পিরালি আসতেই নানিজি বললে–শান পিরালি, আমাদের তাঞ্জামের ইন্তেজাম করে দে, আমরা বেরোব
কতদূর যাবেন বেগমসাহেবা?
সে তোকে জানতে হবে না। নিজামতকাছারিতে খবর দিতে হবে ত্রিবেণীর ডিহিদারকে যেন এক্ষুনি এত্তেলা ভেজিয়ে দেয়, আমি যাব। খবরটা না-মালুম থাকবে, কেউ যেন না না পায়, কেউ যেন নিশানা না পায় দেখিস আমি আর মরিয়ম বেগমসাহেবা যাব, শুধু আমরা দু’জন
বাঁদি? খোজা?
নেহি, কোই নেহি যা, দেরি করিসনে, জলদি করতে বলবি, গড়বড় যেন না হয় দেখিস। যা—
পিরালি খাঁ কুনিশ করে চলে গেল।
নানিবেগম বললে–তা হলে তুই তৈরি হয়ে নে মেয়ে আমিও তৈরি হয়ে নিই–
মরালী নানিবেগমকে আনন্দে জড়িয়ে ধরল একেবারে। বললে–তুমি কত ভাল নানিজি! তুমি কত ভাল–সত্যি নানিজি, তুমি কত ভাল
নানিজি বিরক্ত হয়ে উঠল–তুই ছাড় বাপু, তোকে আর অত আদর করতে হবে না–তোর কী? আমার এখন কত ভাবনা বল তো, তুই তো শুধু আমার সঙ্গে গিয়েই খালাস, আমার কত দায়িত্ব বল দিকিনি
মরালী নানিবেগমকে আরও জোরে জড়িয়ে ধরলে। বললে–বা রে, তুমি তা হলে নানিজি হয়েছিলে কেন? নানিজি হলে তো নাতনির ধকল নিতেই হবে।
*
১৭৫৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। বাগবাজারের বাগানবাড়ির ভেতরে তখন ইন্ডিয়ার ম্যাপটিকে নতুন করে নতুন রং দিয়ে আঁকবার তোড়জোড় করছিল কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ। যে-মানুষ ঘরেরও নয়, বাইরেরও নয়, যে-মানুষটার কাছে সমস্ত পৃথিবীটাই তার নিজের দেশ, যে-মানুষ পরের দেশের মানুষকেই আত্মীয় মনে করে নিজের ঘরে আশ্রয় দেয়, সে-মানুষ যখন পৃথিবীর মানচিত্র বদলাবে বলে মনস্থ করে, তখন তাকে ঠেকানো বড় শক্ত। তার কাছে সোলজার না থাকুক, তার কাছে কামানবন্দুক না থাকুক, সে তার উদগ্র ইচ্ছার অসামান্য সম্বল দিয়ে যে অসাধ্য সাধন করতে পারে, তাতে কে সন্দেহ করবে!
যখন খবরটা পেল যে পোয়েট এসেছে, তখন তার সময়ই ছিল না কথা বলবার মতো। তবু কেন কে জানে, পোয়েটকে ভেতরে ডাকতে বললে।
ছোটমশাই উদ্ধব দাসের পেছন পেছন যাচ্ছিল।
কী পোয়েট, তোমার খবর কী?
তারপর পেছনে আর একজন জেন্টলম্যানকে দেখে একটু অবাক হয়ে গেল। কিন্তু ছোটমশাই তার আগেই নিজের পরিচয় দিয়ে দিলে।
আমি এসেছিলুম আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে।
হু আর ইউ?–এ কে পোয়েট?
আজ্ঞে, ইনি হলেন বাবুমশাই, ভারী সজ্জন ব্যক্তি! হুজুরের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।
কোথা থেকে আসছেন আপনি?
আমাকে আপনি চিনবেন না। আমি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের কাছ থেকে আসছি..
কী কাজ?
আপনাকে একটু আড়ালে সে সম্বন্ধে কথা বলতে চাই!
কর্নেল ক্লাইভ ছোটমশাইয়ের দিকে ভাল করে চেয়ে দেখলে। যখন নবাবের সঙ্গে চরম একটা বিরোধ চলছে, ঠিক তখন এ-লোকটা কেন দেখা করতে এল?
ক্লাইভ বললে–পোয়েটের সামনে আপনার বলতে আপত্তি কী! পোয়েট তো এসব পলিটিকসের মধ্যে থাকে না।
উদ্ধব দাস বললে–ঠিক বলেছেন সাহেব, আমি শুধু হরির কথা নিয়ে আছি, এই যে আমার বউ অপরের কাছে আছে, আমি কি তার কথা ভাবছি? আমার যে বউ আমার সঙ্গে কথাই বললে–না, আমি কি সে কথাই ভাবছি?
ক্লাইভ বললে–তোমার খুব মনের জোর আছে পোয়েট, তোমার মতো যদি মনের জোর পেতাম
পাবেন সাহেব, পাবেন, একটু চেষ্টা করলেই পাবেন!
কী করে পাব? আমার নিজের দেশের লোকরা, আমার আত্মীয়রা আমাকে হেট করে, সে-যন্ত্রণা আমি ভুলতে পারি না। তাই তো তোমাদের ইন্ডিয়াতে মরতে এসেছি।
ছোটমশাইও চমকে উঠলেন। জিজ্ঞেস করলেন-মরতে এসেছেন? মরতে এসেছেন মানে?
ক্লাইভ সে কথার উত্তর না দিয়ে উদ্ধব দাসের দিকে চেয়ে বললে–এত মনের জোর তুমি কোথায়। পাও পোয়েট?
ওই যে বললুম, হরির জন্যে! হরি?
হু ইজ হরি? হরি কে?
উদ্ধব দাস বললে–আজ্ঞে, হরি মানেই মানুষ আর মানুষ মানেই হরি—মানুষই আমার গড!
মানুষই তোমার গড? খুব নতুন কথা বলেছ তো হে! তুমি তোমার পোইট্রিতে এই কথা লিখেছ নাকি?
লিখব হুজুর, মহাকাব্য লিখব। রায় গুণাকর যেমন অন্নদামঙ্গল কাব্য লিখেছে, আমি তেমনি একটা কাব্য লিখব আমার বউকে নিয়ে। রায় গুণাকর লিখেছে গড নিয়ে, আর আমি লিখব মানুষের মাহাত্ম্য নিয়ে।
ক্লাইভ কী যেন ভাবতে লাগল খানিকক্ষণ। অনেক ভাবনা মাথার মধ্যে গজগজ করছে। ছাউনির মধ্যে কোম্পানির আর্মির লোকরা হইচই করছে। স্ক্র্যাফটন আর ওয়ালস্ গেছে নবাবের কাছে টুসের টার্ম নিয়ে। সঙ্গে গেছে সেই নতুন মুনশি নবকৃষ্ণ। কিন্তু অত সহজে নবাবকে বশে আনা যাবে না। নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা অত সহজ মানুষ নয়। ফ্রেঞ্চ জেনারেল বুশিকে তলে তলে ডেকে পাঠিয়েছে সাউথ ইন্ডিয়া থেকে। বাইরের দিকে একবার তাকালে ক্লাইভ। তাকিয়ে দেখলে কেউ আসছে কি না। শীতের রাতটা বড় অন্ধকার ঠেকল।
ছোটমশাই বললেন–আপনি বোধহয় খুব ব্যস্ত সাহেব, আপনি যদি বলেন তো না-হয় কাল সকালে আবার আসব।
রাত্তিরে কোথায় থাকবেন?
আমার বজরা আছে ঘাটে। সেখানেই খাওয়াদাওয়া করব, সেখানেই ঘুমোব!
ক্লাইভ বললে–কিন্তু কাল সকালে কী ঘটবে তা আজ বলতে পারছি না-নবাবের ক্যাম্পে আমি আমার এজেন্টদের পাঠিয়েছি।
ছোটমশাই বললেন–আমি সেই নবাবের সম্বন্ধেই কথা বলতে এসেছি।
নবাবের বিরুদ্ধে?
হ্যাঁ।
কী কথা?
ছোটমশাই উদ্ধব দাসের দিকে একবার চাইলেন।
ক্লাইভ বললে–ওকে কোনও ভয় নেই, ও হার্মলেস পোয়েট
