ওরা কোথায়?
হুজুর, খেতে বসেছেন। ডাকব?
না, ওরা খেতে খেতে আমার মুখ দেখবে না। আমি পরে আসব’খন।
বলে সাহেব চলেই যাচ্ছিল। কিন্তু দুর্গা খবর পেয়েই তাড়াতাড়ি হাত-মুখ ধুয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে।
সায়েব!
দিদির ডাক শুনে ক্লাইভ ফিরল। বললে–তামি জানতুম না তোমরা খেতে বসেছ দিদি, তা হলে আমি ডাকতুম না। কিন্তু দিদি, তোমাদের কথা ভেবেই আমি দৌড়ে এসেছি তোমাদের আর এখানে রাখতে পারলুম না দিদি
ওমা, সেকী? আমাদের আবার কোথায় পাঠিয়ে দেবে?
যেখানে তোক তোমরা যাও, আমার হরিচরণ তোমাদের সঙ্গে যাবে, আরও লোকজন দেব। নবাব এদিকেই আসছে।
আর তোমরা?
আমরা একটু পরেই সোলজার নিয়ে মার্চ করতে শুরু করব, নবাব আসবার আগেই অ্যাটাক করব নবাবের আর্মিকে। হরিচরণ, বিকুইক! এই নে টাকা। দিদিদের যদি কোনও ক্ষতি হয় তো তোকে আর আস্ত রাখব না!
কিন্তু যাব কোনদিকে হুজুর?
যাবি কোনদিকে তাও কি বলে দিতে হবে আমাকে! তা হলে এতদিন আমার সঙ্গে থেকে কী ট্রেনিং পেলি? যেখানে গেলে ওরা সেফ থাকবে সেখানে নিয়ে যাবি। সঙ্গে বন্দুক থাকবে তোর, ডেকয়েটরা যদি চুরি করতে আসে ফায়ার করবি। তোমার কিছু ভয় নেই দিদি, যেখানেই তুমি যাও, আমি ঠিক খবর নেব তোমার, আমার জন্যে ভেবো না। আমি মরব না–
কথাটা বোধহয় তখনও ভাল করে শেষ হয়নি। হঠাৎ দূর থেকে নবাবের আর্মির মশালের আলো দেখা গেল। ক্লাইভ সাহেব আর দাঁড়াল না। দৌড়োতে দৌড়োতে আবার চলে এসেছে আর্মির মধ্যে। সবাই তৈরিই ছিল। সেখানে গিয়েই চিৎকার করে উঠল–ব্যাটালিয়ন!
ওদিকে ছোট ঘরখানার মধ্যে নবকৃষ্ণ স্ক্র্যাফটন সাহেবের মুখের দিকে একবার চাইলে। এখনও তো সাহেব আসছে না!
জিজ্ঞেস করলে সাহেব কোথায় গেল হুজুর?
স্ক্র্যাফটন সাহেব বললে–তুমি কার লোক? কে পাঠিয়েছে তোমাকে? কী করে কর্নেল সাহেবের নজরে পড়লে তুমি?
নবকৃষ্ণ বললে–হুজুর, সবই মায়ের দয়ায়।
মা? ইয়োর মাদার?
ইয়েস স্যার, আমার মা। মাদার সিংহবাহিনী!
হু ইজ সিংহবাহিনী?
আমার ইষ্টদেবী হুজুর। মাদারের কাছে আমি রোজ প্রে করি হুজুর, যেন কোম্পানির ভাল হয়, কোম্পানি যেন নবাবকে হারিয়ে হিন্দুস্থানের কিং হয়। দেখবেন হুজুর, মাদার আমার মনোবাসনা পূর্ণ করবেন!
কথাটা শেষ হবার আগেই বাইরে কানফাটানো একটা শব্দ হল। সঙ্গে সঙ্গে আর একটা শব্দ। রবার্ট ক্লাইভের গলার শব্দও শোনা গেল। সমস্ত শব্দ ছাপিয়ে ক্লাইভের গলা তখন চেঁচাচ্ছে ব্যাটালিয়ন, ফায়ার-ফায়ার–
স্ক্র্যাফটন দরজা খুলে দৌড়ে বাইরে চলে গেল। নবকৃষ্ণর বুকটা তখন দূরদূর করে কাঁপছে।
২.০৯ নবাব সিরাজউদ্দৌলার ছাউনি
হালসিবাগানে উমিচাঁদের বাড়ির বাগানের ভেতরে তখন নবাব সিরাজউদ্দৌলার ছাউনি পড়েছে। হাজার হাজার লোকের রান্নার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। সামনে তিন সার সেপাই পাহারা দিচ্ছে। তার পেছনে গোলন্দাজ, তার পেছনে অনেক দূরে আমির-ওমরাওদের ছাউনি।
দূর থেকে কাউকে দেখলেই বন্দুক উঁচিয়ে ধরে পায়দল ফৌজ। কুয়াশার মধ্যে ভাল করে দেখা যায়, তবু উঁচিয়ে ধরে।
বলে–উই আসছে শালারা–উই আসছে
কেউই আসে না। আসলে নবাবের ফৌজের সামনাসামনি আসার কারও সাহসই নেই। মুর্শিদাবাদ থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ত্রিবেণী পেরিয়ে আসতে কি কম সময় লাগে।
সকাল হতে-না-হতেই কান্ত ছাউনি থেকে বেরিয়ে চারদিকে চেয়ে দেখলে। আকাশটা কুয়াশায় ঢাকা। যেন ঢাকাই চাদর দিয়ে সবকিছু ঢাকা। কদিন ধরে হাঁটাহাঁটি চলেছে। দিন নেই রাত নেই কেবল হাঁটা। কোথায় সেই মুর্শিদাবাদ, আর কোথায় কলকাতা! নবাবের ফৌজের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে একেবারে সোজা বাগবাজারে পেরিন সাহেবের বাগানের কাছে এসেই ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে মুখোমুখি মুলাকাত। তখন রাত হয়েছে বেশ। অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যে ছাউনি পড়ল। কান্ত একেবারে নবাবের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। কে কী বলছে, কে কী করছে, কে কী ভাবছে সব বোঝবার চেষ্টা করছিল, জানবার চেষ্টা করছিল। মরালী বলে দিয়েছিল কান্তকে–সবসময়ে নবাবের কাছে থাকবে।
কান্ত বলেছিল–কিন্তু আমাকে যদি নবাব কাছে থাকতে না দেয়?
মরালী বলেছিল–দেবে, তোমাকে থাকতে দেবে-নবাবের সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে
কান্ত বলেছিল–বশির মিঞা যদি কিছু বলে? আমাকে সে যে উমিচাঁদের বাড়ি যেতে বলেছিল দরবার খাঁ’র খোঁজ করতে
মরালী বলেছিল–তা তুমি আমার কথা শুনবে, না বশির মিঞার কথা শুনবে?
তোমার কথা শুনব মরালী, তোমার কথাই আমি শুনব! তুমি যা বলবে তাই করব। তোমার জন্যে আমি সব করতে পারব। তুমি শুধু বলে দাও আমাকে কী কী করতে হবে।
তোমাকে শুধু নবাবের পাশে পাশে থাকতে হবে, দেখবে যেন নবাবের কোনও ক্ষতি না হয়। কে কী বলছে, কে কী করছে, সব দেখবে, তারপর আমাকে জানাবে, আমাকে সেখান থেকে খবর দেবে!
এমনি করেই নবাবের ফৌজের দলের সঙ্গে কান্ত এসেছিল।
একদিন দশহাজারি মনসবদার ইয়ার লুৎফ খাঁ জিজ্ঞেস করেছিল–তুমি কে? তুম কৌন?
মনসবদার সাহেব দেখত লোকটা সবসময় নবাবের পাশে পাশে থাকে। নবাবও যেন লোকটাকে বিশ্বাস করে। যখন ছাউনির মধ্যে নবাব সকলকে ডেকে কথা বলে, সকলের সঙ্গে পরামর্শ করে, তখন অন্য পাহারাদারদের সঙ্গে সেও থাকে। তার সামনে নবাব গোপন কথা বলতেও দ্বিধা করে না। যখন বরানগরে এসে একেবারে কোম্পানির ফৌজের মুখোমুখি হল, তখন পরামর্শ হচ্ছিল সকলের সঙ্গে। ইয়ার লুৎফ খাঁ ছিল, মিরজাফর আলি ছিল, মেহেদি নেসার ছিল, ইয়ারজান, মোহনলাল, মিরমদন সবাই ছিল। কেউ বললে–কামান দাগতে, কেউ বললে–কোম্পানির ছাউনিতে দূত পাঠাতে, কেউ বললে–পিছু হটে নবাবগঞ্জে যেতে। কেউ বললে–কোম্পানির ফৌজে ষাট হাজার গোরা পল্টন আছে, কেউ বললে–বিশ হাজার, কেউ বললে–দশ হাজার। সে এক বিপজ্জনক অবস্থা। কান্ত তখন চুপ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব শুনত। কত রকম লোক কান্ত জীবনে দেখেছে। বেভারিজ সাহেব, ষষ্ঠীপদ, ভৈরব, সারাকত আলি, বাদশা, সচ্চরিত্র পুরকায়স্থ, বশির মিঞা, বশির মিঞার ফুপা মনসুর আলি মেহের সাহেব। কিন্তু এরা সব অন্যরকম। কিন্তু অন্যরকম হলেও ভেতরে ভেতরে যেন সবাই এক। এতদিন এদের নামই শুনে এসেছে, এতদিন এদের ভয়ই করে এসেছে, এতদিন হয়তো এদের শ্রদ্ধা ভক্তিও করে এসেছে। সম্মানে, প্রতিষ্ঠায়, প্রতিপত্তিতে এরা তো সকলের চেয়ে বড়ই। কিন্তু এতদিনে বুঝল যাদের সে দূর থেকে দেখেছিল, তাদের কাছাকাছি আসতে তারা যেন সবাই ছোট হয়ে গেল। সবাই কেবল নিজের নিজের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত। ওর দুটো চাকর, আমার কেন একটা চাকর থাকবে। ওর তিনটে বাঁদি, আমার কেন একটাও বাঁদি থাকবে না। কারও খাওয়াদাওয়ার কিছু ত্রুটি হলে গালাগালি দেয় বাবুর্চিকে। খেদমত করতে গাফিলতি করলে বান্দাদের চড়-চাপড় খেতে হয়। অথচ এরাই তো দেশের হর্তাকর্তা-বিধাতা।
