তাঞ্জাম যখন মতিঝিলের ফটক পেরিয়ে আবার চকবাজারের রাস্তায় পড়ল তখন নবাবি ফৌজ তৈরি হয়ে নিয়েছে। সেই ভোরবেলাই নহবতের টোড়ির রাগের সঙ্গে ফৌজি কাড়া-নাকাড়ার খাদ মিশে তুমুল হট্টগোল শুরু করে দিয়েছে। আর সারা মুর্শিদাবাদ সেই হট্টগোলেই ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছে।
*
ছোটমশাইয়ের বজরা যখন বরানগরের ঘাটে পৌঁছোল তখন বিকেল হয়ে গেছে। শীতকাল। জঙ্গুলে জায়গা, আশেপাশে কোথাও কোনও লোকজনের দেখা নেই, কোথায় ফিরিঙ্গি কোম্পানির কর্নেল সাহেবের ছাউনি তাও জানা নেই। ছোটমশাই বজরা থেকে নেমে ঘাটে উঠলেন। ঘাটের উপরেই একটা ভাঙা পোডো মন্দির। এককালে ওলন্দাজরা ছিল এ জায়গাটায়। ইংরেজ ফিরিঙ্গিরা আসার পর তারা হুগলির দিকে চলে গিয়েছে।
রাস্তায় চলতে চলতে একজনের সঙ্গে দেখা হল।
ছোটমশাই জিজ্ঞেস করলেন–ওগো, ও মশাই
লোকটা কাছে এল। ছোটমশাই জিজ্ঞেস করলেন–এখানে ফিরিঙ্গি কোম্পানির ছাউনিটা কোথায় বলতে পারো? পল্টনরা থাকে?
লোকটা বললে–আজ্ঞে, আরও পোটাক রাস্তা পেরোতে হবে
সেখানে ক্লাইভ বলে একজন ফিরিঙ্গি ফৌজি বড়সাহেব থাকে?
লোকটা বললে–তা জানিনে হুজুর–থাকতে পারে।
তা তোমরা এতদিন এখেনে আছ, আর ফিরিঙ্গি ফৌজের খবর রাখ না!
হুজুর, আমরা ওসব খবর রাখব কী, ফিরিঙ্গিদের মাল কেনা-বেচা করতে মানা করে দিয়েছে। সরকার!
বলে লোকটা যেদিকে যাচ্ছিল সেইদিকেই চলে গেল। চাষি লোক, হাতে একটা পাঁচনবাড়ি। সাপখোপের ভয়ে পাঁচনবাড়ি নিয়ে পথ চলছে। আরও ওদিকে লম্বা আকাশ-ছোঁয়া ধানখেত। নতুন ধান বুনেছে গাঁয়ের লোকেরা।
ছোটমশাই যেন দিশেহারা হয়ে গেলেন। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র যে নিশানা দিয়েছিলেন সেই নিশানা ধরেই চলেছিলেন। কিছু দূর গিয়েই মনে হল অনেকগুলো গোলপাতায় ছাওয়া চালাঘর। ওইগুলোই বোধহয় ফৌজি ছাউনি। ফিরিঙ্গিদের পল্টন-লশকররা বোধহয় ওইখানেই থাকে। কিন্তু কাছে গিয়ে কারও দেখা পেলেন না। সব ফাঁকা পড়ে আছে। ঘর-দোর নির্জন। মাটির এঁটো হাঁড়িকুড়ি ভাঙাচোরা অবস্থায় ছড়িয়ে আছে। গেল কোথায় সব! ঘর-দোর সমস্ত ছেড়ে গেল কোথায় সব! দু-চারটে কুকুর ভাতের লোভে ছোঁকছোঁক করে ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে-সেখানে। ছোটমশাইকে দেখে একটু বোধহয় ভয় পেল। তারপর আবার এটো ভাতের হাঁড়ি চাটতে লাগল।
ওদিক থেকে আর একটা লোক আসছিল।
ছোটমশাই তাকেও ডাকলেন–ওগো, ও মশাই, শুনছ—
লোকটা পাগল কচ্ছমের বলে মনে হল। কাছে এসে বললে–আমি মশাইনই গো, মশাইনই আমি।
তবে তুমি কে?
এজ্ঞে আমি হরির দাস উদ্ধব দাস।
তুমি ফিরিঙ্গি-পল্টনের লোক?
না বাবুমশাই, ফিরিঙ্গি-পল্টনের লোক হতে যাব কোন দুঃখে? আমি হরির লোক।
কোন হরি?
এজ্ঞে শ্রীহরি পতিতপাবন ভগবান। শ্রীহরির নাম শোনেননি বাবুমশাই? আমি তারই লোক। আপনি কার লোক?
ছোটমশাই বুঝলেন লোকটা পাগল। বেশি ঘাঁটাতে চাইলেন না। শুধু বললেন–তুমি এখেনে কী করতে এসেছ?
এজ্ঞে, আমার বউ এখেনে আছে, তারই সন্ধানে এসেছি।
তোমার বউ? এই পল্টনের ছাউনিতে তোমার বউ এল কেমন করে?
উদ্ধব দাস বললে–আমার বউই তো আমার বালাই বাবুসাহেব—
বালাই? তার মানে?
উদ্ধব দাস বললে–তবে শুনুন একটা ছড়া বলি–
ভূতের বালাই রাম।
যোগীর বালাই কাম ॥
পথের বালাই টাকা।
পিঁপড়ের বালাই পাখা ।
সতীর বালাই সজ্জা।
ভিখিরির বালাই লজ্জা ॥
ব্যাঙের বালাই সর্প৷
বুলীর বালাই দর্প ।
সেপাইয়ের বালাই ডর।
সকলের বালাই পর ॥
নন্দের বালাই হর।
ইংরেজের বালাই জ্বর ॥
মউমাছির বালাই মউ।
আর, আমার বালাই বউ ॥
বলে উদ্ধব দাস হাহা করে হেসে উঠল। সেই নির্জন নিরিবিলি বিকেলবেলায় পাগলাটার হাসিটা যেন প্রতিধ্বনি হয়ে আবার ছোটমশাইয়ের কাছেই ফিরে এল।
তা এখানে কর্নেল ক্লাইভ সাহেবের ডেরাটা কোথায় বলতে পারো?
উদ্ধব দাস বললে–ওই তো, ওইটে। ওই ফিরিঙ্গি সাহেবটাই তো আমার বউটাকে তার বাড়িতে রেখে দিয়েছে বাবুমশাই, সাহেবটা এজ্ঞে খুব ভাল লোক, আমার বউই আমার কাছে আসতে চায় না।
কেন? আসতে চায় না কেন?
আমাকে পছন্দ হয় না বাবুমশাই। আমি যে কুরূপ!
ছোটমশাই আর বেশি কথা না বলে কর্নেল সাহেবের ডেরার দিকেই এগোতে লাগলেন। বেশ খড়ের চালের বাড়ি। চালের ওপর লাউডগা লকলক করে লতিয়ে উঠেছে। উদ্ধব দাসও ছোটমশাইয়ের পেছন পেছন চলতে লাগল।
*
পলাশির যুদ্ধের পরে একদিন বাগানবাড়ির বারান্দায় বসে গড়গড়া টানতে টানতে কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ বেঙ্গলে আসার পর থেকে সমস্ত ঘটনাগুলো মনে মনে আলোচনা করে দেখেছিল। বেশি বয়েস হলেই হয়তো অতীত জীবনটা ঝালিয়ে নিতে ইচ্ছে করে। তখন মনে হয় এতদিন এই পৃথিবীতে বেঁচে থেকে করলুম কী! এক-একটা যুদ্ধ করেছি আর ইন্ডিয়ানদের খুন করেছি। নিজের লোকও কিছু খুন হয়েছে। কিন্তু কার জন্যে এসব করলাম? এতে কার কী লাভ হল? আমি কার লাভ চেয়েছিলাম? আমার নিজের, না ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির, না ইন্ডিয়ার? সেদিন ইন্ডিয়ার ম্যাপটাই চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল কর্নেল ক্লাইভের।
সত্যিই, সেদিন যখন খবর এল নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলা ত্রিবেণী পর্যন্ত এসে গেছে, তখন আর ভাববারও সময় ছিল না।
তাড়াতাড়ি ছাউনি থেকে ফিরে এসেই ডাকলে হরিচরণ—
হরিচরণ ছিল না। দুর্গা বেরিয়ে এল। বললে–কী বাবা, হরিচরণ তো নেই
