দেনা রেখে তীর্থে যেতে নেই তাই এই ব্যবস্থা। লেখাপড়া না থাক, হাতচিটেনা থাক, নথিপত্র দলিল দস্তাবেজ কিছুই দাখিল করতে হবে না। শুধু মুখ ফুটে চাইলেই জগা খাজাঞ্চি দিয়ে দেবে। কিন্তু একটা লোকও আসত না টাকা নিতে।
জগা খাজাঞ্চি ডাকত–ও মোড়লের পো, তোমার কিছু পাওনা আছে নাকি গো?
মোড়লের পো জিভ কাটত। বলত–কী যে বলেন খাজাঞ্চিমশাই, মিথ্যে বলে কি নরকে যাব নাকি?
কেউ কিছু নিতে এল না। এমনি করে একদিন তীর্থে চলে গেলেন বড়মশাই। হুজুরের সঙ্গে সঙ্গে যেন গাঁয়ের হাওয়াও বদলে গেল। এখান থেকে গঙ্গার পথ ধরে বজরা ছেড়ে দিলে। ঘাটের ধারে এসে দাঁড়াল সবাই। তর্কপঞ্চানন মশাই সংস্কৃতে কী সব বললেন। আশীর্বাদ করলেন। সঙ্গে মা-রানি। তিনিও মাথায় ঘোমটা দিয়ে বজরার ভেতরে গিয়ে বসলেন। সঙ্গে ঝি-চাকর-দরোয়ান গেল অন্য নৌকোতে।
শোভারাম গিয়ে বড়মশাইয়ের পায়ে হাত দিলে।
বড়মশাই বললেন–কে রে? শোভারাম বুঝি?
তারপর হাসতে হাসতে বললেন–মরুনির বিয়ের সময় নেমন্তন্ন করতে ভুলিসনে রে শোভারাম–
শেষদিকে বড়মশাইয়ের পা-টেপা থেকে শুরু করে তেল-মাখানো পর্যন্ত সমস্ত করত শোভারাম। মা-রানি শোভারামের সামনে বেরোতেন। বলতেন–তোমার মেয়েকে একদিন নিয়ে এসো শোভারাম, দেখব–
তা মরালীকে দেখে মা-রানির কী আহ্লাদ!
বললেন–এ যে দুগগো প্রতিমে রে শোভারাম, এই তোর মেয়ে?
হ্যাঁ, মা-জননী!
তারপর মরালীর দিকে চেয়ে শোভারাম বলেছিল–প্রেনাম কর মা-জননীকে, বল আশীর্বাদ করো মা, যেন তোমার মতো পুণ্যবতী হই, ভাল করে প্রেনাম কর, মাথা ঠেকিয়ে প্রেনাম কর–
নিজের মেয়ে হয়নি বলে মা-রানি বড় আদর করেছিলেন মরালীকে।
বলেছিলেন–এ মেয়ে তোর খুব সুলক্ষণা রে, মেয়েকে যত্ন করিস–
যত্ন আর কী করবে শোভারাম! জীব দিয়েছেন যিনি আহার দেবেন তিনিই। মেয়ে নিজেই খুব সেয়ানা হয়ে উঠল বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে। সাত বছর যখন মরালীর বয়েস, তখন থেকেই সাজবার শখ। পান খেয়ে ঠোঁট লাল করে পাড়ায় পাড়ায় বেড়াত। রাস্তায় যাকে দেখবে তাকেই ডাকবে। বলবে-ও বিদ্যেধর, বিদ্যেধর।
বুড়ো মানুষ বিদ্যেধর। বড়মশাইয়ের বাড়িতে মাটির হাঁড়িকুড়ি জোগান দেয়। কুমোরপাড়ায় সাত পুরুষের বাস। বাপের বয়েসি মানুষ। ভালমানুষ গোছের চেহারা। সেও অবাক হয়ে যায়।
মরালী বললে–তুমি অমন করে আমার পানে চাইছ কেন গা?
ওমা, তোমার দিকে আবার কখন চাইলাম গো দিদি?
মরালী বললে–না, চেয়োনা, মেয়েমানুষের পানে অমন করে তাকাতে নেই—
বিদ্যাধর তো অবাক হয়ে গেল।
মরালী আবার বললে–তোমরা কেমন বেটাছেলে গা, গাঁয়ে আর দেখবার জিনিস নেই, মেয়েছেলের পানে চাওয়া?
শোভারামের কাছে গিয়েও অনেকে বলত–এ-মেয়ে তোমায় জ্বালাবে অনেক, মেয়ের বিয়ে দিয়ে ফেলো শিগগির
তা বিয়ে অমনি দেব বললেই কি দেওয়া যায়। কথায় বলে হাজার এক কথায় বিয়ে। জাত-কুলবংশ-স্বভাব সবকিছুই দেখতে হবে তো! বড়মশাই জাত নিয়ে বড় মাথা ঘামাতেন। বলতেন–তোরা কী জাত রে শোভারাম?
শোভারাম বলত–আমরা সৎশূদ্র বড়মশাই—
সৎশূদ্র? সে আবার কী রে?
সিদ্ধান্তবারিধি মশাই পাশেই থাকতেন। তিনি বলতেন–আজ্ঞে সৎশূদ্র কথাটা বড় গোলমেলে বড়মশাই, শাস্ত্রে আছে
গোপো মালী চ কাংসার তন্দ্রিসাংখিকাঃ।
কুনাল কর্মকারশ্চ নাপিতো নব শায়কাঃ।
তৈলিকো গান্ধিকো বৈদ্য সচ্ছুদ্রাশ্চ প্রকীর্তিতা।
সচ্ছুদ্রানান্ত সকৈষাং কায়স্থ উত্তম সৃতঃ—
বড়মশাই জিজ্ঞেস করতেন–অর্থ?
ওর অর্থ বড় গোলমেলে বড়মশাই, অর্থাৎ আপনিও যা ও-ও তাই, তবে ওর বাড়িতে ক্রিয়াকর্মে আমরা দক্ষিনে নেব, কিন্তু সিধা গ্রহণ নিষেধ, তার জন্যে অর্থমূল্য ধরে দিতে হবে, আর আপনার বাড়িতে সিধাও নেব, কিন্তু অর্থমূল্যের পরিবর্তে স্বর্ণমূল্য! হিন্দুধর্মের ওই তো মজা হুজুর, এখানে অনাচারটি পাবেন না–
সেই জন্যেই বুঝি তোর মেয়ের পাত্র পাচ্ছিসনে?
শোভারাম বলত–আজ্ঞে পাত্র পাচ্ছি, সুলতানুটিতে আমাদের স্বঘরের একটি পাত্র পাচ্ছি– আপনি যদি হুকুম করেন…
কথা শেষ হবার আগেই বড়মশাই খেপে উঠতেন। ম্লেচ্ছদের সঙ্গে ওঠাবসা করে তাদের কি জাত আছে নাকি? ম্লেচ্ছদের ছোঁয়া জল খায়, ম্লেচ্ছদের কাছে চাকরি করে, তার সঙ্গে শোভারাম মেয়ের বিয়ে দেবে? বরাবর বড়মশাই তাতে বাধা দিয়েছেন। আর পাত্র পেলি না?
তা এখন সেই বড়মশাইও নেই, এদিকে মেয়েরও বয়েস বেড়ে যাচ্ছে। শেষকালে মেয়ের সামনে শোভারামের গলা দিয়ে আর ভাত নামত না। গাঁয়ের লোক শেষকালে শোভারামকে একঘরে করেই ছাড়ত। নেহাত ছোটমশাই ছিলেন বলে এতদিন কেউ ধোপা-নাপিত বন্ধ করেনি। যাক, এতদিনে শোভারামের গলা থেকে কাটা নামল। এখন ভালয় ভালয় সম্প্রদানটা হয়ে গেলে হয়।
হঠাৎ দৌড়োতে দৌড়োতে হরিপদ এসে হাজির।
দাদা, ওদিকে সব্বনাশ হয়েছে–
কী সব্বনাশ রে? বর আসেনি? বরকে দেখলিনে?
হরিপদর মুখের কথা তখন আটকে গেছে। বললে–তুমি একবার ছোটমশাইয়ের কাছে চলো, বিপদ হয়েছে ওদিকে–
বিপদ? বিপদটা আবার দেখলি কোথায়? বর না এলে যে পাতক হয়ে যাব রে! বলছিস কী তুই?
হরিপদ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললে–সেপাই দেখে আমরা বড্ড ভয় পেয়ে গেছি দাদা! ফৌজদারের সেপাই!
ফৌজদারের সেপাই!
হ্যাঁ দাদা, ছোটমশাইয়ের বাড়ির নিশেনা চাইলে আমাদের কাছে, ঘোড়া ছুটিয়ে আসছিল।
