ছোটমশাই বলতে লাগলেন–আপনি যদি নবাবের সঙ্গে লড়াই করেন তো আমরা সবাই আপনার পেছনে আছি। আমরা সবাই নবাবের বিরুদ্ধে
ক্লাইভ সোজাসুজি চাইলে ছোটমশাইয়ের দিকে। জিজ্ঞেস করলে কেন? আপনারা সবাই নবাবের এগেনস্টে কেন? নবাব আপনাদের কী ক্ষতি করেছে?
কী ক্ষতি করেননি তাই বলুন? আমরা সামান্য জমিদার, আমাদের খাজনা বাড়িয়েছে, আমাদের মাথটু বেড়েছে, আওয়াব বেড়েছে। আমাদের কথা আপনার বিশ্বাস না হয় মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকেও জিজ্ঞেস করতে পারেন, তার জমিদারির আয় কী আর খরচ কী! নবাব কি প্রজাদের জমিদারদের তালুকদারদের সুখ দেখেছে কখনও। আলিবর্দি খাঁ-ও দেখেনি, এই নতুন নবাবও দেখছে না। তারপর ডিহিদার, ফৌজদার, কোতোয়াল, চৌকিদারদেরও অত্যাচার কি কম বেড়েছে মনে করেছেন? সবাই মনে মনে তিতিবিরক্ত হয়ে আছে নিজামতের ওপর। আমরা মেয়ে বউ নিয়ে ঘর পর্যন্ত করতে পারিনে।
কেন?
আজ্ঞে, সুন্দরী বউ থাকলে তো আর কথাই নেই, নবাবের ঠিক নজরে পড়ে যাবে।
সেকী?
হ্যাঁ, আমার কথা বিশ্বাস না হয় আপনি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, নাটোরের মহারানি রানিভবানীকে জিজ্ঞেস করতে পারেন।
ক্লাইভ উদ্ধব দাসের দিকে চাইলে। বললে–কী গো পোয়েট, সব সত্যি?
ছোটমশাই বললেন–ও কী জানে সাহেব, আমি নিজেই তো ভুক্তভোগী, আমার নিজের বউকেই তো নবাব নিজের হারেমে নিয়ে গেছে!
ক্লাইভ অবাক হয়ে গেল–সত্যি?
হ্যাঁ সাহেব, যা বলছি সব সত্যি। আমার নিজের বউকে হারেমে নিয়ে গিয়ে কলমা পড়িয়ে তাকে মুসলমান করে দিয়েছে, নাম রেখেছে মরিয়ম বেগম,–সেই জন্যেই তো আপনার কাছে ছুটে এসেছি প্রতিকারের জন্যে।
তুমি কিছু জানো পোয়েট?
উদ্ধব দাস বললে–আমি কী জানব হুজুর, আমার নিজের বউয়েরই খোঁজখবর রাখতে পারিনে, আমি রাখব পরের বউয়ের খবর?
ক্লাইভ বললে–তা তোমার বউ তোমার কাছে যাবে না তার আমি কী করব? তুমি আর একটু আগে এলে না কেন?
আমি কি আর আমার বউয়ের জন্যে এসেছি হুজুর, এদিকে এসেছিলাম, তাই আপনার সঙ্গে দেখা করতে এলাম। বউ আমার কেমন আছে হুজুর?
ক্লাইভ বললে–তোমার বউ তো আমার এখেনে নেই।
নেই?
না, একটু আগেও ছিল, ভাবলাম এখানে কামানের গোলাটোলা পড়তে পারে তাই তাদের পাঠিয়ে দিলাম বাইরে। সঙ্গে লোক দিয়েছি, কোনও ভাবনা নেই তোমার। একটু আগে এলেই দেখা করিয়ে দিতাম তোমার সঙ্গে…।
হঠাৎ দৌড়োতে দৌড়োতে ঘরে ঢুকেছে স্ক্র্যাফটন, ওয়ালস্ আর নবকৃষ্ণ। ক্লাইভ তাদের দেখেই অবাক হয়ে গেছে। এত রাত্রে তো ফিরে আসার কথা নয়। কী হল?নবাব এগ্রি করেছে আমার টার্মসে?
ওয়ালস তখন হাঁফাচ্ছিল। বললে–নবাব ওয়ারের প্রিপেরেশন করছে।
সেকী?
হ্যাঁ, মিস্টার উমিচাঁদ বললে–আরও ক্যানন এসে পৌঁছোবে কাল, আমাদের ওখানে ডিটেন করে রাখতে চেয়েছিল, তাই লুকিয়ে লুকিয়ে পালিয়ে এসেছি। আমাদের মনে হয় আজ রাত্রেই নবাব অ্যাটাক করবে আমাদের।
ক্লাইভ জিজ্ঞেস করল–আর ইউ শিয়োর? ঠিক বলছ তুমি?
একমুহূর্তে যেন সেই মিষ্টি চেহারাটা কেমন লোহার মতো কঠিন হয়ে উঠল। সে-চেহারা দেখে আর চেনা গেল না ক্লাইভ সাহেবকে। এক মুহূর্তে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উঠেছে। আর চোখ দুটো নিষ্ঠুর হয়ে পৃথিবীকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে।
উদ্ধব দাসের দিকে চেয়ে দেখলে ক্লাইভ। বললে–পোয়েট, তোমরা এখন যাও–আই মাস্ট গেট প্রিপেয়ার্ড কাল সকালে আবার এসো।
উদ্ধব দাসের যেন কোনও বিকার নেই। সঙ্গে সঙ্গেই উঠে দাঁড়াল।
বললে–চলুন বাবুমশাই চলুন–আমরা যাই, কাল আবার আসব।
ছোটমশাইও অগত্যা উঠলেন। বাগানের ফটক পেরিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালেন। তারপর সোজা গঙ্গার ঘাটের দিকে চলতে লাগলেন। এত আশা করে এসেছিলেন। সব কথা ভাল করে বুঝিয়ে বলা হল না সাহেবকে।
অন্ধকার ঘাট। গঙ্গার জল তরতর করে বয়ে চলেছে।
উদ্ধব দাস বললে–বড় খিদে পেয়েছে বাবুমশাই।
ছোটমশাই সে কথার উত্তর দিলেন না। মনটা তার ছটফট করছিল ছোট বউরানির জন্যে। খিদে-তেষ্টা সবকিছু তার ক’দিন থেকেই উড়ে গিয়েছে।
হঠাৎ দূর থেকে একটা বিকট শব্দ হতেই তিনি চমকে উঠেছেন। কামানের শব্দ নাকি? লড়াই বাধল নাকি নবাবের সঙ্গে?
উদ্ধব দাস বললে–ওই কামানের শব্দ শুনলেন বাবুমশাই?
সেকথায় কান না দিয়ে ছোটমশাই মাঝিদের বললেন–ওরে, বজরা ছেড়ে দে শিগগির, কাছি। খোল–লড়াই লেগে গেছে।
ত্রিবেণীর ঘাটে তখন সবে ভোর হয়েছে। ছোটমশাইয়ের বজরার ভেতরে তখন ছোটমশাই ঘুমোচ্ছিলেন। অনেক কষ্টে বাগবাজারের ক্লাইভ সাহেবের ছাউনি থেকে পালিয়ে এসেছেন। নবাবের সঙ্গে কোম্পানির যে এমন লড়াই বাধবে ভাবতেই পারেননি। পাগলা লোকটাও সঙ্গে ছিল।
বাইরে বজরার গলুইয়ের ওপর উদ্ধব দাস তখন চেঁচিয়ে গান ধরেছে
আমি রব না ভব-ভবনে
শুন হে শিব শ্রবণে ॥
যে নারী করে নাথ
পতিবক্ষে পদাঘাত
তুমি তারই বশীভূত
আমি তা সব কেমনে ॥
পতিবক্ষে পদ হানি
সে হল না কলঙ্কিনী
মন্দ হল মন্দাকিনী
ভক্ত হরিদাস ভণে ॥
গানটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গলা ছেড়ে গাইছিল উদ্ধব দাস।
হঠাৎ যেন মনে হল আর একটা বজরা এসে লাগল ঘাটে। বজরার বাইরে লোকজন ছিল। ঘাটে যেন আরও অনেক লোকজন জড়ো হয়েছে। পালকি নিয়ে যেন ত্রিবেণীর ডিহিদারও হাজির রয়েছে। সবাই বেশ সন্ত্রস্ত সন্ত্রস্ত ভাব।
