সাহেব বললে–দিদি, এদিকে একটা ডেঞ্জার হয়েছে, নবাব আসছে কলকাতায়, আমি তো ফৌজ নিয়ে নবাবের মোকাবিলা করতে যাচ্ছি–
তার মানে? তুমি আর ফিরবে না?
ফিরব না তো বলিনি। বলছি নবাবের সঙ্গে একটা বোঝাঁপড়া করতেই হবে এবার। আর ঠেকানো গেল না। কিন্তু তোমাদের কথা ভেবেই একটু অস্থির হচ্ছি
কোথায় লড়াই হবে! এখেনে নাকি?
যে রবার্ট ক্লাইভকে ফৌজের লোকরা এত ভয়, করে, যে রবার্ট ক্লাইভের নামে মুর্শিদাবাদের নবাব-নিজামত পর্যন্ত থরথর করে কাঁপে, যার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে আমির-ওমরাওরা পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে লুকিয়ে লুকিয়ে পরামর্শ করে, সুদূর করমণ্ডল উপকূল থেকে শুরু করে বাংলার প্রত্যন্ত প্রদেশ পর্যন্ত যে-রবার্ট ক্লাইভের নাম ছড়িয়ে গেছে অত্যাচারের প্রতিভূ হিসেবে, সেই লোকটাই যখন আবার দুর্গার সামনে দাঁড়ায়, ছোট বউরানির কাছে আসে, তখন সে যেন একেবারে ঘরের ছেলে হয়ে যায়।
তা হলে আমি চললুম দিদি, তোমরা এখানে থাকতে পারবে তো?
কিন্তু সাহেব, তুমি যদি আর না ফেরো?
ফিরব না মানে?
বলা তো যায় না কিছু বাবা, গুলি-গোলা নিয়ে লড়াই করতে যাচ্ছ, মারা যেতে কতক্ষণ!
সাহেব হেসে উঠল–আমি অত সহজে মরব না দিদি, মরলে অনেক আগেই মরে যেতুম! দুদু বার পিস্তল ছুঁড়েছি নিজের বুক লক্ষ্য করে, তবু যখন মরিনি তখন আর মরব না আমি চলি দিদি
দুর্গা অবাক হয়ে গেল। বললে–তুমি চললে কী গো, তা হলে আমরা কোথায় যাব? এখানে আমাদের দেখবার কে থাকবে?
সাহেব বললে–তা হলে না-হয় আমার সঙ্গে চলো!
তোমার সঙ্গে কোথায় যাব গো? তোমরা তো লড়াই করবে, তোমাদের সঙ্গে আমরাও কি লড়াই করতে গিয়ে মরব নাকি? তার চেয়ে আমাদের বাপু যেমন করে তোক হাতিয়াগড় পৌঁছে দাও, মরতে হয় আমরা নিজের দেশে গিয়ে মরব।
সাহেব বললে–হাতিয়াগড়ে এখন এই অবস্থায় তোমাদের পাঠাই কী করে? কোন রাস্তায় কখন কী হয় কে বলতে পারে?
তারপর একটু ভেবে বললে–তার চেয়ে আমাদের তো পল্টন-লশকর-সেপাইরা সব যাচ্ছে, আমাদের সঙ্গেই চলোরাস্তাঘাট ঠিক আছে বুঝলে তোমাদের দেশে পাঠিয়ে দেব
তোমরা কদ্দূর যাবে?
তা কি আগে থেকে বলতে পারা যায় দিদি, নবাব তো ত্রিবেণী পর্যন্ত এসে গেছে, আমরাও পল্টন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে মোলাকাত হয় সেখানেই লড়াই বেধে যাবে।
দুর্গা সব শুনে একটু ভাবলে। বললে–তারপর?
তার পরের কথা আমিও জানি না, কেউ জানে না। এখানে তোমরা একা থাকার চেয়ে তো সেই ভাল! এখানে সেদিন কী কাণ্ডটা হয়েছিল বলে তো! আমি সেই সময়ে না এসে পড়লে সেই স্পাইটা তো তোমাদের সর্বনাশ করত!
সে-লোকটার শেষপর্যন্ত কী হল বাবা?
সাহেব বললে–কী আর হবে, স্পাইটাকে গুলি করে মারলুম!
দুর্গা চমকে উঠল–জ্যান্ত লোকটাকে গুলি করে মারলে তোমরা?
তা মারব না! ও যে স্পাই দিদি!
কী সর্বনাশ, গুলি করতে তোমাদের একটু বাধল না গো?
সাহেব হেসে উঠল। বললে–কত হাজার হাজার লোককে গুলি করে মেরেছি এই হাত দিয়ে তা তো গুনে রাখিনি!
কী করে মারো বাবা তোমরা? তোমাদের প্রাণে একটু মায়া-দয়া নেই! মারতে হাত কাঁপে না তোমাদের? তোমার চেহারা দেখে তো বাপু বোঝা যায় না তুমি আবার লোক খুন করতে পারো!
সাহেব বললে–আমি তা হলে আসি দিদি, তোমাদের জন্যে সব ব্যবস্থা করে আমি তোক পাঠিয়ে দিচ্ছি, হরিচরণ এলেই তোমরা তার সঙ্গে চলে যাবে
তা এমনি করেই সেদিন হঠাৎ আস্তানা গুটিয়ে নিয়ে ক্লাইভকে চলে যেতে হয়েছিল বরানগর ছেড়ে। সেসব ক্লাইভের মনে ছিল। সে-দিনগুলো স্মৃতির খাতায় চিরকাল জ্বলজ্বল করত কর্নেল ক্লাইভের। বিকেল-বিকেল রওনা দিয়েছিল পল্টনরা। ক’টাই বা পল্টন। নবাব যদি ইচ্ছে করে তো পিষে মেরে ফেলতে পারত সে ক’জনকে। দল বেঁধে সার সার পল্টনরা চলেছে। পল্টনদের দেখে গাঁ থেকে দলে দলে তোক পালাচ্ছে। খেত-খামার ছেড়ে লোকগুলো সব কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেল।
গোরুর গাড়ির ভেতরে বসে ছোট বউরানি বাইরের দিকে চেয়ে দেখছিল। গাঁ-গঞ্জে কেউ কোথাও নেই। শীতকালের বেলা। দেখতে দেখতে অন্ধকার হয়ে আসে। চারদিক দেখলে ভয় হয়।
দুর্গা সাহস দিলে। বললে–ভয় কী? আমি তো সঙ্গে রয়েছি
বউরানি বললে–আমি তো আর ভরসা পাচ্ছিনে দুগ্যা কোথায় কোথায় সাহেবের সঙ্গে ঘুরছি : বল দিকিনি আবার কোথায় আমাদের নিয়ে যাচ্ছে কে জানে! একটা মেয়েছেলের মুখ পর্যন্ত দেখতে
পাচ্ছিনে, সব পল্টন–
তা মেয়েছেলে না-ই বা রইল, আমি তো আছি, সাহেব তো আছে!
বউরানি বললে–সায়েবই বা কোথায়, তার তো টিকিই দেখা যাচ্ছে না–
তা বরানগর থেকে বাগবাজার কি কম রাস্তা! কেবল বন-জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাওয়া। গাড়ির ছইয়ের ভেতর পরদা দিয়ে ঢাকা। গাড়োয়ানের মুখখানা পর্যন্ত দেখা যায় না। চলতে চলতে এক জায়গায় গিয়ে গাড়ি থামল।
এ কোথায় নিয়ে এল গো আমাদের? ও দুগ্যা, এ যে জঙ্গল রে—
দুর্গাও তখন পরদাটা তুলে বাইরে চেয়ে দেখছে। তখন রীতিমতো ঘুটঘুঁটে রাত। গাড়িটা থামতেই হরিচরণ এল। বললে–নেমে পড়ো দিদি, নেমে পড়ো
এ আমাদের কোথায় নিয়ে এলে হরিচরণ? এখেনে কোথায় থাকব?
হরিচরণ বললে–কেন? এ তো বাগবাজারের পেরিন সাহেবের বাগান, এখেনে তোমাদের কোনও ভয়-ডর নেই, ঘরদোর সব আছে, চান করা-খাওয়াদাওয়ার সব বন্দোবস্ত আছে।
