজি, বাঁধো
কিন্তু সেপাইরা অত সহজ মানুষ নয়। তারা যাকে বাঁধে তাকে মরণবাঁধন দিয়েই বাঁধে। পালকির ভেতরে তখন বেগমসাহেবারা তৈরি। পালকিও যাবে, সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধব দাসকেও বেঁধে নিয়ে যাওয়া হবে।
দূর থেকে ছোটমশাই সব দেখছিলেন। পাগলটার যেন কোনও ভয় ভীতি নেই। সেপাইদের সঙ্গে সমানে ছড়া কেটে চলেছে। কুয়াশাও তখন বেশ কেটে এসেছে চারদিকে। অল্প অল্প আলো ফুটে বেরোচ্ছে।
হঠাৎ এক কাণ্ড ঘটল ওদিকে।
অত লোকজন, অত সেপাই ডিহিদার মাঝিমাল্লা, সবাই থমকে গেছে কাণ্ড দেখে। পালকির ভেতর থেকে বেগমসাহেবা ছুটে বেরিয়ে এসেছে দিনের আলোয়। এমন ঘটনা স্বাভাবিক নয়, সহজও নয়।
ছেড়ে দাও, ওকে ছেড়ে দাও
সারা শরীর বোরখায় ঢাকা। মুখ দেখা যাচ্ছে না। তবু কথা বুঝতে কারও অসুবিধা হল না। যে-সেপাই উদ্ধব দাসের হাত বাঁধছিল সে হতভম্ব হয়ে রইল। এতক্ষণে যেন ডিহিদার সাহেবের হুঁশ হল।
ছাড়ো
উদ্ধব দাস কিন্তু অবাক হয়নি। সেই অবস্থাতেই ছড়া কেটে উঠল–অন্তরেতে ভালবাসে তাহাই ভালবাসা
ডিহিদার কোনও উপায় না পেয়ে সেপাইকে উদ্ধব দাসের হাত ছেড়ে দিতে বললে।
ধমকে উঠল মরালী–কেন ওকে ধরলে তোমরা? কী করেছে ও?
উদ্ধব দাস বললে–আমি কিছুই অপরাধ করিনি মাঠাকরুন, এরা শুধু শুধু আমাকে বাঁধছে—
ডিহিদার বললে–না বেগমসাহেবা, এ-লোকটা আমার সেপাইকে জিজ্ঞেস করছিল বেগমসাহেবারা কোথায় যাচ্ছে, বেগামসাহেবার নামালিয়ম বেগম কিনা, এইসব
না মাঠাকরুন, আমি তা জিজ্ঞেস করিনি, বাবুমশাই আমার সঙ্গে বজরাতে রয়েছেন, তাঁর বউকে নবাবের লোকরা পরোয়ানা দিয়ে চেহেল্-সুতুনে নিয়ে গিয়ে মরিয়ম বেগম নাম দিয়ে দিয়েছে–
কোথায় বাবুমশাই?
আজ্ঞে হুই যে মাঠাকরুন, হুই যে বজরার ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছেন, সুন্দরপানা চেহারা–আপনি তো ওঁরই বউ মাঠাকরুন! আপনার জন্যে উনি কেঁদে কেঁদে মরছেন।
ডিহিদার আর থাকতে পারলে না। বললে–চোপরাও–
বোরখার আড়াল থেকে ধমকানি এল–আপনি থামুন, আপনিনবাবের নৌকর, আমি বেগমসাহেবা কথা বলছি এর সঙ্গে, আপনি কোন এক্তিয়ারে বাধা দিচ্ছেন?
ডিহিদার চুপ করে গেল।
উদ্ধব দাস বললে–কেন মিথ্যে মিথ্যে চেঁচামেচি করছেন ডিহিদারসাহেব, আমি তো হরির দাস উদ্ধব দাস, আমি তো প্রভুর কোনও ক্ষতি করিনি–বেগমসাহেবাদেরও কোনও বেইজ্জত করিনি
তারপর একটু থেমে বললে–তা ছাড়া আমার নিজেরই তো বউ পালিয়ে গেছে প্রভু
তোমার বউ পালিয়ে গেছে নাকি?
পাশ থেকে কে একজন ফুট কাটলে।
আজ্ঞে হ্যাঁ প্রভু, আমার নিজের বউ, আমার নিজের বিয়ে করা বউ প্রভু, বিয়ের রাতে বাসরঘর থেকে পালিয়ে গেছে
তা বউ পালিয়ে গেছে আর তুমি ফ্যা ফ্যা করে হাসছ?
আজ্ঞে হ্যাঁ, হাসি আর গান গাই। সেই বউ নিয়ে তো ছড়া বেঁধেছি, আমি রব না ভব-ভবনে! গানটা গাইব মাঠাকরুন?
মরালী বললে–না
আজ্ঞে মাঠাকরুন, গাই না! দেখবেন কেমন সোন্দর সুর, যে শোনে সেই বলে বাহা–সব্বাই গানটা শুনে বাহবা দেয়
তা দিক, আমার শোনবার সময় নেই। তুমি কোথায় থাকো?
ডিহিদার বুঝতে পারলে না বেগমসাহেবা কেন এত কথা বলছে পাগলাটার সঙ্গে।
