বাঁদি এসে বললে–গোসলখানায় গরম পানি দেব বেগমসাহেবা?
সেকথার উত্তর না দিয়ে মরালী জিজ্ঞেস করলে–নানিবেগমসাহেবা কোথায়?
তারপর তার উত্তরের অপেক্ষা না করে সোজা গেল একেবারে নানিবেগমের মহলের দিকে।
নানিবেগমসাহেবা তখন মসজিদ থেকে নমাজ পড়ে আসছিল। মরালী গিয়ে বললে–সর্বনাশ হয়েছে নানিজি, তোমার মির্জা খুব বিপদে পড়েছে–
তা তুই কী করে জানলি?
এই দেখ নানিজি, কান্ত খত্ লিখেছে
তা এখন কী করবি?
এসবই উমিচাঁদ সাহেবের ফাঁদ নানিজি! আমি ঠিক বলছি এ উমিচাঁদ সাহেবের ফাঁদ। আমি হালসিবাগানে যাব নানিজি! আমি এক্ষুনি যাব
নানিবেগমসাহেবা আলিবর্দি খাঁর সঙ্গে অনেক লড়াই দেখেছে। ঘোড়ায় চড়েছে, উটে চড়েছে, হাতিতে চড়েছে। কতবার নানিবেগমের কানের পাশ দিয়ে কামানের গোলাও চলে গেছে। কতবার জানে মারা যেতে যেতে বেঁচে গেছে। যুদ্ধ কাকে বলে তা নানিজির জানা আছে।
বললে–পাগল নাকি তুই? এই লড়াইয়ের মধ্যে যাবি কী করে?
না নানিজি, তুমি বন্দোবস্ত করে দাও, আমি যাব।
সেখানে কি তুই যেতে পারবি?মুখেই বলছিস, সেখানে গেলে ভয়ে মরে যাবি। আমি কত লড়াইতে গেছি তোর নানাজির সঙ্গে। আমি জানি যে!
তা সব জেনেও আমি কি করে চুপ করে থাকব, বলো! একটা লোককে সবাই মিলে খুন করে ফেলবে আর আমরা এখানে চুপ করে বসে বসে তাই শুনব? আমাদের কি হাত-পা নেই! ওরা যে বদমাইশ লোক নানিজি, ওরা যে শয়তান! আমরাও কি ওদের মতন শয়তানি করতে জানি না?
তা তুই কি সেখানে গিয়ে লড়াই করবি নাকি ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে?
হ্যাঁ নানিজি, আমি লড়াই-ই করব!
নানিজি বললে–তা হলে তুই মরগে যা, আমি যেতে পারব না—
না নানিজি, তুমি চলে!
আমি কিছুতেই যাব না।
মরালী বললে–কিন্তু তুমি না গেলে আমি যাব কী করে নানিজি? আমি একলা কী করে যাব? তোমার তো লড়াইয়ের মধ্যে যাওয়া অভ্যেস আছে–
তা হোক, আমি যেতে পারব না।
তা হলে আমি একলা যাই?
যা, তোর যা খুশি তাই করগে যা!
মরালী বললে–তা হলে সেখানে গিয়ে মরে গেলে তুমি কিন্তু কাঁদতে পারবে না।
নানিজি বললে–আমার কাঁদতে বয়ে গেছে, আমার নিজের তিন-তিনটে মেয়ে বিধবা হল তাই-ই আমি বলে কাঁদলুম না
তা হলে বেশ, আমি যাই! আমি কিন্তু বলে রাখছি আর ফিরব না। আর আমার মুখ দেখতে পাবে না তোমরা।
নানিজি চলে যেতে যেতেও ফিরে দাঁড়িয়ে বললে–সেই জন্যেই তো বলছি তুই যাসনে।
না নানিজি, আমি যাবই। তুমি যাও আর না-যাও, আমি যাবই যাব!
বলে মরালী সোজা নিজের ঘরের দিকে চলে যাচ্ছিল। নানিজি আর পারলে না। বললে–এই মেয়ে, শোন শোন
মরালী তবু শুনল না। যেমন নিজের মহলের দিকে যাচ্ছিল তেমনি চলতে লাগল। নানিজি তার পেছনে আসতে লাগল। তারপর একেবারে নিজের ঘরের মধ্যে এসে মরালী দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছে।
বাইরে থেকে নানিজি বলতে লাগল–ওরে দরজা খোল, আমার কথা শোন—
ভেতর থেকে মরালী বললে–আগে কথা দাও তুমি যাবে আমার সঙ্গে।
যাব রে যাব, তুই আগে দরজা খুলবি তো!
সত্যি যাবে?
হ্যাঁ যাব। কিন্তু কে তোর অভিমানের দাম দেবে বল তো! কে তোকে দেখবে? কার ভরসায় এত আবদার করিস মেয়ে বল তো তুই, আমি কি চিরকাল বাঁচব? আমি মরে গেলে কে তোর মান–
মরালী দরজা খুলে দিলে। নানিবেগম ভেতরে ঢুকে বললে–কী অভিমান শুনি?
বলে মরালীকে ধরতেই মরালী নানিবেগমের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে বললে–আমার যে কেউ নেই নানিজি, আমার যে কেউ নেই। তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে বলল যে, তার কাছে গিয়ে আমি বায়না করব, আবদার করব! আমার মাও নেই, বাপও নেই, ভাইও নেই, সোয়ামিও নেই। তুমি ছাড়া কে আমার দুঃখ বুঝবে বলো? আমি সাধ করে কি কলকাতায় যেতে চাইছি নানিজি! তোমার মির্জাকে যে ওরা মেরে ফেলবে, যেমন করে ওই মেহেদি নেসার, ইয়ারজান, সফিউল্লা আমার সর্বনাশ করেছে, তেমনি করে তোমার মির্জারও যে সর্বনাশ করবে ওরা!
তা মৃত্যুই যদি ওর কপালে থাকে তো তুই কি বাঁচাতে পারবি ওকে?
মরালী বললে–নবাব মরলে যে সবাই মরবে নানিজি! নবাব মারা গেলে যে সব ছারখার হয়ে যাবে! উমিচাঁদ, মিরজাফর সবাই যে ওই ফিরিঙ্গিটার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। এবার যে তোমার চেহেলসতুও চলে যাবে। নবাব মারা গেলে তুমি কেমন করে বাঁচবে তা একবার ভাবছ না?
বাঁদিটা ঘরের দিকে আসছিল। নানিবেগম তাকে দেখতে পেয়ে বললে–পিরালিকে একবার ডেকে দে তো আমার কাছে।
বলে মরালীকে বললে–যাওয়া তো অত সোজা নয় রে মেয়ে, গেলে তার আগে ডিহিদারকে খবর দিতে হবে, সে বজরা তৈরি করে রাখবে, খাওয়াদাওয়ার বন্দোবস্ত করতে হবে, থাকার বন্দোবস্ত করতে হবে, বেগমরা তো আর বাইরে বেরোলেই হল না, বাঁদিদের সঙ্গে নিতে হবে, খোজারা যাবে।
না নানিজি, কাউকেই সঙ্গে নিতে পারবে না। কেউ যেন জানতে না পারে বেগমরা যাচ্ছে। সাজগোজও করব না, যেমন করে গাঁয়ের বউ-ঝিরা বাপের বাড়ি যায়, শ্বশুরবাড়ি যায়, তেমনি করে যাব
তা সঙ্গে একটা বাঁদিও নিবি না?
না! জানি তোমার একটু কষ্ট হবে নানিজি। কিন্তু তোমার মির্জার ভালর জন্যে একটু কষ্টও করতে পারবে না তুমি? না-হয় নিজে একটু কষ্টই করলে, তাতে তোমার কী এমন ক্ষতি হবে? তুমি জানো না নানিজি, ওদিকে বোধহয় যা-হবার তা এতক্ষণে হয়ে গেছে। ফিরিঙ্গিরা তোমার মির্জার ছাউনির ওপর কামানের গোলা ছুঁড়েছে
