একদিন গুঞ্জন উঠল–ও লোকটা কে? ওর কী কাজ? ও কেন এসেছে ফৌজের সঙ্গে?
কান্তকে জিজ্ঞেস করলে কান্ত বলে আমি নবাবের খিদমদগার!
তা নবাবের খিদমদগার তো তুমি সব কথায় কান, দাও কেন? তুই কেন সবসময় আমাদের কাছে থাকবি?
তা সে জনাব আপনি নবাবকে বলুন। আমাকে কেন বলছেন?
কিন্তু আশ্চর্য, নবাবকে বলবার সাহস নেই কারও। সেখানে যখন সবাই যায় তখন মাথা নিচু করে থাকে, যেন কত ভক্তি!
তিন-চারটে কামানের গোলা ছুঁড়তেই ওদিক থেকে ফিরিঙ্গিরাও গোলা ছুঁড়তে লাগল। একটা গোলা একেবারে বাবুর্চিখানার পাশেই এসে পড়ল। সমস্ত ছাউনিটা যেন ফেটে চৌচির হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। প্রথমটায় কান্তর কানে তালা লেগে গিয়েছিল। তারপর একটু চেতনা ফিরতেই দেখলে নবাব মাথা থেকে তাজটা সরিয়ে রাখলে। তারপর বললেন–ইয়ার লুৎফ খাঁ-কে ডাকো
দশহাজারি মনসবদার ইয়ার লুৎফ খাঁ তখন ঘামতে ঘামতে এসে কুর্নিশ করে দাঁড়াল।
জাঁহাপনা, কোম্পানির ফৌজ এগিয়ে আসছে।
নবাব বললেন–ফির কামান দাগো
তারপর একটার পর একটা সমস্ত সন্ধেটা শব্দের চোটে অন্ধকার খানখান হয়ে যেতে লাগল। শীতের কুয়াশায় ঢাকা অন্ধকার চিরে গোলাগুলো আকাশের বুকের ওপর ফাটতে লাগল পরপর। কান্ত নবাবের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। মুখখানার দিকে চেয়ে দেখছিল বারবার। মনে হল উত্তেজনায় নবাবের বুকের ভেতরটা ফেটে যেতে চাইছে। কিন্তু মুখে একটাও কথা নেই। শুধু একবার বললেন–একটু শরবত আনতে বলো
নবাবকে দেখে কান্তর মায়া হচ্ছিল। বন্ধ ছাউনির মধ্যে মশার উৎপাত। একটা পাখা দিয়ে কান্ত নবাবকে হাওয়া করতে লাগল। নবাব কিছু বললে–না। মনে হল যেন নবাবের আরাম হচ্ছে। তারপর যখন রাত বাড়ল ওদিক থেকে সমস্ত চুপ হয়ে গেল। আর কোনও সাড়াশব্দ নেই কোম্পানির ফৌজের।
ইরাজ খাঁ ঘরের মধ্যে এসে বললে–আমার মনে হয় এখান থেকে এখন আমাদের সরে যাওয়া দরকার বাবাজি–
কেন? নবাব জিজ্ঞেস করলেন। নবাবের নিজের শ্বশুর ইরাজ খাঁ। ইরাজ খাঁ’র কথা সহজে ঠেলতে পারেন না নবাব।
ইরাজ খাঁ বললে–বুদ্ধ না করে ওদের কাছে না হয় দূত পাঠানো যাক, দেখা যাক না কী উত্তর দেয় ওরা–
কথাটা যেন ভাবিয়ে তুলল নবাবকে। কান্ত চেয়ে দেখলে নবাবের কপালের রেখাগুলো কুঁচকে এল। এতদূর এসে পেছিয়ে যাওয়া! যারা এতদিন তাকে সম্মান দেয়নি, মসনদ পাবার পর একটা নজরানা পর্যন্ত দেয়নি, যারা বরাবর তাকে অগ্রাহ্য করেই এসেছে, সেই শয়তানদের কাছে দূত পাঠানো!
কিংবা এখান থেকে তিন ক্রোশ দূরে নবাবগঞ্জে গিয়ে ওদের মতিগতি লক্ষ করি, জায়গাটা ভাল
ওরা কী বলে? মিরমদন আর মিরজাফরজি?
ওরা বলতে সাহস করছে না তোমাকে, ওরাই আমাকে কথাটা তোমার কাছে তুলতে বলেছে!
কিন্তু ফিরিঙ্গিরা যদি ভাবে আমি ওদের কামানের গোলার ভয়ে পালিয়ে গেছি?
ইরাজ খাঁ বললে–তুমি হলে বাংলার নবাব, তুমি ওদের ভয় পাবে এ কথা কে বিশ্বাস করবে?
তা হলে এখানেই থাকি! এ-জায়গাটার নাম কী?
এটা বরানগর! এখানে চারদিকে জঙ্গল, কাল সকালবেলাতেও যদি কোম্পানির ফৌজ আমাদের ওপর হামলা করে আমরা জঙ্গলের ভেতরে কাউকে যে দেখতেই পাব না।
আর নবাবগঞ্জ?
সেখানে সব ফাঁকা বাবাজি। চারদিকে ফাঁকা জায়গা। খোলা মাঠ।
কান্ত ইরাজ খাঁ’র দিকে চেয়ে লোকটার কথাগুলো বোঝবার চেষ্টা করতে লাগল। তবে কি নবাবের নিজের শ্বশুরও নবাবের বিরুদ্ধে! কিন্তু কান্তর কথা কে শুনবে! কে তার পরামর্শ নেবে।
নবাব রাজি হতেই সমস্ত ছাউনির লোক সেই রাত্রেই আবার চলতে শুরু করল। ত্রিশ ক্রোশ রাস্তা। কোথায় বরানগর আর কোথায় নবাবগঞ্জ। সেখান থেকেই খবর পাঠানো হল কোম্পানির দফতরে। কথাবার্তা করবার জন্যে লোক পাঠাও। তোমাদের সঙ্গে ফয়সালা করবে নবাব।
দুদিন ধরে নবাব সেই নবাবগঞ্জেই অপেক্ষা করলে, তবু কেউ এল না। নবাব রেগে গেল। ফৌজ, হাতি, পাইক, বরকন্দাজ সবাই যেন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এতদূর এসে যুদ্ধ করতে না পেয়ে সবাই যেন খেপে গেল। সেই দিনই আবার মুখোমুখি হামলা করতে হবে ফিরিঙ্গি ফৌজের ওপর।
কিন্তু পথেই কথা উঠল বরানগরে গিয়ে কাজ নেই। সোজা গিয়ে উমিচাঁদের বাগানে উঠলেই ভাল হয়।
কেন?
মিরজাফর আলি বললে–ফিরিঙ্গিদের একটা মওকা দেওয়া ভাল!
কিন্তু উমিচাঁদকে কি এখনও বিশ্বাস করতে বলো? সে ফিরিঙ্গিদের কাছে খুরাকি বেচে টাকা কামিয়েছে! সে তো নিমকহারাম!
ইয়ার লুৎফ খাঁ সব কথা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিল। বললে–জাঁহাপনা, সওয়ানে নেগার খবর এনেছে। আহমদ শা আবদালি দিল্লি হামলা করেছে দিল্লি থেকে তারা বাংলাদেশের দিকে ধাওয়া করছে–
খবরটা শুনে নবাব খানিকক্ষণের জন্যে বিমূঢ় হয়ে রইল। এ-ধরনের আবহাওয়ার সঙ্গে কান্তর কোনওকালে পরিচয় ছিল না। চিরকাল ঠান্ডা প্রকৃতির মানুষ। লড়াই ফড়াইয়ের মধ্যে থাকতে ভাল লাগে না। বন্দুক-কামান জিনিগুলোকে চিরকাল ভয় করে এসেছে। অথচ সমস্ত দিন সেই সবই দেখতে হয়। সকাল থেকে ফৌজের লোকেরা কুচকাওয়াজ করে, শরীরটাকে মজবুত রাখবার জন্যে দৌড়ঝাঁপ করে, আর যখন ছুটি হয় তখন সার সার কলাপাতা পেড়ে ভাত খেতে বসে। হালসিবাগানের মধ্যেখানে হাজার হাজার লোক খেতে বসে। এক-একজন দু’বার-নিবার করে ভাত চেয়ে খায়। ফৌজিকাছারি সঙ্গে সঙ্গে এসেছে। সেখান থেকে টাকা নিয়ে চাল কিনে আনে লোকেরা, সেই চাল এনেসকাল থেকে রান্না শুরু হয়। মাছ হয়, মাংস হয়। কালিয়ার গন্ধে হালসিবাগানের বাতাস একেবারে মাতাল হয়ে ওঠে। কিন্তু খিদে পেলেও তখন খাবার উপায় নেই কাতর। নবাব না খেলে সে খেতে পারে না।
