মুগের ডাল?
হুঁ হুজুর, কেষ্টনগরের মহারাজের অতিথিশালায় মুগের ডালটা এমন করে না, সে খেলে আমি বউয়ের কথাও ভুলে যাই। মুগের ডাল খেতে আমি বড় ভালবাসি যে–
কথা বলতে বলতে একেবারে ক্লাইভ সাহেবের ছাউনির ফটকে এসে হাজির হয়ে গেল।
ফটকে গোরা পল্টন পাহারা দিচ্ছিল। কিছুতেই ঢুকতে দেয় না। ছোটমশাই বললে–বলল, আমি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের কাছ থেকে এসেছি।
গোরা পল্টন ওসব কথা শুনতে চায় না। তার কাছে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্ৰফন্দ্র কেউ নয়। বললে–ঢুকতে দেবার হুকুম নেই কর্নেল সাহেবের
বলে রাইফেল খাড়া করে পথ আটকে রইল।
ছোট মশাই বললেন–এ তো মহা মুশকিল হল দেখছি, আমি অত দূর থেকে দেখা করতে এলুম
উদ্ধব দাস বললে–দাঁড়ান হুজুর, আপনাকে তো ঢুকতে দিলে না, দেখুন আমাকে কী রকম ঢুকতে দেয়
বলে এগিয়ে গেল গোরা পল্টনটার দিকে। বললে–তুমি তোমার কর্নেল সাহেবকে গিয়ে একবার খবর দাও না পল্টন সাহেব
কী খবর দেব? কাউকে ঢুকতে দেবার অর্ডার নেই!
উদ্ধব দাস বললে–বলো গে, পোয়েট এসেছে
পোয়েট?
পল্টনটাও যেন অবাক হয়ে গেল। মিলিটারি ক্যাম্পে আবার পোয়েট কী করতে এল?
হ্যাঁ হ্যাঁ পল্টন সাহেব, পোয়েট! পদ্য লিখি, কাব্য লিখি গো! রায় গুণাকর ভারতচন্দ্র রায়ের নাম শুনেছ তো, তিনি যেমন অন্নদামঙ্গল লিখেছেন, তেমনি আমিও কাব্য লিখছি
গোরা পল্টনটার কী মনে হল কে জানে। ভেতরে চলে গেল। তারপর খানিক পরেই আবার ফিরে এসে বললে–কাম অন–
উদ্ধব দাস ছোটমশাইয়ের দিকে তাকাল। বললে–চলে আসুন হুজুর–চলে আসুন দেখলেন তো, সাহেব আমায় কত খাতির করে? চলে আসুন
*
রবার্ট ক্লাইভের তখন নিশ্বাস ফেলবার সময় নেই। তবু বিপদ আর বিপর্যয়ের মধ্যেও মাথা ঠান্ডা রাখতে তার জুড়িও কেউ নেই তখনকার দিনে। বিপদের মধ্যেই যেন ক্লাইভের মাথাটা হালকা হত বেশি। বিপদের মধ্যেই যেন পুরোপুরি নিশ্বাস ফেলে রবার্ট ক্লাইভ। নইলে সেন্ট ফোর্ট ডেভিডের যুদ্ধের পরই সোজা নিজের দেশে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে পারত পায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে। ওদিকে পাঠান সর্দার দুরানি আহমদ শা আবদালি মথুরা কনকার করে দিল্লির কাছে এসে পড়েছে, সে-খবরটা পৌঁছে গিয়েছিল ক্লাইভের কানে। সেখান থেকে পুব দিকে আসছে তার আর্মি, সেখবরও কানে এসে গিয়েছিল। এ সময় নবাবকে যা বলা হবে তাই-ই সে শুনবে, তাও আঁচ করে নিয়েছিল। আর যুদ্ধটা যদি আরও কিছুদিন ঠেকিয়ে রাখা যায় তবে নবাবেরই লাভ, কোম্পানির লোকসান।
নবাবের কাছে যাবার সময় স্ক্র্যাফটনকে বলে দিয়েছিল চুপি চুপি দেখে আসবে নবাবের ফৌজে কত সোলজার আছে, আর্টিলারি কত, এইসব
তিনজন তো তোক। স্ক্র্যাফটন, ওয়াল আর নতুন মুনশি নবকৃষ্ণ।
ফাস্ট কনডিশন হল নবাবকে কলকাতা ছেড়ে চলে যেতে হবে!
তাতে যে নবাব রাজি হবে না তা তো জানা কথাই। তবু নবাবকে বোঝাতে হবে যে কোম্পানির সদিচ্ছে আছে টুস করতে। কোম্পানি নবাবের সঙ্গে একটা রফা করতে চায় ভয় পেয়ে।
একটা করে কথা বলে স্ক্র্যাফটন, আর সেটা ফারসিতে বুঝিয়ে দেয় নবকৃষ্ণ।
কান্ত চুপ করে নবাবের পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল, সব শুনছিল।
নবাব সব শুনে বললে–ঠিক আছে, আপনারা এখন দেওয়ানখানায় গিয়ে অপেক্ষা করুন, আমি কাল সকালে তপনাদের আমার মতামত জানাব
তিনজনেই বেরিয়ে এল দরবার থেকে। কান্ত দেখলে তিনজনেই খুব ভয় পেয়ে গেছে। উমিচাঁদ সাহেব তিনজনকে নিয়ে বাইরে এল।
শশী বাইরের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ছিল চুপ করে। কান্তকে দেখে তার দিকেই এগিয়ে আসছিল।
কী হল ভাই, কিছু শুনলে? লড়াই হবে?
কান্ত সেকথার উত্তর দিলে না। দু’জন গোরা সাহেব তখন উমিচাঁদ সাহেবের সঙ্গে কথা বলছে। কান্ত কাছাকাছি গিয়ে কান খাড়া করে রইল। সব কথা জানাতে হবে মরালীকে। মরালী চেহেল্-সুতুনের ভেতর চুপ করে বসে থাকবে কান্তর চিঠির জন্যে। দু’দিন খবর দিতে না পারলেই ছটফট করে কান্ত। খবরটা লিখে একটা লেফাফার মধ্যে এঁটে দেয়। তারপর দেওয়ানখানার ভেতরে গিয়ে খাসনবিশের হাতে দেয় লেফাফাখানা।
খাসনবিশ বলে–এত চিঠি কাকে লেখো বাবুসাহেব?
বুড়ো সারাফত আলিকে জনাব। আমার ওপর বুড়োর খুব মেহেরবানি কিনা, চিঠি না পেলে আবার ভাববে বড্ড!
সারাফত আলি তোমার কে বাবুসাহেব? তুমি তো হিন্দু–
কান্ত বলে হিন্দু হলে কী হবে জনাব, সারাফত আলি সাহেব আমার বাপের মতন। আমাকে রোজ রোজ খত্ লিখতে বলেছে
সেই চিঠি নিজামতের চিঠির সঙ্গে ঘোড়ার পিঠে রোজ মুর্শিদাবাদে যায়। ঘোড়ার ডাক মাঝখানে বদলি হয়। এক ঘোড়া থেকে আর এক ঘোড়ার পিঠে ওঠে। তারপর সারাফত আলির নামের চিঠি আবার নিজামত-দফতর থেকে কেমন করে নজর মহম্মদের হাত দিয়ে সোজা একেবারে মরালীর হাতে গিয়ে পৌঁছোয়।
মরালী চেহেল্-সুতুনে বসেই জানতে পারে স্ক্র্যাফটন আর ওয়ালস্ সাহেব দুজনে নবাবের কাছে এসেছিল ফয়সলা করতে। আর উমিচাঁদ সাহেব নবাবকে কেমন করে খোশামোদ করে ভাব করে ফেলেছে। পড়তে পড়তে মরালী কেমন উত্তেজিত হয়ে ওঠে। মনে হয় যদি সম্ভব হত নিজেই চলে যেত হালসিবাগানে।
কান্ত লেখে–এখানে খুব শীত পড়েছে। তোমার কথা খুব মনে পড়ে। এখানে সবাই উৎসুক হয়ে ভাবছে কী হবে! কেউ ভাবছে যুদ্ধ বাধবে, কেউ ভাবছে সন্ধি হয়ে যাবে। যে-দু’জন ফিরিঙ্গি এসেছিল কর্নেল ক্লাইভ সাহেবের চিঠি নিয়ে, তাদের মতলব খারাপ বলে মনে হল। তাদের কথাবার্তার ধরন ভাল লাগল না। তাদের সঙ্গে যে ফারসি জানা মুনশি এসেছিল তার নাম নবকৃষ্ণ। তাকেও খুব শয়তান মনে হল। নবাব তাদের সঙ্গে খুব ভাল ব্যবহার করলেন। এইরকম ভাল ব্যবহার পেয়ে পেয়েই ওরা বড় প্রশ্রয় পেয়ে গেছে। তাদের দেওয়ানখানায় থাকবার ব্যবস্থা হয়েছে। তাদের জন্যে আবার নবাব ভাল খানাপিনার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তুমি থাকলে হয়তো অন্য ব্যবস্থা হত। কিন্তু আমি তো কিছু বলতে পারি না। এমনিতেই সবাই আমাকে সন্দেহ করে। সবাই জিজ্ঞেস করে–আমি কে? আমাকে নবাব কেন পাশে পাশে থাকতে দেন। সবাই আমাকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলে। নবাব না থাকলে আমাকে বোধহয় সবাই খুনই করে ফেলত। আমি কাউকেই কিছু বলি না। আমি শুধু চুপচাপ সব দেখি সব শুনি। তেমন কিছু বিপদ হলেই তোমাকে আমি সব জানাব। আমাকে এখানকার খাসনবিশ সাহেব জিজ্ঞেস করছিল আমি কাকে চিঠি লিখি। সারাফত আলি সাহেব আমার কে? এরা কেউ এখনও জানে
