সেদিন হঠাৎ কে একজন জিজ্ঞেস করলে–তুমি কে?
কান্ত বললে–আমি কান্ত সরকার
কায়স্থ?
কান্ত জিজ্ঞেস করলে–তুমি?
আমি ভাই সদগোপ। আমাদের জল-চল।
কান্ত হেসে উঠল। বললে–ফৌজের দলে আবার কায়স্থ-সদগোপ কী? তোমার নাম কী?
শশী! কাজকম্ম কিচ্ছু পাইনে, তাই নাম লিখিয়েছি সেপাইয়ের দলে। লড়াইটা না হলে আবার চাকরিটা চলে যাবে। লড়াই হবে, না হবেনা? তুমি শুনেছ কিছু? তুমি তো দেখেছিনবাবের কাছাকাছি থাকো। শুনছি নাকি লড়াই করবে না নবাব! শুনে তো ভয় লেগে গেছে। নতুন চাকরি, অনেক কষ্টে চাকরিটা পেয়েছি, লড়াই না-হলে তো চাকরিটাও যাবে ভাই
তা এমন চাকরি নিলেই বা কেন?
নিয়েছি কি সাধে ভাই, টাকা না উপায় করলে খাব কী? বাপের খেতখামার তো কিছু নেই, গতরে খেটে খেতেই হবে!
ছেলেটাকে বেশ ভাল মনে হল। লড়াই বন্ধ হবে শুনলেই দুঃখ হয়। কেবল জিজ্ঞেস করে কিছু শুনলে ভাই তুমি?
কান্ত বলে তুমি তো ফৌজের দলের সঙ্গে থাকো, তুমি কিছু শুনতে পাও না?
শশী বললে–ওরা তো বলে লড়াই হবে না
কেন? হবে না কেন?
শশী বলে–ওরা বলছিল নবাব নাকি যুদ্ধ করতে চায় না। দিল্লি থেকে নাকি আহমদ শা আবদালি বাংলাদেশে হামলা করতে আসছে বলে নবাব একটু দ্বিধা করছে–তুমি কিছু জানো ভাই?
ছেলেটাকে দেখে কান্তর বড় ভাল লাগল। আশ্চর্য, ওর তো ভয় করছে না! কিন্তু বেশিক্ষণ বাইরের লোকের সঙ্গে কথা বলবারও সময় থাকে না। হালসিবাগানে আসার পরদিন থেকেই নানা লোকের সঙ্গে নানা সলাপরামর্শ করছেনবাব। ইয়ার লুৎফ খাঁ, মিরমদন, মোহনলাল, মিরজাফর সবাই যেন খুব ভাবনায় পড়েছে।
উমিচাঁদও থাকে নবাবের সঙ্গে। হালসিবাগানে আসার সঙ্গে সঙ্গে উমিচাঁদ সাহেবনবাবের সামনে এসে লম্বা কুর্নিশ করে দাঁড়িয়েছিল। তারপরে দুজনে একটা ঘরের ভেতরে গিয়ে কী সব কথা বলতে লাগল। সেখানে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হল না। কান্ত বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।
কিন্তু সন্ধে পর্যন্ত কিছুই জানা গেল না।
নবাব বসে ছিল। হঠাৎ বাগানের গেটের কাছে কোম্পানির একটা পালকি গাড়ি এসে দাঁড়াল। ফৌজের লোকেরা রাস্তা ছেড়ে দিলে। অবাক কাণ্ড। রাজা দুর্লভরাম সামনে এগিয়ে গেল।
আসুন আসুন
কান্ত দেখলে গাড়ি থেকে তিনজন নামল। দু’জন ফিরিঙ্গি সাহেব, আর একজন বাঙালি টিকিওয়ালা।
নবাবের সামনে আসতেই রাজা দুর্লভরাম ফিরিঙ্গি দু’জনের জামাকাপড় সব খুঁজে খুঁজে দেখলে। কান্ত নবাবের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল। কুর্তা, ইজের তন্নতন্ন করে দেখে কোথাও কিছু পাওয়া গেল না।
নবাব জিজ্ঞেস করলে–এরা কারা দুর্লভরাম
জাঁহাপনা, এরা কর্নেল ক্লাইভ সাহেবের আর্জি নিয়ে এসেছে–এর নাম স্ক্র্যাফটন—
আর ও?
ওর নাম মিস্টার ওয়ালস
আর ও কে?
দুর্লভরামও জানত না লোকটাকে। গায়ে একটা চাদর, মাথায় টিকি, পায়ে খড়ম। লোকটা বোকার মতো হ করে সব চেয়ে দেখছিল।
সাহেব নিজেই লোকটার পরিচয় দিলে–জাঁহাপনা, এ আমাদের কর্নেলের নতুন মুনশি কর্নেলের খাস মুনশি নবকৃষ্ণ, আমাদের ইন্টারপ্রেটার হিসেবে এসেছে
বোসো।
সমস্ত আবহাওয়াটা থমথম করতে লাগল। নবাবের শ্বশুর ইরাজ খাঁ, মিরমদন, মিরজাফর, উমিচাঁদ সবাই হাজির ছিল।
হঠাৎ কান্তর দিকে বোধহয় মিরজাফর আলির নজর পড়েছে। বললেও কেন এখেনে? উসকো বাহার যানে বোলো
কান্ত বাইরেই চলে যাচ্ছিল। নবাবের কানে গিয়েছিল কথাটা। বললে–না, ও রহেগা—
বাইরে শশী পঁড়িয়ে ছিল। শশী বলে দিয়েছিল–ভেতরে কী হল আমাকে জানিয়ে দিয়ো ভাই, বড় ভাবনায় পড়েছি
কান্ত বলেছিল–কেন, অত ভাবনা করছ কেন? লড়াই হলে তো সকলের পক্ষেই খারাপ
শশী বলেছিল–কিন্তু যদি ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে একটা মিটমাট হয়ে যায় তো আমার চাকরি কি থাকবে, হয়তো ছাঁটাই করে দেবে
কান্ত কথা দিয়েছিল, ঘরে যা যা কথা হবে সব জানাবে। আহা বেচারি! দুটো খেতে পাবে বলে সেপাইয়ের দলে নাম লিখিয়েছে। কিন্তু জানে না, প্রাণে মারা গেলে তখন কে খাবে? তখন কোথায় থাকবে তোর খাওয়া?
হঠাৎ স্ক্র্যাফটন সাহেব কুর্নিশ করে নবাবের সামনে দাঁড়িয়ে উঠল।
নবাব তাকিয়া হেলান দিয়ে বসেছিল। বললে–বলো—
*
ছোটমশাই এসে নামলেন বাগবাজারের পেরিন সাহেবের বাগানের ঘাটে। ঘাট জমজমাট। ইংরেজ ফৌজ ঘিরে রেখেছে সমস্ত জায়গাটাকে। বজরাটাকে ঘাটে বেঁধে ওপরে উঠছিলেন তিনি।
উদ্ধব দাস সঙ্গে ছিল। বললে–অধীনের বড় খিদে পেয়েছে আজ্ঞে
ছোটমশাই রেগে গেলেন তোমার নিজের বউয়ের খোঁজে বেরিয়ে এমন খিদে পায় কী করে শুনি? তুমি তো তাজ্জব লোক
উদ্ধব দাস হাসল। বললে–তা বউ পালিয়ে গেছে বলে কি খিদে পেতেও দোষ হুজুর?
ছোটমশাই থামিয়ে দিলেন। বললেন–তুমি থামো
ঘাট পেরিয়ে যেতেই উদ্ধব দাস বললে–ধরুন হুজুর, আপনার যদি আমার মতো বউ পালিয়ে যেত তো আপনি কি খিদে-তেষ্টা ত্যাগ করতে পারতেন?
বলছি থামো! আবার কথা বলছ?
বরানগর থেকে নৌকো করে বাগবাজারে আসতে কতক্ষণ বা সময় লাগে! কিন্তু ছোটমশাইয়ের মনে হচ্ছিল যেন এক যুগ পার হয়ে গেল। লোকটাও সঙ্গ ছাড়ে না। পথেই খবর পাওয়া গেল ক্লাইভ সাহেব বাগবাজারে গিয়ে উঠেছে।
ছোটমশাই জিজ্ঞেস করেছিল–তুমি কদ্দূর যাবে?
উদ্ধব দাস বলেছিল–আমার কাছে কোনও দূর-দূরান্তর নেই হুজুর, আপনি আমাকে বলুন না, এখনই আপনার সঙ্গে আমি হেঁটে কেষ্টনগর চলে যাচ্ছি, গিয়ে আয়েশ করে মুগের ডাল খাব–
