যে আমি তোমাকে সব খবর খুঁটিয়ে জানাই। নবাব সত্যিই খুব ক্লান্ত। এবার নবাবের সঙ্গে তয়ফাওয়ালিরা কেউই আসেনি। মুখ দেখে মনে হয় খুব ভাবনায় পড়েছেন নবাব। ঘুমোবার সময়ও আমি কাছাকাছি থাকি। পাহারাদারদেরও আমি পাহারা দিই। ঘুমোতে ঘুমোতে নবাব এক-একবার কী যেন কথা বলেন। ভাল বুঝতে পারি না। মাঝে মাঝে মনে হয়–মিরজাফর আলিকে ডাকছেন। কখনও উমিচাঁদ,কখনও ইয়ার লুৎফ খাঁ। আজকে এখানেই শেষ করি। পরে কী হয় তোমাকে জানাব।
চিঠিটা নিয়ে দেওয়ানখানার দিকে যেতে গিয়েই দেখলে, উমিচাঁদ সাহেব দুজনকে কাছে ডাকলে।
সাহেব দুজন কাছে এল। নকৃষ্ণও কাছে এসে দাঁড়াল।
কী বুঝলেন মিস্টার উমিচাঁদ? নবাব কি কলকাতা ছেড়ে চলে যেতে রাজি হবে?
উমিচাঁদ সাহেবের মুখখানা কথা বলতে গিয়ে যেন বেঁকে গেল।
বললে–নবাবকে তা হলে তোমরা চেনোনি সাহেব। নবাব সিরাজউদ্দৌলা অত সোজা চিজ নয়। ওর মুখ দেখে বোঝবার উপায় নেই মনে মনে কী প্যাঁচ কষছে–
সাহেব দু’জন অবাক হয়ে গেল উমিচাঁদ সাহেবের কথা শুনে। বললে–খুব পাচোয়া লোক নাকি? মুখ দেখে তো কিছু বোঝা যায় না?
উমিচাঁদ সাহেব বললে–হাজি আহম্মদের বংশধর তো, ওদের মুখ দেখে কখনও বোঝা যায়? ওর গ্র্যান্ড ফাদার ওইরকম করে সরফরাজ খাঁ-কে খুন করে গ্রোন নিয়ে নিয়েছিল। ওদের রক্তের মধ্যে ওই গুণ রয়েছে যে
তা হলে কী হবে?
যেন মহা ভাবনায় পড়েছিল সাহেবরা।
ওই দেখলে না সাহেব, তোমাদের রাত্তিরে দেওয়ানখানায় থাকতে বললে! তোমাদের ভাল করে খাইয়েদাইয়ে খাতির করবার মানেটা কী? অত খাতির কি ভাল?
ওয়ালস্ সাহেব জিজ্ঞেস করলে–সত্যি, কেন এত খাতির বলুন তো?
উমিচাঁদ বললে–কাল যে আরও গোলন্দাজ ফৌজ এসে পৌঁছেচ্ছে, তোমাদের কোনওরকমে কাল পর্যন্ত ঠেকিয়ে রাখতে চায়, তারপরেই দুমদাম করে গুলি চালাবে
সাহেবরা ভয়ে ভয়ে দেওয়ানখানার দিকে গেল। দেওয়ানখানার একধারে একটা ঘরে তিনজনের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। সেখানে গিয়ে কী করলে কে জানে। কোনওরকমে দুটি খাওয়াদাওয়া সেরেই দরজা বন্ধ করে দিলে। ঘরের আলো নিভে গেল।
খাসনবিশমশাই বললে–কী গো কান্তবাবু, ডাকের কিছু চিঠি আছে নাকি?
তখন চারদিকের আলোই নিভে গেছে। নবাবও খেয়ে নিয়েছেন। সমস্ত হালসিবাগানটা যেন ভয়ে থমথম করছে। রাত বেশি নয়। শশী এসেছিল। জিজ্ঞেস করলে কী হল ভাই? কিছু খবর পেলে?
কান্ত বললে–যা হল তা তো দেখলে! কালকে আবার কথাবার্তা চলবে।
ছেলেটা যেন বড় মুষড়ে পড়েছিল। আশ্চর্য, এ সংসারে কত লোকের কত রকমের সমস্যা। কান্তর একরকম সমস্যা, শশীর আর এক রকমের। মিরজাফর আলি, জগৎশেঠ, উমিচাঁদ সকলেরই নানারকম সমস্যা। নবাবের আবার অন্যরকম ভাবনা। কেউ চাইছে যুদ্ধ হোক। যুদ্ধ হলে চাকরিটা বজায় থাকবে। যুদ্ধ হলে উমিচাঁদ অনেক টাকা মুনাফা করবে। যুদ্ধ হলে মিরজাফর আলির আবার অন্যরকম লাভ। নবাবকে বিপদে ফেলে লাভ। কারও লাভ নবাবকে বাঁচিয়ে রেখে, কারও লাভ নবাবকে মেরে।
নিজের ঘরে এসে কান্ত আবার আলো জ্বালিয়ে চিঠিটা শেষ করতে বসল–তারপর উমিচাঁদ সাহেবের কথাগুলো শুনে আমার খুব খারাপ লাগল মরালী। আমার ঘুম এল না। তোমার কথা মনে পড়তে লাগল। ভাবলাম তুমি বোধহয় এখন আরাম করে মখমলের বিছানায় শুয়ে ঘুমোচ্ছ। সন্ধেবেলা খাসনবিশ আমায় জিজ্ঞেস করেছিল আমার কোনও চিঠি ডাকে দেবার আছে কিনা। আমি বলেছিলাম না। কারণ তখনও আমার অনেকখানি লিখতে বাকি আছে…
হঠাৎ শশী বাইরে থেকে ডাকলে-কান্ত,কান্ত…।
কান্ত ধড়ফড় করে উঠে পড়েছে। চারদিকে যেন হইচই পড়ে গেছে। সবাই যেন ব্যস্ত! কী ব্যাপার? কী হল হঠাৎ? এত গোলমাল কীসের? কেউ জানে না কী হয়েছিল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। সেই তিনজন লোক দেওয়ানখানা থেকে পালিয়েছে। নবাব তখন ঘুমোচ্ছিলেন। খবর গেল সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কাছে।
ইয়ার লুৎফ খাঁ তৈরিই ছিল বোধহয়।
শশীকে তখন আর দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। তার তখন আর আনন্দের বোধহয় শেষ নেই। সমস্ত হালসিবাগানটা যেন ঘুম থেকে জেগে উঠল রাতারাতি। ফৌজের সমস্ত লোক ইয়া’ ইয়া’ করে চিৎকার করে উঠল। গর্জন করে উঠল একসঙ্গে।
আর সঙ্গে সঙ্গে…
কান্ত চিঠিটা বার করে সেই হট্টগোলের মধ্যে দু’ছত্র তাতে লিখে দিলে। মরালী জানুক। নইলে সে যা মেয়ে, বড় ভাববে। তারপর তাড়াতাড়ি দেওয়ানখানায় খাসনবিশের কাছে গিয়ে হাজির। খাসনবিশ তখন দফতর গুটিয়ে ফেলেছে।
আমার একটা খত আছে খাসনবিশ সাহেব!
কীসের খত? কী লেখা আছে এতে?
আজ্ঞে হুজুর, তেমন কিছু নয়। সারাফত আলি সাহেবকে লিখছি এখানকার কথা, সারাফত আলি সাহেব আমার বাপের মতন তো, শেষকালে আমার জন্যে ভেবে মরবে!
অনেক ধরা করার পর বোধহয় দয়া হল খাসনবিশের। ডাকের থলির মুখটা আবার খুলে তার মধ্যে চিঠিখানা পুরে দিলে। তারপর দফতর গুটিয়ে তল্পিতল্পা গুছোতে লাগল।
সে-চিঠি যখন পরদিন নিজামত কাছারিতে গিয়ে পৌঁছুল, নজর মহম্মদ সেখানা নিয়ে সোজা মরালীর হাতে দিলে।
মরালী পড়তে লাগল–তোমাকে চিঠি লেখা শেষ করে যখন শুতে যাচ্ছি তখন হইহই পড়ে গেল ছাউনির মধ্যে। শশীর ডাকে আমার ঘুম ভেঙে গেল। উঠে শুনি অবাক কাণ্ড। যা ভয় করেছিলাম তাই। সেই স্ক্র্যাফটন আর ওয়ালস্ সাহেব তারা ঘরের আলো নিভিয়ে ঘুমোতে গেল ভেবেছিলাম। কিন্তু তা নয়। আমাদের ফৌজের সেপাইরা যখন নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে পড়েছে, তখন তারা রাত্রের অন্ধকারে লুকিয়ে লুকিয়ে পালিয়ে গেছে। সেই নবকৃষ্ণ মুনশি বলে যে-লোকটা সঙ্গে ছিল, সে-ও তাদের সঙ্গে পালিয়েছে। তারপর আর কী হয়েছে কেউ জানে না। এই একটু আগেই ক্লাইভ সাহেবের গোলন্দাজ ফৌজ আমাদের নবাবের ঘরের পাশেই একটা কামানের গোলা ছুঁড়ে মেরেছে। আর একটু হলেই নবাবের ছাউনির ওপরে পড়ত। তা হলে নবাবও আর বাঁচতেন না, আমিও বাঁচতুম না মরালী। আজ এখানেই শেষ করছি। খাসনবিশ সাহেবকে বলে কয়ে খোশামোদ করে এ-চিঠি পাঠাতে দেওয়ানখানায় যাচ্ছি। দেখি যদি রাজি হয়।
