তা ফৌজদারের সেপাই ঘোড়া ছুটিয়ে এল তো আমার কী! আমি কি খাতক না উঠবন্দি প্ৰেজা যে, বাকি খাজনার দায়ে আমায় নিজামতি-কাছারিতে টেনে নিয়ে যাবে! সচ্চরিত্র কোথায় গেল? সে বেটারই তো যত নষ্টামি। সে বরকে সঙ্গে না-নিয়ে আসে কেন? সে কি নেমন্তন্ন খেতে এসেছে? কোথায় গেল সে?
চেঁচামেচিতে কিছু লোকজন এসে দাঁড়াল। কী হল শোভারাম! বর আসছে না? নয়ান পিসিও গোলমাল শুনে এসে হাজির। দুগগাও এসে সব শুনল। গালে হাত দিয়ে বসল সবাই। সর্বনাশের মাথায়। পা। এখন যদি বর সত্যি-সত্যি না-আসে তো কী হবে। শোভারামের জাত কুল কী করে থাকবে। শোভারামের মেয়ের অবস্থাটা কী হবে! এর পর কেউ কি আর তার হাতের ছোঁয়া জল খাবে! কেউ তার মুখদর্শন করবে? আহা গো, বড় যে তার ভাতারের শখ! সেই তোর কপালেই এমন হতে হয়। চারদিকে মরাকান্নার রোল উঠল। জাত-কুল-জন্ম-ধর্মকর্ম সব যে রসাতলে গেল পোড়াকপালির।
পুরুতমশাইও সব শুনছিলেন। তিনি এবার এগিয়ে এলেন শোভারামের কাছে। বললেন–কী করবে এখন ভাবো বাবাজি, এ তো সহজ কথা নয়–।
শোভারামের তখন আর মাথার ঠিক নেই, বললে–দেখি, সেই সচ্চরিত্র ঘটকবেটা কোথায় গেল, বেটা নামেই সচ্চরিত্র কেবল–
পুরুতমশাই বললেন–তাকে পরে খুঁজলে চলবে, এখন লগ্ন বয়ে যাচ্ছে। মেয়ের সদগতি কীসে হবে তাই আগে ভাবো তুমি গাঁয়ে আর পাত্র নেই?
নতুন পাত্র এক্ষুনি কোথায় পাই?
কেন, হরিশ তো রয়েছে, কুমোরপাড়ার হরিশ জোয়াদ্দার—
শোভারাম আগুন হয়ে উঠল–তার সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে দেব, আপনি বলছেন কী? তার ছটা বউ, তা জানেন–
তা ছ’টা বউ আছে, না-হয় সাতটাই হবে, সে-সব এখন ভাবলে চলে? আগে জাত, না আগে মান!
তার চেয়ে আমার মেয়েকে আমি জলে ডুবিয়ে মারব না! সাতটা নয় পাঁচটা নয়, ওই আমার একটা মাত্তর মেয়ে। আমি কি জেনেশুনে মেয়েকে মেরে ফেলব?
তা হলে তুমি যা ভাল বোঝো তাই করো! তোমার বাড়িতে তা হলে কিন্তু যাগ-যজ্ঞ ক্রিয়াকলাপ সব আমাদের বন্ধ–আমি তা হলে আসি–
শোভারামের মাথায় তখন বজ্রাঘাত হলেও বুঝি ভাল ছিল। তাড়াতাড়ি পুরুতমশাইয়ের সামনে হাতজোড় করে বললে–আপনি আমাকে একটু ভাবতে দিন ঠাকুরমশাই, আমি একবার নিজে গিয়ে দেখি বর আসছে কিনা–
পুরুতমশাই বললেন–কিন্তু লগ্ন তো আর তোমার মেয়ের জন্যে বসে থাকবে না বাবাজি–লগ্ন উতরে গেলে যে মহাসর্বনাশ হয়ে যাবে, তার খেয়াল আছে–
কিন্তু পাত্র তো খুঁজে বার করতে হবে, তাতেও তো সময় লাগে–
পুরুতমশাই বললেন–পাত্রের কি অভাব, ছোটমশাইয়ের অতিথিশালায় গিয়ে একবার খোঁজ করে কাউকে ধরে-বেঁধে নিয়ে এসো না–আগে জাতটা তো রক্ষে হোক, তারপরে না-হয় স্বভাব-চরিত্র বংশকুলুজি দেখবে–
হরিপদর মাথায় আসেনি কথাটা। তাড়াতাড়ি বলে উঠল–তাই যাই দাদা, অতিথিশালাটা একবার দেখে আসি–
বলে আর কারও কথায় কান না দিয়ে হরিপদ সোজা রাজবাড়ির দিকে ছুটল।
*
হাতিয়াগড়ের ছোটমশাইয়ের বাড়িতে অতিথিশালা ছিল। বড়মশাইয়ের আমলেই নতুন করে অতিথিশালাটা সারিয়ে বড় করা হয়। বাংলাদেশের নানা জায়গা থেকে হাঁটা-পথে যে-সব বাউল-ফকির-উদাসী-ভবঘুরে লোক হাতিয়াগড়ে আসত তাদের থাবার জন্যে সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তারা সিধে পেত। মাথাপিছু ডাল-চাল-কাঁচকলা-নুন-তেল কাঠ-হাঁড়ি-মশলা সবই বরাদ্দ ছিল।
বড়মশাইয়ের জগা খাজাঞ্চিবাবুকে রোজকার হিসেব দিতে হত। রামেশ্বর সরকার নিজে গিয়ে সামনে বসে হিসেব বুঝিয়ে দিত জগা খাজাঞ্চিবাবুকে।
আজ ক’জন?
আজ্ঞে, আজ এককুড়ি দু’জন।
তা এককুড়ি দু’জনে আমন চাল খেয়ে ফেললে?
বড়মশাই বলতেন–থাক জগা, ও নিয়ে আর তুমি সময় নষ্ট কোরো না, রামেশ্বর তো মিছে কথা বলছে না।
আজ্ঞে হুজুর, আধমন চালে যে পরশুদিন চল্লিশজন লোক ভাত খেয়েছিল।
তা খাক, দুটো পেটে খাবে তাও দিতে পারব না আমি? পেটেই তো খেয়েছে, কোচড়ে করে তো বাড়ি নিয়ে যায়নি।
আবার এক-একদিন হয়তো কেউ-ই আসত না। সেদিন অতিথিশালা খাখা করত। অতিথিশালার দাসী-মুনিষরা সেদিন কেউ রোদ্দুরে পা ছড়িয়ে কথা সেলাই করত, কেউ বা চাল-ডাল বাছতে বসত। বিরাট রাজবাড়ি। এ-মহল থেকে ও-মহলে যেতে গেলে পাড়া-বেড়ানো হয়ে যায়। কিন্তু এক-একদিন যখন অতিথিশালায় ঝগড়া বাধে সেদিন বাড়ির ভেতরে সকলের কানেই যায়। ঝগড়া বাধে অতিথিদের মধ্যেই। কর্তাভজার সঙ্গে হয়তো ঝগড়া বাধে বলরামভজার দলের। কিংবা সাহেব-ধনীদের সঙ্গে আউলাদের দলের ঝগড়া। কত রকম সাধু কত রকম ধর্ম। ধর্মের বিচার অত সহজ নয়। কর্তাভজারা বলে—’লোকের মধ্যে লোকাচার, সদ্গুরুর মধ্যে একাকার।’
লোকে জিজ্ঞেস করত–আপনি কে গো?
তারা বলত–আমরা কর্তাভজা বাবা–আমরা হলাম বরাতি—
বরাতি মানে?
বাউলরা বলত–ওদের কথা ছেড়ে দাও বাবাজি, ওদের মধ্যে ওইসব আছে, কে গুরু কে বরাতি তাই নিয়ে ওরা মাথা ঘামায়–আমাদের ওসব বালাই নেই–
ওসব নেই বটে, কিন্তু ঝগড়া যখন বাধে তখন হয়তো একটা সামান্য জিনিস নিয়েই বাধে। একই উঠোনের মধ্যে কেউ আলখাল্লা কেচে শুকোতে দিয়েছে, তা আর পাওয়া যায় না। সামান্য একটা আলখাল্লা। ভেঁড়া তালিমারা জিনিস। কারটা একদিন কে গায়ে দিয়ে ভোর-ভোর অতিথিশালা ছেড়ে চলে গিয়েছে। তখন সেই নিয়েই চিৎকার শুরু হয়ে যায়। গলা ছেড়ে চিৎকার করে–যত বেটা চোর-ছ্যাঁচড়ের আমদানি হয়েছে অতিথিশালায়,–সাধু-সন্নিসীদের আর থাকা যায় না এখেনে–
