উদ্ধব দাস দেখলে, বজরা থেকে দু’জন মেয়ে নামল বোরখায় সমস্ত শরীর ঢেকে। পা-টা উঁচু করতেই দেখা গেল ফরসা টকটক করছে গায়ের রং। তাতে মেহেদি পাতার রং লাগিয়েছে আলতার মতো।
.
ভেতরে মুখ বাড়িয়ে ডাকলেও বাবুমশাই, বাবুমশাই গো!
ছোটমশাই ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করলেন–আবার কী?
আজ্ঞে, বাইরে এসে দেখে যান—
কী দেখব!
কারা যেন ঘাটে এসে নামল!
সেসব দিনের কথা উদ্ধব দাসের মনে আছে। দেখতে পাগলা হলে কী হবে, উদ্ধব দাস সব বুঝত। আমাদের এই সংসারটাই তো ধোঁকার টাটি হে! সব দেখবে সব জানবে, কিছু বললেই বিপদ।
ছোটমশাইয়ের বজরাটা ত্রিবেণীর ঘাটে বেঁধে রাখা হয়েছিল। সেই হাতিয়াগড় থেকে কবে বেরিয়েছিলেন ছোটমশাই। তারপরে গেছেন কেষ্টনগরে, তারপর কলকাতার বরানগরে। সেখান থেকে বাগবাজার পেরিন সাহেবের বাগানে। কিন্তু হঠাৎ এমন লড়াই বেধে যাবে কে জানত। কামানের গোলার শব্দ পেয়েই নৌকো ছেড়ে দিয়েছিলেন। সেই নৌকো ভাসতে ভাসতে ত্রিবেণীতে এসে কাছি বেঁধেছিল। মাঝরাত পর্যন্ত ভাল ঘুম আসেনি। পাগলটা বক করেছিল অনেকক্ষণ। অনেক ছড়া শুনিয়েছিল। তারপর ছোটমশাই বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন–তুমি এখন যাও হে আমি এখন ঘুমোব
উদ্ধব দাস তার বেগম মেরি বিশ্বাস’ কাব্যে লিখে গেছে তখনও সে জানে না যে তার সহধর্মিণীর সঙ্গেই দেখা হয়ে যাবে সেদিন। তখনও জানে না তার বউ-ই সেই ভোরবেলা নানিবেগমকে নিয়ে সেই ত্রিবেণীর ঘাটেই এসে আবার উঠবে।
নবাবি কায়দা বড় কড়া। বজরা থেকে নামবার আগেই গানটা মরালীর কানে গিয়েছিল–আমি রব না ভব-ভবনে
যে-মেয়ে বাংলাদেশের এক অখ্যাত জনপদে জন্মেছিল কোন এক অখ্যাত গ্রাম্যকবির গৃহিণী হবার জন্যে, ইতিহাসের অমোঘ প্রয়োজনে আবার সেই মেয়েকেই নবাবের চেহেসূতুনে এসে উঠতে হয়েছিল। ইতিহাসের প্রয়োজনে এমনি করেই এক-একটা জীবন উৎসর্গ করতে হয়েছে বারবার। মরিয়ম বেগম থেকে শুরু করে জোয়ান-অব-আর্ক পর্যন্ত এর নজিরের আর সীমাসংখ্যা নেই সংসারে। নইলে স্বামী-পুত্রকন্যা-সংসার নিয়ে মত্ত থাকলে কে আর মরিয়ম বেগমদের চিনত, কে আর জোয়ান-অব-আর্কদের জানত। কে আর তাদের নিয়ে কাব্য লিখত। ছছটমশাইকে আবার ডাকলে উদ্ধব দাস-ও বাবুমশাই, উঠুন, উকুন
কেমন যেন হাবভাব দেখে উদ্ধব দাসের সন্দেহ হয়েছিল এরা সাধারণ গৃহস্থ ঘরের বউ-ঝি নয়। সঙ্গের লোক-জন-পাইক-জমাদার সবাই যেন কোন সন্তব্যস্ত হয়ে কাজ করছে। নইলে ডিহিদারের অত ভোরে আসার দরকার কী?
ও বাবুমশাই, বাবুমশাই
ছোটমশাই সত্যিই তখন ঘুমোচ্ছিলেন। ডাকাডাকিতে আর থাকতে পারলেন না। বড় কষ্ট যাচ্ছে ক’দিন ধরে। এবার সঙ্গে কাউকে আনেনওনি। মাঝিমাল্লা যারা ছিল তারাই যা-কিছু করছে। গোকুলও নেই যে দেখবে। এমন করে একলা একলা থাকার অভ্যেস নেই তার। পাশে কেউ না থাকলে ঘুমও আসে না। তারপর যা শীত পড়েছে।
বাইরে আসতেই উদ্ধব দাস বললে–ওই দেখুন
কী দেখব?
নবাবজাদিটাদি কেউ হবে বোধহয়।
কীসে বুঝলে?
আজ্ঞে বোরখার তলায় আমি পায়ের রং দেখছিলাম। দাঁড়ান আমি জিজ্ঞেস করে আসি বলে উদ্ধব দাস আর সেখানে দাঁড়াল না। গলুই থেকে ডাঙায় ঝাঁপিয়ে পড়ল।
হোমশাই বললেন–কী দেখতে যাচ্ছ ওদিকে?
উদ্ধব দাস বললে–আপনি তখন বলছিলেন না যে আপনার বউ নবাবের হারেমে আছে? আমি জিজ্ঞেস করে আসছি ওদের, আপনার বউয়ের খবর জানে কিনা–আপনার বউয়ের কী নাম বলছেন?
তা ওদের জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছ কেন? তোমাকে ওসব জিজ্ঞেস করতে হবে না।
তা আপনার বউয়ের কী নাম রেখেছে ওরা সেইটেই বলুন না! মরিয়ম বেগম না কী যেন?
না না, খবরদার ওসব কথা জিজ্ঞেস করতে যেয়ো না।
কিন্তু উদ্ধব দাসের বারণ শোনার মতো অবস্থায় তখন। সে তখন হনহন করে গঙ্গার পাড় ভেঙে ওপরে উঠছে।
ওপরে বিরাট একটা অশ্বত্থ গাছ। ঝাঁকড়া মাথায় সারা জায়গাটা আরও অন্ধকার করে রেখেছে। সেপাইলশকররা একটা পালকিকে ঘিরে রয়েছে চারদিকে। উদ্ধব দাস সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। বোরখা-পরা মেয়েমানুষ দুটো পালকির ভেতরে উঠতে যাচ্ছে।
একজন সেপাইকে গিয়ে উদ্ধব দাস জিজ্ঞেস করলে–এঁরা কারা গো?
সেপাইটা কথাটায় তত কান দেয়নি প্রথমে। উদ্ধব দাস আবার জিজ্ঞেস করলে–এঁরা কে গো। সেপাইবাবাজি?
তবু কেউ কান দিলে না সেকথায়। ডিহিদার নিজে দাঁড়িয়ে তদারকি করছে। পালকিতে উঠলেই সেটা চলতে শুরু করবে। ত্রিবেণীর ডিহিদারের ওপর হুকুম আছে বেগমদের হালসিবাগান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিয়ে তবে তার ছুটি।
উদ্ধব দাস আবার চুপি চুপি জিজ্ঞেস করলেও কোন বেগম গো?
একজন সেপাই বললে–ও নানিবেগমসাহেবা আর…
হঠাৎ হইহই পড়ে গেছে। একজন সেপাই ধরে ফেলেছে উদ্ধব দাসকে। ধরে একেবারে মারে আর কী!
উদ্ধব দাসও তখন চেঁচাচ্ছে–তোমরা বলো আগে ও মরিয়ম বেগম কিনা
–ভাগো ইহাসে–ভাগো–
উনি যে বাবুমশাইয়ের বউ গো তোমরা বাবুমশাইয়ের বউকে চেহেল্-সুতুনে চুরি করে ধরে রেখেছ।
ছোটমশাই বজরার ওপর থেকে বেশ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলেন কথাগুলো। এ-পাগলটার কি ভয়-ডর নেই। এইবার বোধহয় পাগলাটাকে ধরবে ওরা। ধরে নিয়ে যাবে। চারদিকে বড় কুয়াশা। ভাল করে দেখা যায় না, শুধু কথাগুলো শোনা যায়। ওরা যত চেঁচায়, এও তত চেঁচায়।
এতক্ষণে ডিহিদারের কানে গেছে কথাটা। ক্যা হুয়া?
