আর তোমার সায়েব?
সায়েব খুব ব্যস্ত দিদি! পল্টনরা সব সেজেগুজে তৈরি হয়ে নিচ্ছে, লড়াই হবে কিনা?
দুর্গার মাথাটা ঘুরে গেল। বললে–লড়াই হবে কী গো! লড়াই হলে আমরা যাব কোথায়?
মনে হল হরিচরণ যেন বেশ ভয় পেয়েছে। সেও যেন বেশ ভাল্লায় পড়েছে। তবু নামতে হল বাগানে। পেরিন সাহেবের বাগানে ঘর-দোর অনেক। এককালে পল্টন-মশকর সব থাকত। এখানেই আগে একদিন বড় রকমের একটা লড়াই হয়ে গেছে। বড় বড় সব গাছ চারদিকে। পাশেই গঙ্গা। ইচ্ছে করলে রোজ গঙ্গাস্নান করতে পারবে ওরা।
দুর্গা আর বউরানি একটা ঘরে গিয়ে ঢুকল। ঘরটা একেবারে একটেরে। ওদিকের পল্টনদের হইচই কানে আসে না। হরিচরণ বললে–তোমরা একটু বোসো এখেনে, আমি তোমাদের খাবারদাবারের বন্দোবস্ত করে আসছি
কিন্তু তবু যেন হরিচরণের কথায় বিশ্বাস হল না। কোথায় নবাবের সঙ্গে এরা যুদ্ধ করবে, তা নয়, মেয়েমানুষ নিয়ে এদের আর এক বিড়ম্বনা।
সত্যিই বিড়ম্বনা। বাগানের ভেতর আর একখানা বন্ধ ঘরে তখন ক্লাইভ আর একজনের সঙ্গে চুপি। চুপি কথা বলছে।
লোকটার পায়েও জুতো নেই। গায়ে শুধু একটা উড়ুনি। মাথার পেছন দিকে একটা টিকি!
তোমার কী নাম বললে?
হুজুর, নবকৃষ্ণ!
নবকৃষ্ণ! নবকৃষ্ণ! ক্লাইভ যেন নামটা উচ্চারণ করে নিজের জিভটাকে সড়োগড়ো করতে চাইলে। লোকটার দিকে আবার ভাল করে চেয়ে দেখলে। গরিব লোক। লোকটার জীবনের ইতিহাস শুনেও অবাক হয়ে গেল ক্লাইভ।
হ্যাঁ হুজুর, সাহেবদের কোম্পানিতে কাজ করতে আমার বড় সাধ! আমার বড় সাধ আমি কোম্পানির সেবা করি।
কত টাকা মাইনে চাও?
আজ্ঞে, হুজুরদের শ্রীচরণে আশ্রয় পেলেই আমি ধন্য হয়ে যাব, আমি মাইনে চাই না।
অদ্ভুত লোকটা। রবার্ট ক্লাইভ যেন লোকটার মধ্যে নিজেকেই দেখতে পেয়েছিল সেদিন। তারই মতো একটা অনাথ ছেলে। ত্রিভুবনে কেউ নেই। শুধু নিজের পায়ে মাটির ওপর দাঁড়াবার মতো একটা আশ্রয় পেলেই খুশি। সুতোনুটির গঙ্গার ঘাটে কোম্পানির জাহাজগুলো পাল তুলে এসে থামে, আর ছেলেটা ঘাটের কাছে এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। সাহেবদের জাহাজ থেকে নামতে দেখলেই সেলাম করে। গুড মর্নিং করে। কেউ যদি কোনওরকমে একটা চাকরি দেয় কোম্পানির দফতরে তো খেতে পরতে পায়!
তারপর?
যেন রবার্ট ক্লাইভের নিজের সঙ্গেই মিলে যাচ্ছিল। এই লোকটাই পারবে। একে দিয়েই কাজ উদ্ধার হবে। মনে মনে সব ঠিক করে ফেলেছিল। আর শুনছিল কথাগুলো। উমিচাঁদ লোকটা জহুরিই বটে। বেছে বেছে ঠিক লোককেই পাঠিয়ে দিয়েছে।
হঠাৎ হরিচরণ ঘরে ঢুকল। সাহেবের ঘরে হরিচরণের অবাধ গতি!
হুজুর, ওদের এখেনে এনে তুলেছি। খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। ওরা ভয় পাচ্ছেন, বলছেন লড়াই হলে ওদের কী হবে! আমি বলেছি কিছু ভয় নেই। বুঝিয়ে সুঝিয়ে হুজুরের কাছে এসেছি।
ক্লাইভ সাহেব কিছুক্ষণ ভাবলে। বললে–তুই যা, আমি কাজ সেরে যাচ্ছি এখুনি
হরিচরণ চলে যাচ্ছিল। সাহেব বললে–কলকাতার কেল্লা থেকে পল্টনরা এসে পৌঁছেছে?
আজ্ঞে এখনও আসেনি হুজুর।
আসার খবর আর দিতে হল না। ওদিক থেকে তখন বিউগল বাজাতে বাজাতে পল্টনরা এসে পড়েছে। পেরিন সাহেবের বাগানের বাইরে মশালের আলোতে সব আলোময় হয়ে উঠেছে।
তা হলে আমি কি বসব হুজুর?
সাহেব বললে–বোসো, তোমাকে আমি আজ থেকেই চাকরি দিলুম। কলকাতার কেল্লা থেকে আমাদের আর্মি আসার কথা, তারা না আসাতে ভাবছিলুম খুব
সাহেব ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বাইরের বারান্দায় দাঁড়াল। ওয়াটসন তা হলে কথা রেখেছে। মোট দাঁড়াল পাঁচশো গোরা পল্টন, সাড়ে পাঁচশো গোরা লশকর, আটশো দিশি সেপাই, ষাটজন গোরা গোলন্দাজ আর দুটো কামান।
সামনে এসে দাঁড়াল স্ক্র্যাফটন। হাতে অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের নোট। ক্লাইভকে স্যালিউট করে চিঠিটা এগিয়ে দিলে। ক্লাইভ বললে–এসো, ভেতরে কে আছে দেখো
কে?
ক্লাইভ বললে–আমার নতুন ক্লার্ক
নবকৃষ্ণ চুপ করে ঘরের ভেতরে বসে ছিল। দুজন সাহেব ভেতরে ঢুকতেই উঠে দাঁড়াল।
এই আমার নতুন ক্লার্ক। ফারসি-জানা মুনশি!
কিন্তু আমাদের ক্লার্ক রামচাঁদ তো আছে। সেও তো ফারসি জানে! আবার একে কেন রাখলেন কর্নেল?
আছে, দরকার আছে। ওদিককার কী খবর আছে বলো? নবাবের সঙ্গে আমি কত আছে?
স্ক্র্যাফটন বললে–খবর পেয়েছি ওদের সঙ্গে আছে আঠারো হাজার ক্যাভালরি, ফিফটিন থাউজ্যান্ড সোলজার, পঞ্চাশটা এলিফ্যান্ট আর চল্লিশটা ক্যানন
কথাটা শুনে কেমন যেন চুপ করে রইল সাহেব কিছুক্ষণ! তারপর দাঁড়িয়ে উঠল।
বহুদিন আগে সেন্ট পোর্ট ডেভিডের সোলজাররা একদিন এই লোকটার আসল মূর্তি দেখেছিল। স্ক্র্যাফটন আর নবকৃষ্ণ সে-মূর্তি দেখেনি। কিন্তু দেখলে, এক মুহূর্তে যেন চেহারাটা হঠাৎ বদলে গেল। বাইরে মশাল জ্বালিয়ে গোরা পল্টনের দল বিউগল বাজাচ্ছে তখনও।
কী, ভয় পাচ্ছ মুনশি?
নবকৃষ্ণ ভয় পেয়েছিল মনে মনে। কিন্তু মুখে বললে–আমি হুজুরের সারভেন্ট স্যার
সাহেব বললে–তা হলে স্ক্র্যাফটন, তুমি আমার অর্ডার জানিয়ে দাও আর্মির লোকদের, আজকেই এখুনি মার্চ শুরু হবে
তারপর বললে–আমি একটু ওদিক থেকে আসছি
বলে সোজা বারান্দা পেরিয়ে, বাগান পেরিয়ে একেবারে গঙ্গার পাড়ের ওপর ঘরখানার দিকে দৌড়ে গেল সাহেব। হরিচরণ সাহেবকে দৌড়ে আসতে দেখে অবাক হয়ে গেছে।
